জাহাঙ্গীরের 'যন্ত্রণা'য় অতিষ্ঠ বেরাইদবাসী

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

শাকিল ফারুক

জাহাঙ্গীরের 'যন্ত্রণা'য় অতিষ্ঠ বেরাইদবাসী

অবৈধ পানি ব্যবসার জন্য মন্দিরের জায়গায় নির্মিত জাহাঙ্গীরের ওভারহেড ট্যাঙ্ক (বাঁয়ে); বেরাইদে ১শ' ফুট রাস্তার সঙ্গে চার বিঘা জমির ওপর বাগানসহ ট্রিপলেক্স বাড়ি, যার মূল্য জমিসহ প্রায় ৪৫ কোটি টাকা- সংগৃহীত

বেরাইদ ইউনিয়নের মানুষ জাহাঙ্গীর আলমের মতো দুর্নীতিবাজ-অত্যাচারী চেয়ারম্যান কখনও দেখেনি- আক্ষেপ করে এ কথা বলেন বেরাইদ নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হাজি আবদুল হাকিম। তার অভিযোগ, বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর গত আট বছরে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর। অবৈধ কর্মকাণ্ডে দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার করে তিনি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করেছেন।

বেরাইদ নাগরিক কমিটির ব্যানারে গত ৩০ মার্চ বেরাইদ হাই স্কুল মাঠে জনসভা করে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার অপব্যবহার করার অপরাধে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীরের পদত্যাগও দাবি করা হয় ওই জনসভায়। গত বৃহস্পতিবার এ নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে ঢাকার অদূরে বেরাইদে গিয়ে জানা যায় জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অনিয়মের আরও ফিরিস্তি।

নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আবদুল হাকিম জানান, ৩০ মার্চের জনসভায় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খণ্ডন করতে আসার আহ্বান জানানো হলেও তাতে তিনি সাড়া দেননি। কারণ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যে নয়। শুধু জাহাঙ্গীর নন, তার পরিবারের সদস্যরাও ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্থানীয়দের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন।

জাহাঙ্গীর আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে আরও বহু অনিয়মের তথ্য জানান বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মারুফ আহমেদ, নাইম আহমেদ, সাজেদুল হক এবং বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আমজাদ হোসেন, সদস্য ফারুক আহমেদ, ঢাকা মহানগর উত্তর মৎস্যজীবী লীগের সহসভাপতি আলমগীর কবির, স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মশিউর রহমান, মহসিন কবির প্রমুখ।

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, সম্প্রতি বেরাইদকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করার পর ঐতিহ্যবাহী এই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা নিয়ে ৪২ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হয়। ডিএনসিসির মেয়র পদের উপনির্বাচনের সময় এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয়দের সমর্থন পাবেন না- এমনটা নিশ্চিত হওয়ার পর নিজের পদ ধরে রাখতে দলীয় নির্দেশনা ছাড়াই সিটি নির্বাচন নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেন জাহাঙ্গীর আলম। ভাটারা ইউনিয়নের বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান আতাউর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশ করে জাহাঙ্গীর এই রিট করেন। তাদের দু'জনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আটকে গেছে ডিএনসিসির নির্বাচন। এর মাধ্যমে নিজের স্বার্থে অন্য দলের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে জাহাঙ্গীর নিজের দলকেও বিব্রত করেছেন বলে মন্তব্য করে তার শাস্তি দাবি করেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী বেরাইদ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলেও জাহাঙ্গীরের রিটের কারণে তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকাবাসী। জাহাঙ্গীর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাকে জনগণ পদত্যাগে বাধ্য করবে বলেও হুঁশিয়ার করেন অভিযোগকারীরা।

জাহাঙ্গীরের যত কুকীর্তি : ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর নির্বাচনী ব্যয় জোগাড়ের নামে বালু নদীতে চলাচলকারী নৌযান থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করেন জাহাঙ্গীর। নির্বাচিত হওয়ার পর তার সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্য বেড়েছে আরও। বালু ও শীতলক্ষ্যায় ড্রেজিংসহ অন্যান্য কাজের জন্যও বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায় হচ্ছে জাহাঙ্গীরের নামে। এ-সংক্রান্ত ভিডিওচিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পরও তা বন্ধ হয়নি। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর মালিকানা নিয়ে বিবাদপূর্ণ একাধিক জমি প্রভাব বিস্তার করে দখল করেন জাহাঙ্গীর। সালিশের নামে জিম্মি করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায় করতেও পিছপা হন না তিনি। জমির দালালি করতে গিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন অনেকের সর্বস্ব।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও রক্ষা পায়নি জাহাঙ্গীর ও তার স্বজনদের যন্ত্রণা থেকে। স্থানীয় মন্দিরের জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন জাহাঙ্গীরের ভাই। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নামে ভুয়া ঋণ তুলে কিস্তির টাকার জন্য তাদের হয়রানি করছেন জাহাঙ্গীরের ভাতিজা ও ভাগ্নে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজনদের হাতে।

ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আসা বরাদ্দ নিয়ে নয়ছয় করার অভিযোগও রয়েছে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীরের নামে। ইউপি সদস্যদের মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে অনেককে বঞ্চিত করেছেন উন্নয়ন প্রকল্প ও টিআর-কাবিখার বরাদ্দ

থেকেও। সম্প্রতি এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবদন তৈরির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে জাহাঙ্গীরের স্বজনদের তোপের মুখে পড়েন একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের কর্মীরা। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতা।

অবৈধ সম্পদের পাহাড় :রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে পলিথিন বিক্রি করতেন জাহাঙ্গীর। এরপর মদের ব্যবসাও করেছেন। পরে নানা কৌশলে স্থানীয় এমপি একেএম রহমতুল্লাহর আস্থা অর্জন করে রাজনীতিতে এসেই জাহাঙ্গীর যেন 'আলাদিনের চেরাগ' হাতে পেয়েছেন! অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে এখন তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় রয়েছে দেড় কোটি টাকা এবং মধ্য বাড্ডায় প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট, বেরাইদের ঐতিহ্যবাহী ভূঁইয়াপাড়া মসজিদের সামনে প্রায় তিন কোটি মূল্যের বহুতল ভবন, মাদানী অ্যাভিনিউর পাশে ৫০ কোটি টাকা মূল্যের বাগানবাড়ি এবং ৬০ কোটি টাকার বেনামি জমি, বেরাইদে ৬ কোটি টাকার বহুতল বাড়িসহ বিপুল বিত্তবৈভব অর্জন করেছেন জাহাঙ্গীর। তার অবৈধ সম্পর্কের খোঁজে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তে নামার আহ্বান জানিয়েছে বেরাইদ নাগরিক কমিটি।

যা বললেন জাহাঙ্গীর :অভিযোগের ব্যাপারে জানতে সমকালের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তার দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করার পরও তিনি সাড়া দেননি। তবে তার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতার সমাবেশের পর কয়েকটি গণমাধ্যমের কাছে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে দলীয় কোন্দল বলে দাবি করেন। স্থানীয় এমপির ইশারায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বেরাইদ নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আবদুল হাকিম বলেন, নিজের অপকর্ম আড়াল করতে জাহাঙ্গীর দলীয় কোন্দলের কথা বলছেন। কিছুদিন আগেও নিজেকে এমপির আস্থাভাজন হিসেবে প্রচারের জন্য ব্যস্ত থাকতেন জাহাঙ্গীর। এখন জনগণ ফুঁসে ওঠায় এমপিকে জড়িয়ে ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। নিজের স্বার্থে জাহাঙ্গীর এভাবেই রঙবদল করতে পারেন।