বিভাজনমুক্ত দেশ গড়বে 'সল্ফপ্রীতি বাংলাদেশ'

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৮      

সমকাল প্রতিবেদক

বিভাজনমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে 'সম্প্রীতি বাংলাদেশ' নামে পেশাজীবীদের নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু হলো। গত কয়েক মাসে একাধিক মতবিনিময় ও পরামর্শ সভা শেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'গাহি সাম্যের গান'কে ধারণ করে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করেছে। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজন।

আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে নবগঠিত এ সংগঠনের আহ্বায়ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সদস্য সচিব মামুন আল মাহতাব বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরতে চান তারা। এই চাওয়া বাস্তবায়ন হলে ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণহীন ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা বলেন, সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তির পক্ষের যে কোনো আঘাত প্রতিহত করতে প্রস্তুত থাকবে নতুন এই সংগঠন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একটি ভিডিও বার্তা প্রদর্শন করা হয়। এতে তিনি বলেন, হাজার হাজার বছর ধরে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ সম্প্রীতি নিয়ে এই দেশে বসবাস করছে। বিভেদ ও সংঘাতও হয়েছে। এর পরও সব মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সামনে আনা হয়েছে বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধানের আদর্শ সাময়িকভাবে ভূলুণ্ঠিত হলেও দেশবাসী এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে এনেছে।

শাসকদের কারণেই জনগণ ধর্মের দিকে ঝুঁকছে বলে মন্তব্য করে ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শাসকরা চান, জনগণ শুধু পরজগৎ নিয়ে ভাবুক। যাতে তাদের শাসন-শোষণে সুবিধা হয়। মানুষে মানুষে যদি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, ধর্মে ধর্মে সম্প্রীতি আসবে না। হানাহানি বাড়তে থাকবে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভালো রাখার দায়িত্ব সংখ্যাগুরুদের নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, বিশাল মেট্রোরেল হবে, বিশাল পদ্মা সেতু হবে অনেক, দেশের অর্থনীতি অনেক বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বী যদি মাথা নিচু করে বলে, 'আমি ভালো নেই', তাহলে দেশ ভালো থাকবে না।

অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আছে, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও রয়েছে। তেলে আর জলে কখনও মেলে না। ধর্ম, রাজনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থ- মানুষের মধ্যে বিভাজনের এই তিনটি উপাদান। এগুলো দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমিরেটাস অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, সমতার কথা যদি বলি, তাহলে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করা হয়েছে। তাই একবিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে হলে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা এখন ফিরে এসেছে, সমাজতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে। নতুন প্রজন্মকে রাজনীতি বদলাতে হবে। ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, এখন তরুণ সমাজের দায়িত্ব বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার। সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান, একাত্তরের সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব সাংবাদিক হারুন হাবীব, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজাল, রামকৃষ্ণ মিশনের সহ-সম্পাদক স্বামী গুরু সেবানন্দ, বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা শুদ্ধানন্দ মহাথেরো, খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও, ইসকনের প্রতিনিধি সুখীল দাস প্রমুখ।