মুক্তিযুদ্ধকালে জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী গেরিলা বাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কয়েকটি সফল অপারেশনের পর তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আটক হন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হন। জাহানারা ইমাম পরিচিতি পান 'শহীদ জননী' হিসেবে। পরে যখন দেখেন তার পুত্রসহ ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যাকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীরা একে একে পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন তাদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'। ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক স্বাক্ষরিত ঘোষণার মাধ্যমে এটি গঠিত হয়। এই সংগঠন ও আন্দোলনের প্রথম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। আজ তার ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি জন্মেছিলেন ১৯২৯ সালের ৩ মে। মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৯৪-এর ২৬ জুন। জাহানারা ইমাম আজ আমাদের মধ্যে নেই; কিন্তু তার পুঁতে রেখে যাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির বীজ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কয়েকজনের ফাঁসিও কার্যকর হয়েছে।
যদি পেছন ফিরে দেখি, স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করেছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার। '৭১-এর ঘাতক দালালদের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধু '৭২-এর জানুয়ারি এবং '৭৩-এর জুলাই মাসে দুটি আইন ও অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। সারাদেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত ছিল ১৯৭৫-এর আগস্ট পর্যন্ত।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তিনটি প্রধান কারণ ছিল_ ১. '৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া; ২. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা এবং ৩. '৭২-এর সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা মুছে ফেলে যুদ্ধাপরাধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতায় এসে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এসব দুষ্কর্ম সম্পাদন করেছিলেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে '৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদী ও সাম্প্র্রদায়িক অপশক্তিকে গ্রহণযোগ্যতা প্রদানের ধারাবাহিকতায় তাদের একটি বড় অংশ নিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমে জেনারেল এরশাদ, পরে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। স্বামী জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শুধু জোট বেঁধেই ক্ষান্ত হননি; ২০০১ সালে সরকার গঠনের সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিয়েছিলেন জামায়াতের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে, যারা '৭১-এর গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক এজেন্ডা সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বহু রাজনৈতিক দলের ধারণা স্বচ্ছ না থাকলেও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এবং তার আন্দোলনের অপরাপর নেতা ও নীতিনির্ধারকের ধারণায় কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না। '৭১-এর গণহত্যাকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি নির্মূল কমিটি একমাত্র সংগঠন_ গত ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার জন্য আন্দোলন করছে।
২৩ বছর আগে আমরা যখন জামায়াত-শিবির চক্রের মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবি উত্থাপন করেছিলাম; আমাদের বন্ধুমহলেও কেউ কেউ বলেছিলেন, এ দাবি অগণতান্ত্রিক। আমরা তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি_ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে জামায়াত ও সহযোগীদের ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের যুক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু কী বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু এবং তার সহযোগীরা স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মের নামে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। সাংবিধানিক এই বিধিনিষেধ বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। গণতন্ত্রের সূতিকাগার ইউরোপে এখনও নাৎসি পার্টি নিষিদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মৌলবাদী তালেবানি রাষ্ট্র বানাবার চক্রান্তের অংশ হিসেবে ধর্মের নামে রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দিয়েছিলেন, যার ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত খালেদা-নিজামীদের রাজত্বকালে নজিরবিহীন সাম্প্রদায়িক নির্যাতন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর উপর্যুপরি হামলা, হত্যা ও নির্যাতন। বিএনপির ঘাড়ে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় এসে জামায়াত সোয়াশ' জঙ্গি মৌলবাদী সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। ২০০৬ সালের পর থেকে ক্ষমতায় না থাকলেও জামায়াত-বিএনপির জোট বাংলাদেশকে জিয়াউল হকের পাকিস্তান বা মোল্লা উমরের আফগানিস্তানের মতো তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর জন্য হত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতিতে অবিচল রয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা ও আলবদরপ্রধান মুজাহিদের আপিল ১৬ জুন সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হওয়ার পর তার ফাঁসি আগামী ৯০ দিনে কার্যকর হবে বলে আমরা আশা করছি। মুজাহিদের মামলায় সংগঠন হিসেবে জামায়াত ও আলবদরের অপরাধের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। মহাজোট সরকার কী কারণে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি এখনও নমনীয় আমরা জানি না। আমরা গত ২৩ বছর ধরে বলছি, '৭১-এর যুদ্ধাপরাধের দায়ে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচার করতে হবে, যেমনটি আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে, যেখানে ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রথম দশ মাসে ২১ ব্যক্তির পাশাপাশি ৭টি সংগঠনের বিচার ও শাস্তি সম্পন্ন হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত-রাজাকার-আলবদর-আলশামসের বিচার না হলে ৩০ লাখ শহীদের পরিবারদের বঞ্চিত করা হবে ন্যায়বিচার থেকে; বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মহান আত্মদানের সঙ্গে। যে রাজনীতি হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধকে বৈধতা দেয় ধর্ম ও আদর্শের নামে; যে রাজনীতি মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা স্বীকার করে না; যে রাজনীতি সংবিধানে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা তথা সংবিধান মানে না; যে রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না; বাংলাদেশে কেন সে রাজনীতি থাকবে? ইউরোপে নাৎসি পার্টি যে কারণে এখনও নিষিদ্ধ, সে কারণে বাংলাদেশেও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সরকার কেউটে সাপের লেজে পা দিয়েছে। মাথা চেপে না ধরলে যে কোনো সময় এই সাপ ছোবল মারবে। গত সাড়ে ছয় বছরে একাধিকবার ছোবল মারতে গিয়ে এই কেউটে ব্যর্থ হয়েছে বটে; বারবার ব্যর্থ হবে_ এমনটি মনে করার কোনো বাস্তব কারণ নেই।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম কিন্তু শত্রু চিনতে ভুল করেননি। সারাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি অনুধাবন করতেও ভুল করেননি। তার প্রমাণ হচ্ছে '৯২-এর ২৬ মার্চ ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার জন্য পাঁচ লক্ষাধিক জনসমাগম। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সমাজ নির্মাণ। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সর্বত্র ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য এখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কাজ করছে। জঙ্গি মৌলবাদ আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। একটি দেশে জঙ্গিবাদ দমিত হলে কোনো কাজ হবে না যদি প্রতিবেশী দেশ জঙ্গিবাদ রফতানি অব্যাহত রাখে। সম্প্রতি পাকিস্তানেও গঠিত হয়েছে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাখা_ সেখানে এর নাম 'ফোরাম ফর সেক্যুলার পাকিস্তান'। জাহানারা ইমামের আন্দোলনের মর্মবাণী এভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সংগ্রাম ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
ষ ঘাতক দালাল নির্মরর্্ূল কমিটির
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি

মন্তব্য করুন