কিশোরদের সচেতনতা

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০১৭

মাহবুবা জান্নাত

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে আমরা অনেক কথাই বলি। বলি আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনসহ নানা কথা। গত দুই দশকে দেশে এ সংক্রান্ত আইন কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে।
কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হচ্ছে, নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার আধেয় বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি দেখেছে, ২০১৫ সালে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এর আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে ৫ শতাংশ। নির্যাতনের মূল দায় পুরুষের ওপর বর্তালেও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষের সম্পৃক্ততা ও পুরুষের ইতিবাচক ভূমিকাগুলোর উপস্থাপনা ও প্রচারণার অভাবে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির যেমন পরিবর্তন আসছে না তেমনি কমছে না নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা।
সেন্টার ফর ম্যান অ্যান্ড ম্যাসকুলিনিটিজ স্টাডিজ (সিএমএসএস) তাই নারী নির্যাতন রোধে পুরুষকে সক্রিয় করে নির্যাতন প্রতিরোধে উদাহরণ সৃষ্টি করতে কাজ শুরু করেছে। প্রিয় বাবা বা ভালো স্বামীর ভূমিকায় নিয়ে আসার কাজ করছে গবেষণাধর্মী এ প্রতিষ্ঠানটি। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য এই তরুণরাই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল ও কলেজছাত্রদের সঙ্গে কাজ করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা পরিবর্তনে সহায়তা করবে। তাদেরকে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার সম্পর্কিত সঠিক তথ্য দিয়ে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবে প্রথমে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তরুণদের ২২ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী দলকে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় 'সেন্টমার্টিনে'। চার দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, দলগত কাজ, সহযোগিতার মনোভাব তৈরিসহ বেশ কিছু মানবিক গুণ শেখানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান এবং সিএমএমএসের নির্বাহী পরিচালক ড, শাইখ ইমতিয়াজ, সহকারী অধ্যাপক ইশরাত খান বর্ষা, প্রভাষক আফসানা ইসলামসহ অনেকেই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সেশন নিয়েছেন এবং তরুণদের ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের বিষয়গুলো পরিষ্কার করে তুলেছেন। সমাজে নিষিদ্ধ কিছু বিষয় আছে যেমন- যৌনতা কী, যৌনতার সঙ্গে জেন্ডারের সম্পর্ক, এসবের সঙ্গে পুরুষত্ব ও নারী নির্যাতনের বিষয় কীভাবে যুক্ত ইত্যাদি সম্পর্কে স্কুলের ছেলেদের কীভাবে শেখানো ও সচেতন করে তোলা যায়_ এসবই ছিল প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া এই তরুণদের নিয়ে একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক রিয়েলিটি শো 'ক্যাম্পাস হিরো ক্যাফে'-এর পরিকল্পনা করা হয়। আর এই কাজেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে পরে স্কুল ক্যাম্পেইন এবং গবেষণার কাজ চালানো হবে।
অবদমনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে কীভাবে সঠিক যৌনচর্চার মাধ্যমে সহিংসতা পরিহার করা সম্ভব- এ বিষয়গুলোও উঠে আসে প্রশিক্ষণের বিষয় হিসেবে। সেই সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেদের কাছে কীভাবে প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকারের বিষয়গুলো পেঁৗছানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলোচনার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেরাই বের করে কতটা সৃষ্টিশীল ও অভিনব উপায়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের বার্তা পেঁৗছে দেওয়া যায়। সাইকেল র‌্যালি, নাটিকা ও সৈকত লেখনীর মাধ্যমে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা। এগুলোর মাধ্যমেই ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে সচেতনমূলক বার্তা। সমুদ্রের নীল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে তারা শপথ নেয় সহিংসতামুক্ত, বৈষম্যহীন এক সমাজ গড়ার। এই তরুণদের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সৃষ্টি করবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের নতুন দৃষ্টান্ত, স্থাপিত হবে এগিয়ে যাওয়ার নতুন মাইলফলক।