দূষণমুক্ত গঙ্গার জন্য আন্দোলন

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৪     আপডেট: ২৪ জুন ২০১৪      

গৌতম লাহিড়ী


একটা নদীর জন্য নেতাদের প্রাণ আকুল। এবারের হাইফাই-ফেসবুক-টুইটার-থ্রিডি ভোট প্রচারের একমাত্র ব্যতিক্রম। ভারতের লোকসভা ভোটের মধ্যমণি গঙ্গা কিনারার পবিত্র নগরী বারানসি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র এই 'মন্দির নগরী' কাশী। মার্ক টোয়েনের ভাষায়, 'ইতিহাসের থেকেও, ঐতিহ্যের থেকেও, কিংবদন্তির থেকেও পুরাতন- এসব মিলিত সময়ের থেকেও প্রাচীন বারানসি।' এই নগরীর জীবনের নেপথ্যে ভারতীয় সভ্যতার পরিচায়ক নদী গঙ্গা। আজ সেই গঙ্গা বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত নদীর আখ্যায় ভূষিত। বারানসি শহরের প্রাণ গঙ্গা বাঁচানোই এবার ভোটের মুখ্য ইস্যু ছিল। বিপুল ভোটে জয়ের পর কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে গঙ্গাতীরের দসাস্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যা আরতির পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বলেছেন, 'কাশী থেকেই দেশের সাফাই অভিযান শুরু করছি। ২০১৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর সার্ধজন্মশতবার্ষিকীর মধ্যে গোটা দেশে সাফাই অভিযান সম্পন্ন হবে।' কথাটা যতটা আশাব্যঞ্জক ততটাই আশঙ্কার। এর আগেও নেতারা বারানসি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গঙ্গাঘাট নগরী নির্মল করে তুলবেন। বারানসি শহরে পা দিলেই বুঝবেন 'কেউ কথা রাখেনি'। নরেন্দ্র মোদি মনোনয়ন জমা দিয়ে বলেছিলেন, 'গঙ্গা মা আমায় ডেকেছেন। তাই এসেছি।' জয়ের পর তিনি কথা রেখে ফের পা দিলেন বারানসি। এলেন গঙ্গার তীরে। কিন্তু তিনি সাফ-সুতরো গঙ্গার ঘাটে এসে বুঝলেনই না নির্মল-পরিষ্কার-আবর্জনা রহিত ঘাট আগের দিনও এমনটা ছিল না। নোংরা-কর্দমাক্ত-পিচ্ছিল-নেড়ি কুত্তা-বিসর্জিত গাঁদা ফুলের আবর্জনা মিলিত এক চিত্র বারানসির ঘাটের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে। সেই চিত্রের কোনো প্রভাব যদি প্রধানমন্ত্রীর কর্ণে প্রবেশ না করে থাকে তাহলে বারানসি থাকবে সেই তিমিরে। তাই আশঙ্কা। আশঙ্কা সাফাই অভিযান নিয়ে। নগরীর 'সাফাইয়ের' অর্থ এক বিশেষ জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে বিতাড়ন কি-না। সম্ভবত নয়। তবুও 'অধাত্ম্য নগরী'কে ধর্মীয় নগরীর বিশেষণে ভূষিত করলেই আশঙ্কার শিরশিরে চোরাস্রোত ধমনিতে প্রবাহিত হতে থাকে।



বারানসির ধমনিতে রয়েছে স্বাধীনচেতা মনোভাব। বিদেশিদের আক্রমণে পরাভূত হলেও বারানসি ফের স্বাধীন হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের আশ্বাস পালিত না হওয়ার পরও এখানে নাগরিকরা গঙ্গা মলিন করার প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। এখানকার গঙ্গা নির্মল আন্দোলন দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বারবার। তবুও গঙ্গাকে অপবিত্র করার কাজ অব্যাহত। নিরন্তর প্রদূষিত হয়ে চলেছে। গঙ্গা শুধু নগরীর প্রাণ নয়, সংস্কৃতিরও প্রেরণা। এখানেই কয় মাস আগে, তুলসী ঘাটে প্রতি বছরের মতো অনুষ্ঠিত হলো চিরন্তনী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত 'ধ্রুপদ' মেলা। তখনও এখানকার নাগরিকরা জানতেন না, ভারতের লোকসভা ভোটের মূল কেন্দ্র হবে বারানসি। রাজনীতি যাই হোক, বারানসির সংস্কৃতিমেলা গঙ্গা তীরের 'সাফাই' অভিযানে উপেক্ষিত হবে না তো? রবিশংকরের জন্মভূমি বারানসিবাসীর কামনা বিসমিল্লা খানের উত্তরসূরিদের সানাইয়ের ভৈরবী-সায়াহের বেহাগ বেসুরো যেন না হয়ে যায়।

কেইবা মনে রেখেছে ৩৪ বছরের স্বামী নিত্যানন্দের কথা। গঙ্গাকে নির্মল রাখার দাবিতে আমৃত্যু অনশন করে গঙ্গার তীরেই দেহদান করেন। গঙ্গার বুকে অবৈধ খননের প্রতিবাদে যুবা ঋষি প্রাণ দিলেন। তারপরই লোক দেখানো নড়ে বসে উঠল কেন্দ্রীয় সরকার। গঙ্গা পবিত্র রাখার অঙ্গীকার কাগজ-কলমেই রয়ে গেল। ভাবতেই অবাক লাগে, এই পবিত্র গঙ্গা বহু দুরারোগ্য ব্যাধির উৎস হয়ে উঠেছে। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে গঙ্গা দূষণমুক্ত করার জন্য 'গঙ্গা অ্যাকশন পরিকল্পনা' তৈরি হয়। তারপরও আজ ৮২৫ কোটি লিটার দূষিত বর্জ্য পদার্থ গঙ্গায় প্রতিদিন নিমজ্জিত হয়ে চলেছে। এই দূষিত পদার্থ নির্মল করার জন্য বারানসি শহরে একটি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসানো হয়েছিল, বহু টাকা ব্যয় করে। খোঁজ নিলেই জানবেন, সেই প্লান্ট অধিকাংশ দিনই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বারানসি শহরের বুদ্ধিজীবী বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানমনস্ক উদ্যোগীরা গঙ্গা নির্মল করার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গড়ে তুলেছিলেন সংকট মোচন ফাউন্ডেশন। তারাই বলেছেন, গঙ্গার প্রদূষণ দূর করার জন্য যেসব ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি হয়েছে, সেগুলোর গোড়াতেই গলদ রয়েছে। তার ওপর নিত্যদিন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেগুলো অচল হয়ে থাকে।

গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় দৈনিক ৩৭৫ কোটি লিটার দূষিত পদার্থ প্রশমন করার ক্ষমতা সম্পন্ন প্লান্ট বসানো হয়। কিন্তু এখন দৈনিক তার তিনগুণ বর্জ্য পদার্থ প্রতিদিন গঙ্গায় মেশে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, বারানসি নগর দীর্ঘদিন বিজেপিরই দখলে। হিন্দুত্বের আদর্শ নিয়ে গর্ব যাদের তারাই এতদিন কেন উপেক্ষা করছিলেন গঙ্গা প্রদূষণকে তা বোঝা বিস্ময়ের। এবার তাদেরই শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক কর্মভূমি হতে চলেছে বারানসি। তাই প্রত্যাশার পারদ মাপ তুঙ্গে। গঙ্গার সঙ্গে বারানসি এবার প্রদূষণ মুক্ত হবে_ এমন আশায় দিন গুনছেন নগরবাসী। সতর্ক সবাই। দূষণ মুক্তির সঙ্গে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য যেন বিঘ্ন না হয়। মোগলদের উৎসাহে বেনারসি শাড়ির কারিগররা যেন নিরুপদ্রবে জীবন নির্বাহ করতে পারেন। দেখে এসেছি, সুরাটের মিলের বারানসির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কোণঠাসা হাতেগোনা মহামূল্যবান জরিপাড়ের 'বিয়ের কনের' বেনারসি। নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে দূষণ দূর হওয়া সম্ভব নয়। গঙ্গার জলে না ধুলে যেমন লক্ষেষ্টৗর চিকনের কাজ খোলে না, তেমনি বারানসির জরির সঙ্গে গঙ্গার জলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। শুদ্ধ গঙ্গা না হলে চিকন বা বেনারসি বৃথা। গঙ্গার সঙ্গে এই শিল্পকলার ওতপ্রোত সম্পর্ক।

গঙ্গা দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ শিল্পের বর্জ্য নদীতে ফেলা। অথচ সব শিল্প সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে নিজস্ব ট্রিটমেন্ট প্লান্ট রাখার। সেই দায়িত্ব তারা পালন করছেন কি-না তা দেখার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। শিল্প সংস্থাগুলো মুনাফার গুড় ট্রিটমেন্ট প্লান্টগুলোর পেছনে ব্যয় করতে নারাজ। তা সত্ত্বেও অসাধু প্রশাসক অবাধে শিল্প সংস্থাকে ছাড়পত্র দিয়ে চলেছে। অনেকটা রক্ষকই যেমন ভক্ষক। সেই যোগাযোগের শিকড় যদি না উৎপাটন করতে পারেন, তাহলে তিনি পুরপ্রধান হোন, বিধায়ক হোন বা প্রধানমন্ত্রীই হোন, মলিন গঙ্গাকে নির্মল করতে ব্যর্থ হবেন, সেটা স্বাভাবিক। 'ঝটকা' নামে এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সংকট মোচন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে গঙ্গা নির্মল করার অভিযান শুরু করছে কেবল প্রধানমন্ত্রীকে নিরন্তর মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী মোদি এবার প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য নদী উন্নয়ন নামে এক পৃথক মন্ত্রক গড়েছেন।

কয়েকটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করলেই বোঝা যায়, গঙ্গার মাহাত্ম্য। ভারতের এগারোটি রাজ্যের জনগোষ্ঠীর জীবন দান করে এই গঙ্গা। মোট জনসংখ্যার চলি্লশ শতাংশ নির্ভর করে এই নদীর ওপর। দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনপদ এই নদীর উপত্যকায় অবস্থিত। এক লাখেরও বেশি জনসংখ্যার ২৯টি শহর এবং তার নিচের জনসংখ্যার ৪৮ শহর এই নদীতীরে অবস্থিত। এই তো গত এক বছর আগে ঋষি-মুনি-শিক্ষাবিদ-পরিবেশবিদরা একত্রে দিলি্ল পর্যন্ত অভিযান করেছিলেন। তাতে কেন্দ্রীয় কর্তাব্যক্তিরা প্রতীকী আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রতিকার হয়নি। তাই তাদের মতামতও এবার প্রতিফলিত লোকসভা ভোটে। সেটাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর জন্য সতর্কবাণী। প্রতিশ্রুতি নয়, মানুষ এবার কাজ বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তার অপেক্ষায় বারানসির সঙ্গে আমরাও।