রাজশাহীতেই হয়েছিল প্রথম শহীদ মিনার

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬     আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

সৌরভ হাবিব


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে- এমন একটি খবর রাজশাহীতে আসে সন্ধ্যায়। রাজশাহীর মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের টেলিফোনে খবরটি আসার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বুকে গুলি চালানোর খবরে সোচ্চার হয়ে ওঠেন রাজশাহীর ছাত্র-জনতা। ওই রাতেই রাজশাহী কলেজের এ ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থী গোলাম আরিফ টিপুর কক্ষে সভা হয়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয় শহীদদের সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। কিন্তু তখনকার দিনে শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না কারও। তারপরও রাত সাড়ে ৯টায় শুরু হলো নির্মাণকাজ। পাশেই ছিল হোস্টেল নির্মাণের জন্য ইট-কাঠ। সেই ইট-কাঠের সঙ্গে কাদামাটি মিশিয়ে রাত ১২টার মধ্যে নির্মিত হলো দেশের প্রথম শহীদ মিনার। মাটিতে কালি দিয়ে দিয়ে লিখে দেওয়া হলো 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ'। এভাবেই রচিত হলো আমাদের দেশের মহান ভাষা শহীদদের সম্মানে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের ইতিহাস।

ভাষাসংগ্রামী আবুল হোসেন জানালেন ইতিহাসের অনালোকিত ওই ঘটনাটির কথা। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন রাজশাহী কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। তার সঙ্গে নগরীর শিরোইল মটপুকুর এলাকায় তার বাড়িতে কথা হচ্ছিল। তিনি জানান, আতাউর রহমান ও বীরেন্দ্রনাথ সরকারের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকেই রাজশাহীতে বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। আতাউর রহমান ছিলেন অবিভক্ত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর জেলা গভর্নর হয়েছিলেন। বীরেন্দ্রনাথ সরকার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তাদের অনুপ্রেরণাতেই রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। তখন ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের ছাত্র ডা. এসএ গাফফার, গোলাম আরিফ টিপু ও নাটোরের গুরুদাসপুরের হাবিবুর রহমান হাবিব। মূলত এই তিনজনই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সামনের সারির নেতা। আবুল হোসেন বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে সখ্যের কারণে তিনিও যুক্ত

হয়েছিলেন আন্দোলনে। ফলে যুক্ত হতে পেরেছিলেন প্রথম শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায়।

ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক অবশ্য রাজশাহীতে একুশের রাতে নির্মিত ওই স্মৃতিস্তম্ভকে শহীদ মিনার নয়, শহীদ মিনার নির্মাণের প্রথম প্রয়াস বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, 'আমাদের বন্ধু-বান্ধবের অনেকে এই প্রয়াসটিকে মানতে চান না। আমি মানি। কারণ প্রচেষ্টাটা ছিল প্রথম। এটা ছিল কাদামাটি আর কয়েকটা ইট দিয়ে তৈরি করা খুব ছোটখাটো একটি স্তম্ভ। আমরা ঢাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করেছি এর একদিন পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে। সাড়ে ১০ ফুট উঁচু, ছয় ফুট চওড়া। রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময় লেগেছিল আমাদের।' আহমদ রফিক আরও বলেন, ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি নড়াইল শহরের বোর্ডিং হাউস প্রাঙ্গণেও একুশের রাতে কাদামাটি দিয়ে একই রকম একটি মিনার করার কথা জানতে পেরেছেন। তার মতে, প্রথম প্রচেষ্টাগুলোর স্বীকৃতি দিলে শহীদ মিনারের গৌরব ক্ষুণ্ন হয় না।

রাজশাহীতে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে যুক্তদের অন্যতম আবুল হোসেন বলেন, রাজশাহী শহরের জনবসতি তখন পূর্ব দিকে বোসপাড়া, পশ্চিম দিকে গির্জা এবং উত্তর দিকে অলকার মোড় ও বেলদারপাড়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া পূর্ববঙ্গে রাজশাহী কলেজের মতো বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না বললেই চলে। ঢাকায় গুলির খবরটি রাজশাহীর ছাত্র সমাজকে খুবই আবেগতাড়িত করে। তাৎক্ষণিকভাবে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের এ ব্লকে এক সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এই পরিষদই রাতে স্মৃতিস্তম্ভ্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের জনাদশেকের সঙ্গে আরও জনাদশেক মিলে রাত সাড়ে ৯টায় শুরু হলো শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ। অদক্ষ হাতে রাত ১২টায় নির্মাণ হলো দেশের প্রথম শহীদ মিনার। এর গায়ে লেখা হলো 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ'। অদক্ষ কারিগরদের সবাই দাঁড়ালেন স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে। কোনো একজন শৌখিন মানুষ ছবিও তুলে ফেললেন। সেদিনও কেউ জানতেন না এ ছবিটাই হবে দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের সাক্ষ্য। সেদিনের সেই শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম কারিগর আবুল হোসেন জানান, রাত ১২টার দিকে নির্মাণ শেষে সবাই যার যার মতো বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে এসে দেখলেন স্মৃতিস্তম্ভের কোনো চিহ্ন নেই।

রাজশাহী কলেজের যেখানটায় শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল একই স্থানে ২০০৯ সালে নির্মাণ করা হয় একটি শ্রদ্ধা স্মারক। এর ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ করেন সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, 'দেশের প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি স্মারক নির্মাণ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ দেশের প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি এতদিন ধরে রেখেছে। এবার সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছেন শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য। এই শহীদ মিনারটি হবে ৫২ ফুট উঁচু। এতে সব ভাষা শহীদ এবং ভাষাসংগ্রামীর নাম লেখা থাকবে। থাকবে ভাষা আন্দোলনে রাজশাহী অঞ্চলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এ বছরই নির্মাণ কাজ শুরু হবে।'