নব্বই দশকের নান্দনিক স্থাপনা খুলনার জিয়া (পাবলিক) হল ভবন। দ্বিতল গ্যালারি বিশিষ্ট মিলনায়তন,
 আধুনিক সুবিধাসংবলিত এ ভবনই ছিল সভা-সমাবেশ, নাটকসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বিশাল এ কমপ্লেক্স ছিল খুলনা নগরীর ট্রেডমার্ক।

মাত্র ১৮ বছর ব্যবহারের পরই ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায় এ হল। এরপর প্রায় এক যুগ পরিত্যক্ত থাকার পর নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে হলটি। ভবনটি ভাঙার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অনেকটা নীরবেই হারিয়ে যাচ্ছে খুলনার বহু ইতিহাসের এই সাক্ষী।

কেসিসি সূত্র জানিয়েছে, জিয়া হলের এই স্থানে বহুতল সিটি ট্রেড সেন্টার নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন এ প্রকল্প এখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায়।

তবে বিপুল টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশাল ভবনটি কেন ১৮ বছরেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ল, এর কারণ অনুসন্ধান করেনি কেসিসি। কোনো তদন্তও হয়নি। কারও শাস্তিও হয়নি।

জাতীয় পার্টির সময়ে কমপ্লেক্সটি পাবলিক হল, বিএনপির সময়ে জিয়া হল এবং আওয়ামী লীগের সময়ে আবার পাবলিক হল নামকরণ হয়। তবে খুলনার সাধারণ মানুষের কাছে এটি 'জিয়া হল' নামেই বেশি পরিচিত।

১৩ বছরে সম্পন্ন নির্মাণকাজ

কেসিসির পুরোনো নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, হল কমপ্লেক্সটি নির্মাণ হয়েছে কয়েকটি ধাপে। ১৯৭৮ সালের ১২ জানুয়ারি হলের জন্য জমি হস্তান্তর করে কেডিএ। সেখানে পৌরসভারও কিছু জমি ছিল। মোট এক দশমিক ৭২১৭ একর জমির ওপর হলের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। তখন খুলনা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন আইনজীবী এনায়েত আলী। পরের দুই বছর ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৪টি পাইল স্থাপন করা হয়। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর হলের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আট বছর কাজ বন্ধ ছিল।

১৯৮৯ সালে তৎকালীন মেয়র কাজী আমিনুল হক আবার হলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। সে বছর স্থাপন করা হয় ২০৪টি পাইল। এতে ব্যয় হয় ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পরের বছর আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯১ সালে কেসিসির মেয়রের দায়িত্ব পান তৈয়েবুর রহমান। তার সময় হলের মূল সুপার স্ট্রাকচারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বাইরে থেকে দৃশ্যমান বর্তমান স্থাপনাটি নির্মাণের জন্য ব্যয় হয় এক কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কাজটি করেছিল তমা কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হলের উদ্বোধন করেন। তখন এর নামকরণ হয় 'জিয়া হল'। ১৯৯২ সালের ২৯ নভেম্বর মূল ভবনের কাজ শেষ হয়। এরপর মিলনায়তনে চেয়ার বসানো ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ আরও কাজ হয়েছে।

জিয়া হলে যেসব সুবিধা ছিল

দুই ভাগে বিভক্ত হলটির মূল আকর্ষণ ছিল দুই তলাবিশিষ্ট গ্যালারিসহ বিশাল মিলনায়তন। মূল মিলনায়তনে এক হাজার ৬৫টি আসন ছিল। মঞ্চে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজন করা হয়েছিল। ছোট সভার জন্য ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ১৯০ আসনের আলাদা সেমিনার কক্ষ। এ ছাড়া আড়াই হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি লাউঞ্জ, মঞ্চ সংলগ্ন আসবাবপত্র কক্ষ, তিনটি মহরত কক্ষ, একটি বিশ্রাম কক্ষ, দুটি লেডিস কর্নার, একটি নামাজ ঘর, মেকআপ কক্ষ ও অফিসসহ অন্যান্য সুবিধা ছিল হলে।

পরিত্যক্ত ঘোষণার পরিক্রমা

উদ্বোধনের পর থেকে জিয়া হল ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে খুলনার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নগরীর সব ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভা হতো এখানে। ২০০৩ সালে কয়েক দফা লাউঞ্জের পলেস্তারা ও ঢালাই খসে পড়ে। ২০০৭ সাল থেকেই মূল ভবনের পলেস্তারা ও ঢালাই খসে পড়তে শুরু করে।

কেসিসির পূর্ত বিভাগ থেকে জানা গেছে, ২০০৮ সালে জিয়া হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র সংযোজন এবং সংস্কার করতে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি সমীক্ষা চালানোর অনুরোধ জানানো হয়। পরিদর্শন শেষে তারা জানান, ভবনটি আর মেরামত উপযোগী নেই। ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন তারা।

২০০৯ সালে জিয়া হলের ভেতরেই খুলনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশলী ও স্থপতিদের নিয়ে সভা করেন তৎকালীন মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। তারাও ভবনটি সংস্কারের উপযোগী নেই উল্লেখ করে ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরামর্শ দেন। এরপর থেকে মূল ভবনটি ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০১২ সালে জিলা হল কমপ্লেক্স পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে কেসিসি। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ মে বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক ও কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে কনডেমনেশন কমিটি করে মন্ত্রণালয়। কমিটি ২০১৪ সালের ৩ জুন ভবনের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি করে দেয়। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেয় এ কমিটি। ২০১৯ সালের জুনে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মো. লোকমান হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে এক সভায় জিয়া হলকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু

২০১৯ সালের ২৬ জুন হল নিলামের জন্য দরপত্র আহ্বান করে কেসিসি। মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৮  লাখ ৪৭ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে পাঁচ দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কোনো ঠিকাদারই নিলামে অংশ নেননি।

২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা দিয়ে জিয়া হলের ভগ্নাবশেষ কিনতে মেয়রের কাছে আবেদন করে। এই আবেদন সাধারণ সভায় উত্থাপন হয়। ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজের নিলাম আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সমির কুমার দত্ত বলেন, 'আমাদের দুই মাসের মধ্যে ভবন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন ৩০ জন শ্রমিক ভবন ভাঙতে কাজ করছে। মার্চের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।'

হবে বহুতল ভবন

কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার বলেন, এখানে বহুতল সিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য ২০১২ সাল থেকে পরিকল্পনা চলছে। সবশেষ নগরীর প্রকল্পের সমন্বয়ে দুই হাজার ৫০৩ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রকল্পে হলের জন্য ৩১০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

বর্তমান মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, 'নিম্ন মানের কাজের কারণে দ্রুত স্থাপনাটি নষ্ট হয়েছে। সেই সময়ের মেয়র, ঠিকাদার, প্রধান প্রকৌশলীসহ আরও যারা ছিলেন বেশিরভাগই মারা গেছেন। কেউ অবসরে গেছেন। কার বিরুদ্ধে তদন্ত করব, কাকে শাস্তি দেব?'

মন্তব্য করুন