শিক্ষা ভবনকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতির চক্র ভাঙতে ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর পর থেকে এমপিওভুক্তির আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নয়টি আঞ্চলিক অফিস থেকেই নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। আঞ্চলিক অফিস থেকে কার্যক্রম সম্পন্ন করা গেলে হয়রানি ও দুর্নীতির মাত্রাও কমবে বলে আশা করেছিলেন নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তিন বছর পর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, বিকেন্দ্রীকরণের ফল হয়েছে উল্টো। আগে এমপিওভুক্তির জন্য শুধু শিক্ষা ভবনে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এখন ঘুষ গুনতে হচ্ছে একাধিক স্তরে। মাউশির আঞ্চলিক অফিসে ঘুষের রাজত্ব চলছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

সংশ্নিষ্টরা জানান, এমপিওভুক্ত প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাখ পাঁচেক শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। নিত্যদিনই তাদের মধ্যে কেউ অবসরে যান। দুই মাস পরপর চাহিদা বিবেচনায় আড়াই হাজার নতুন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নকালেই হয়রানির শিকার হন শিক্ষকরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত হতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস ও আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ে ঘুষ দিতে হয়। না দিলে পদে পদে হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার এক শিক্ষক সমকালকে বলেন, এমপিওভুক্তির জন্য প্রত্যেক অফিসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। বেতন স্কেল বাড়ার পর ঘুষের পরিমাণও বেড়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধন এবং টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পেতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে আঞ্চলিক উপপরিচালকের দপ্তর পর্যন্ত ফাইল পাঠাতে কমপক্ষে দেড়-দুই লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া লাগে। কখনও ঘুষের পরিমাণ আরও বেশি।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম রনি সমকালকে বলেন, এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের পর ঘুষবাণিজ্য আরও বেড়েছে। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসার এবং আঞ্চলিক কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে ঘুষ দিতে হয়। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা ভবনে আসা এক শিক্ষক নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, নির্দেশনা মেনে এমপিওভুক্তির জন্য যথানিয়মে আবেদন করেছিলেন। কাগজপত্রসহ আবেদনটি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানোর পর সেটি বাতিল হয়। যোগাযোগ করা হলে তাকে জানানো হয়, সঠিকভাবে কাগজপত্র স্ক্যান করা হয়নি বলে আবেদন বাতিল হয়েছে। কর্মকর্তারা 'সন্তুষ্ট' না হলে এভাবেই ধাপে ধাপে হয়রানি করা হয়।

ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষক সমকালকে জানান, ২০১৫ সালে এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় এবং অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করে মাউশি। এর পর থেকে মাঠ পর্যায়ে ঘুষ লেনদেন চালু হয়। এ অনিয়মের শুরু হয় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় মাউশির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ বোর্ডে থাকার সুযোগের অপব্যবহার করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা ঘুষ নেন। এমপিওভুক্তির সময় দ্বিতীয় দফায় ঘুষ আদায় করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, দোষ প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

মাউশি সূত্র জানায়, এমপিওভুক্তি নিয়ে হয়রানি ও বাণিজ্যের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও খুলনার আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক গৌর চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক উপপরিচালক আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধেও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক হয়রানিতে সবচেয়ে বেশি কুখ্যাতি সিলেটের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে। রংপুরের আঞ্চলিক উপপরিচালক মোস্তাক হাবিবের উদাসীনতার কারণে মার্চ মাসে এমপিও পাননি ২ সহস্রাধিক শিক্ষক। রংপুর অঞ্চলের একাধিক সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন বিষয়ের প্রায় ৪০ শিক্ষকের ফাইল দীর্ঘ দিন ধরে আটকে রেখেছেন মোস্তাক হাবিব। রহস্যজনক কারণে আবেদন নিষ্পত্তি না করে সবাইকে ঘোরাচ্ছেন তিনি।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে মে মাসে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছেন রংপুরের এক হাজার ১৫০, ঢাকার ৫৭১ ও ময়মনসিংহের ২৭৩ জন শিক্ষক। মার্চ মাসেও এসব শিক্ষক এমপিও পাননি। দুর্নীতি ও উদাসীনতার অভিযোগ ওঠায় গত ২৮ মে মাউশিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রংপুর, ঢাকাসহ তিনটি আঞ্চলিক পরিচালককে ভর্ৎসনা করা হয়। কয়েক দফা চিঠি দিয়ে সতর্কও করা হয়েছে তাদের।

এদিকে রংপুরের এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের পক্ষে গত ১৯ মার্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং মাউশির মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার

ফকিরহাট স্মৃতিসৌধ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মতলুবুর রহমান পলাশ। এ অভিযোগের ভিত্তিতে রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মোস্তাক হাবিবকে মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বদলির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গত ২৮ মার্চ চিঠি দেন মাউশির মহাপরিচালক। অজ্ঞাত কারণে এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষককে মে মাসের এমপিও থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।

গত ২৫ এপ্রিল মাউশির মহাপরিচালকের সই করা একটি চিঠি আঞ্চলিক উপপরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়। অনলাইনে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) এমপিও সংক্রান্ত প্রস্তাব সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে অনুমোদন চেয়ে অধিদপ্তরে নথি পাঠানো যাবে না বলে ওই চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কাগজপত্রে সংযুক্তির ঘাটতি থাকলে, জনবল কাঠামো অনুযায়ী পদের প্রাপ্যতা না থাকলে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে ফাইল ফেরত পাঠাতে বলা হয়।

এসব নির্দেশনা অমান্য করে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আবেদন নিষ্পত্তি করা হয় না, ফেরতও পাঠানো হয় না। অনেক সময় আঞ্চলিক উপপরিচালকের অফিস থেকে মন্তব্য ছাড়াই ফাইল পাঠানো হয় মাউশিতে। আর্থিক সুবিধা নিয়ে যোগ্যতা না থাকার পরও কারো কারো ফাইল পাঠানো হয়। কুড়িগ্রামের একজন শিক্ষক সমকালকে বলেন, সব কাগজপত্রসহ উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে জেলা অফিসে তার ফাইল পাঠানো হয়। সেখান থেকে উপপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো ফাইলে আমার কোনো কাগজপত্র সংযুক্ত ছিল না। তাই মে মাসের এমপিও থেকে বঞ্চিত হন এ শিক্ষক।

এ প্রসঙ্গে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, সব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা এবং ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হোক- তা আমরা চাই না। কারও প্রতি অন্যায় হলেও দেখা হবে।



মন্তব্য করুন