কিশোরীর ভালো থাকা

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০১৯

জাহিদুর রহমান

কিশোরীর ভালো থাকা

মাসের বিশেষ সময়গুলোতেও এমন উচ্ছল থাকুক কিশোরীরা -ছবি : লেখক

দেশের স্কুলগুলোয় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ছাত্রীরা সাশ্রয়ী দামে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উপকরণ না পাওয়ায় পুরনো কাপড় বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করে। এ কারণে প্রজননতন্ত্রে সংক্রমণসহ (আরটিআই) অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে। স্কুলগামী ছাত্রীদের জন্য স্কুলে সঠিক মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও আত্মসম্মানবোধ বৃদ্ধি করে। এটি গুণগত ও উপভোগ্য শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্কুলে অংশগ্রহণকারী মেয়েদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উপযোগী নীতি ও পর্যাপ্ত বাজেট দরকার।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) যেমন লক্ষ্য-৩ : সবার ও সব বয়সের মানুষের জন্য সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা এবং জীবনমানের উন্নয়ন করা। লক্ষ্য-৬ : সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সহজলভ্য করা এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; যা অর্জন করার জন্য নীতিনির্ধারকদের যথাযথ মনোযোগ প্রয়োজন। লক্ষ্য-৪ : মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি এবং কর্মদক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। লক্ষ্য-৫ : নারী-পুরুষের সমতা এবং সব নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন। লক্ষ্য-৮ : নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পরিপূর্ণ এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মাধ্যমে সূচক অনুযায়ী লক্ষ্য অর্জনে আনুমানিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি করপোরেট সেক্টর এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে।

২০১৪ সালের ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে অনুযায়ী, ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী মাসিককালীন স্কুলে যায় না। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মনে করে, মাসিক সমস্যা স্কুলের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে। গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৯ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বারবার ব্যবহারের জন্য মাসিকের কাপড় গোপন স্থানে সংরক্ষণ করে। শহর এলাকায় ২১ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে।

২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে থেকে জানা যায়, প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেট আছে, যেখানে সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫ অনুযায়ী ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি টয়লেটের সুপারিশ করা হয়েছে।

গ্রামীণ এলাকায় (৪৩ শতাংশ) অর্ধেকের কম স্কুলে উন্নত ও কার্যকর টয়লেট ছিল, যা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল। মাত্র ২৪ শতাংশ স্কুলে টয়লেট পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পাওয়া গিয়েছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩২ শতাংশ) স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। শহর এলাকায় ৬৩ শতাংশ স্কুলে উন্নত এবং কার্যকর টয়লেট মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা ছিল। ৪৭ শতাংশ স্কুলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। নেত্রকোনা জেলায় ডরপ কর্তৃক বাস্তবায়িত ঋতু প্রকল্পের (২০১৭) বেজলাইন সার্ভে রিপোর্টে প্রায় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টয়লেটের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও তাদের শিক্ষাবিষয়ক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে; যা মানুষের মূল্যবোধ গঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর উন্নয়ন হলে বিপুলসংখ্যক মেয়ের অবদান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে।

স্কুলে সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটের পরিমাণ সরকারি পরিপত্র বা বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি-২০১৭ প্রণীত দলিলটিতে স্কুলের মধ্যে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সুযোগ-সুবিধার জন্য বিনিয়োগ সম্পর্কে কোনো পরিস্কার নির্দেশনা না থাকায় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে বিনিয়োগ অনুপস্থিত।

অন্যদিকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৬-২০২০ অনুযায়ী ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং পর্যাপ্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন ও পরিস্কারের সুবিধা অন্তর্ভুক্তিকরণের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট ব্যবস্থাপনা এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য নারী শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫-এর নির্দেশনা অনুসারে, ১ :১৮৭-এর পরিবর্তে ১ :৫০ জন ছাত্রীর জন্য নতুন এবং পৃথক টয়লেট তৈরি ও পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দে অবশ্যই স্কুলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অথচ এসব সুবিধার সহজ প্রাপ্যতার জন্য স্কুলগুলোর জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন; বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী যেমন- চর, হাওর (জলাভূমি) ও পাহাড়ি অঞ্চল এবং অতি দরিদ্র ও প্রান্তিক সম্প্রদায় (জাতিগত সংখ্যালঘু, নিবর্ণ এবং সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত) পরিবারগুলোর জন্য।