সুরে সুরে শিকড়ের সন্ধান করবে ছায়ানট

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

দীপন নন্দী



গানের সুরে, কবিতার ছন্দে, নৃত্যের ঝঙ্কারে সবাইকে বাঙালি চেতনায় ফিরিয়ে আনতে চায় দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। জানাতে চায় শেকড়ের সন্ধানের আহ্বান। এবারের পহেলা বৈশাখে রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনে এ আহ্বান জানানো হবে। এ জন্য এরই মধ্যে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। ছায়ানট বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীদের সুর ঝালিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিক্ষকরা। আর তাদের অভিভাবক হিসেবে আছেন দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছায়ানট সভাপতি ড. সন্‌জীদা খাতুন।

এবারের আয়োজন নিয়ে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা সমকালকে বলেন, বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগ। আমরা চাচ্ছি, মানুষ তার শেকড়ের কাছে ফিরে যাক। এর জন্য এবার ছায়ানট সভাপতি তার বর্ষবরণের কথনে সংস্কৃতিকে সঙ্গী করে সবাইকে শেকড়ের সন্ধানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাবেন। সেভাবেই প্রভাতি আয়োজনের গানগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। এক মাস ধরে এর মহড়া চলছে। এবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে লিসা বলেন, বরাবরের মতো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি, অনুষ্ঠানস্থলে আসার আগের যে বলয়, তার পরিধি কমিয়ে আনতে। এর জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডের লালরঙা ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে গিয়ে দেখা যায় ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনের প্রস্তুতি। প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই চলছে প্রভাতি আয়োজনের জন্য নির্ধারিত গানগুলোর মহড়া। অন্যদিকে ছায়ানটের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ব্যস্ত মঞ্চসজ্জা, নিরাপত্তার আয়োজনসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে।

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রাথমিকভাবে কিছু গান নির্বাচন করে প্রভাতি আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়। বর্তমানে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হয়ে বেশ রাত পর্যন্ত চলছে মহড়া। এতে অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী শতাধিক শিল্পী। তাদের নিয়মিতভাবে শেখাচ্ছেন বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, রেজাউল করিম, সেমন্তী মঞ্জরীসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী। পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকছেন ছায়ানটের সহসভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা, শারমিন সাথী ইসলামসহ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা। আর সবার ওপরে ছায়ানট সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন তো আছেনই।

ছায়ানটের কর্মকর্তারা জানান, এবারের প্রভাতি আয়োজনে প্রায় ১৩০ জন শিল্পী মঞ্চে গাইবেন। মেয়ে শিল্পীদের পরনে থাকবে নানা রঙের পাড়যুক্ত অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি এবং ছেলেরা পরবেন সিদ্ধ জলপাই রঙের পাঞ্জাবি। এদের বেশিরভাগই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে একক গান নিয়ে মঞ্চে হাজির থাকবেন খ্যাতিমান শিল্পী মিতা হক, লাইসা আহমেদ লিসা, তানিয়া মান্নান, আবুল কালাম আজাদ, সুমা রায় ও সেঁজুতি বড়ুয়া।

জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান তো  থাকছেই। সঙ্গে চারণ কবি মুকুন্দ দাস, কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের দারুণ কিছু গান থাকছে এবারের আয়োজনে। রবীন্দ্রনাথের গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- 'বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে', 'ওই পোহাইল তিমির রাতি', 'প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে'; নজরুলের 'এলো এলো রে বৈশাখী ঝড়', 'শুভ্র সমুজ্জ্বল, হে চিরনির্মল', 'প্রভাত বীণা তব বাজে হে', 'মেঘবিহীন খর-বৈশাখে' গানগুলো গাওয়া হবে প্রভাতি আয়োজনে। আরও শোনা যাবে পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের 'ও আমার দরদি আগে জানলে/তোর ভাঙা নৌকায় উঠতাম না', পঞ্চকবির অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'আজি নূতন রতনে ভূষণে যতনে', মুকুন্দ দাসের 'বান এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও', সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'হিমালয় থেকে সুন্দরবন'।

এবারের আয়োজনে আবৃত্তি করবেন প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী হাসান আরিফ এবং পাঠে অংশ নেবেন শামীমা নাজনীন। এসব কিছুর আগে ভোর সোয়া ৬টায় বাঁশিতে রাগ 'আহির ভাইরো' শোনাবেন মর্তুজা কবির মুরাদ। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে থাকছে ছায়ানট সভাপতি সন্‌জীদা খাতুনের নববর্ষ-কথন। আর ছায়ানটের রীতি অনুযায়ী, সবকণ্ঠে একসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যাত্রা শুরু ছায়ানটের। তৎকালীন পাকিস্তান আমলের বৈরী পরিবেশে বাঙালির আপন সত্তাকে জাগিয়ে তোলা, আপন সংস্কৃতিতে বাঁচাবার অধিকার ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জন্য এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে ছায়ানট বাংলা নববর্ষকে আবাহন জানানোর প্রয়াস নেয় ১৯৬৭ সালে। 'কায়মনে বাঙালি' হওয়ার শপথ নিয়ে সেই থেকে গত পাঁচ দশক ধরে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রভাত অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের ভোরে রমনার বটমূলে সঙ্গীতায়োজন করে আসছে সংগঠনটি। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে উগ্রবাদীদের বোমা হামলাও রুখতে পারেনি এ আয়োজনকে।