প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতি, বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, আকাশ সংস্কৃতি এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই সময়ের পৃথিবীর অনেক ভাষাই হারিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যাবে। এই সংকটের মধ্যেও টিকে আছে অজস্র ভাষা। ইউনেস্কো পরিচালিত একটি ভাষা জরিপে দেখা যায়, বর্তমান শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে চলমান ভাষাগুলোর অর্ধেকের বেশি বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা 'বাংলা' নিয়ে সে রকম কোনো সংকট হয়তো নেই; কিন্তু সংকট আছে এর নিজস্বতা নিয়ে, সমস্যা আছে এর বিকৃতি নিয়ে। যেভাবে চলছে তাতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে বাংলা ভাষা? এ প্রশ্নটি আজ অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যে জাতি নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দিল, জন্ম দিল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের, সেই জাতিই আবার তার ভাষাকে অবজ্ঞা করছে, বিকৃত করছে_ এটা দুঃখজনক। কিন্তু বর্তমান অবস্থা এটাই। এ ছাড়াও নিজেদের আধুনিক দাবি করা কিছু মানুষ আত্মগরিমায় ভুলে গেল নিজের ভাষা অর্জনের ইতিহাসটিও। এ গোষ্ঠী চর্চা শুরু করল শুধুই ইংরেজির। তাও আবার বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে। প্রায় সাতশ' বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল যে ভাষার তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারেনি; সেই ভাষাই বিকৃত হতে শুরু করল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে এসে। নিজের ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সন্তানটি প্রমিত বাংলায় কথা বলতে জানে না যখন, এটাই যেন মা-বাবার জন্য গর্বের! অতি সম্প্র্রতি এ দেশে আবার হিন্দি চর্চাও শুরু করেছে তাদের কেউ কেউ। তবে নব্বই দশকের শেষভাগে এসে সরকারের একান্ত সহযোগিতায় বাংলা ভাষার জন্য অর্জিত হয়েছে আরও একটি বিজয়। ইউনেস্কো বাংলা ভাষা অর্জনের মহান দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার ফলে বাংলা ভাষা এক দুর্লভ মর্যাদার অধিকারী হয়। ১৯০টি দেশের মানুষ এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধায়, তেমনি নিজের ভাষাকে ভালোবাসারও প্রেরণা খুঁজে পায়। কিন্তু প্রশ্নটি হলো, সে হিসেবে আমরা কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি বাংলা ভাষাকে? নিজের ভাষার জন্য আমাদের শ্রদ্ধা কতটুকু? আজও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়নি। যত্রতত্র ইংরেজি নামের ছড়াছড়ি। অনেক আলোচনা-সমালোচনার পরও আদালতে এখনও বাংলা ভাষা চালু হয়নি।
তিন বছর আগে বাংলা ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নির্দেশ দিলেও প্রমিত বাংলার পরিবর্তে বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দির মিশ্রণে খিচুড়ি বাংলার ব্যবহার অবলীলায় চলছে সর্বত্র। বাংলা ভাষার অপ্রমিত রূপ রোধের জন্য করণীয় সম্পর্কে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি সুপারিশ করলেও সেই সুপারিশও প্রায় ছয় মাস ধরে ফাইলবন্দি হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দিনে ভাষার দূষণ বেড়েই চলেছে। ভারতীয় হিন্দি চ্যানেলের ছড়াছড়ি বাংলা ভাষার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রচার মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে একটি তদারকি সংস্থা গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তারা মনে করেন, ভাষার এই দূষণরোধে ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকেরই আগে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ভাষার অবক্ষয় রোধে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে কীভাবে বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধ করা যায় সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে তারা পরামর্শ দিয়েছেন।
২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে 'ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী' শিরোনামে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। ওই লেখার ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট বিভাগের তৎকালীন বিচারপতি এএইচএম শাসুদ্দিন চৌধুরী বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে বাংলা ভাষার প্রতি আর যাতে কোনো আঘাত না আসে সেটা নিশ্চিত করতে বলেন। একই সঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে 'বিকৃত উচ্চারণ' ও 'ভাষাব্যঙ্গ' করে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বিটিআরসির চেয়ারম্যান, সংস্কৃতি সচিব, তথ্য সচিব, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের মহাপরিচালক, সব বেসরকারি টিভি ও এফএম রেডিওর প্রধান কর্মকর্তার প্রতি এই আদেশ জারি করা হয়। স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (সুয়োমোটো) দেওয়া ওই আদেশে আদালত বলেন, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। এ ছাড়া আদালত বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা কথন, সঠিক শব্দ চয়ন না করা এবং বাংলা ভাষার দূষণ রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত চান। তার পরও আমরা রেডিও-টিভির সামনে বসলেই শুনতে পাই 'হ্যালো লিসেনার্স', 'হ্যালো ভিউয়ার্স', 'একটি সংগস প্লে'সহ বাংলা ভাষার সঙ্গে বিকৃত উচ্চারণে অনেক ইংরেজি শব্দ। বাংলা ভাষার সঙ্গে অনেক হিন্দি, ইংরেজি শব্দ মিশে গিয়ে ভাষাদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। তথাকথিত আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের ভাষার পরিচয়, ভাষার রূপ বদলে ফেলছি।
ভাষার বিকৃতি রোধ করতে প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষার নাম করে বিচ্ছিন্ন শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষাকে বিকৃত করা চলবে না। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি বিশেষ অঞ্চলের ব্যবহৃত ভাষাই সেই অঞ্চলের মাতৃভাষা এবং প্রমিত ভাষা। তাই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। বাংলা ও ইংরেজির মিশেল ঘটিয়ে যেভাবে বাক্য গঠন করা হচ্ছে, এই কাজগুলো আমাদের ভাষার প্রবল বিকৃতি ঘটাচ্ছে। এতে না হচ্ছে মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, না হচ্ছে ইংরেজি ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। তাই মাতৃভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষা ব্যবহার করা উচিত এবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে শুদ্ধ ইংরেজি ব্যবহার করা উচিত। প্রতিটি ভাষার একটা নির্দিষ্ট রূপ আছে, সৌন্দর্য আছে। সেটার মান বজায় রাখতে হবে। এ ছাড়া রাস্তার পাশে ভুল বানানে যেভাবে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও ভাষার বিকৃতি ঘটছে। সরকারিভাবে এখনই ভাষার বিকৃতি রোধে একটা সেল গঠন করা উচিত, যারা এসব বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে শুদ্ধ বানানে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করবে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করবে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডে অবশ্যই প্রমিত বাংলার ব্যবহার করতে হবে। যদি একান্তই ইংরেজি ব্যবহার করতে হয় তবে সেটা বাংলার নিচে ছোটভাবে লিখতে হবে। আমাদের এফএম রেডিওগুলোতে যেভাবে কথা বলা হচ্ছে, এটা একদম বন্ধ করতে হবে। এটা কোনোভাবেই মান ভাষা হতে পারে না। কারণ বাংলাভাষী কোনো অঞ্চলেই এর প্রয়োগ নেই।
ভাষাকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে কৃত্রিমভাবে এর রূপায়ণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বিদেশি ছবি যখন বাংলায় ডাবিং করে কিংবা এফএম রেডিওতে বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণে যে স্বরায়নটা (ইংরেজিতে ইন্টোনেশন) ব্যবহার করে, যার ব্যবহার বাংলা ভাষার কোনো অঞ্চলেই নেই, তখন সেটা গ্রহণ করা যায় না। তা ছাড়া প্রমিত এবং আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে 'করতেসি', 'যাইতেসি' ধরনের ভাষা সৃষ্টি করা হচ্ছে। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো অঞ্চলে এ ধরনের শব্দের প্রয়োগ হয়; কিন্তু এটাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষতিকর প্রভাবের কথা স্মরণ রাখতে হবে।
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এসেছে; চলেও যাবে কালের পরিক্রমায়। মাইকে জোরেশোরে গান বাজবে- 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি', 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়'। এরই মধ্যে ক্যামেরার সামনে এসে হয়তো কোনো তরুণ বা তরুণী বাংলা মাসের নাম বলতে গিয়ে বলে ফেলছে ঋতুর নাম। আবার ঋতুর নাম বলতে গিয়ে বলে ফেলছে মাসের নাম। বাংলা ভাষার ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা কোন জায়গায় পেঁৗছলে এমন অবস্থা হতে পারে তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার ব্যাপারে এমন ঔদাসীন্য মেনে নেওয়া যায় না। একদিনের আনুষ্ঠানিকতার ফ্রেমে না বেঁধে ছড়িয়ে দিতে হবে সব সময়ের জন্য। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; ভাষাকে উপলব্ধি করতে হবে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। জ্ঞানার্জনের জন্য নিঃসন্দেহে তাকেও রপ্ত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, 'ইংরেজি আমাদের জ্ঞানের ভাষা আর বাংলা হলো ভাবের ভাষা।' ইংরেজির মাধ্যমে আমরা জ্ঞানার্জন করতে পারি; কিন্তু আমাদের ভাব তথা সৃজনশীল চিন্তাচেতনা প্রকাশের মাধ্যম হবে অবশ্যই বাংলা। একইভাবে ইংরেজি ভাষা শেখা বা বলাটা অন্যায় নয়; কিন্তু বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে শেখা বা মিশিয়ে বলতে গিয়ে বাংলিশ (!) করে বলাটা অন্যায়। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।
ভাষা নিজস্ব রীতিতেই বদলাবে। এটাকে শুধু আইন দিয়ে আটকানো মুশকিল। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাকে নিয়ে যেতে হলে, এর একটা প্রমিত রূপ থাকতেই হবে। সে জন্যই ভাষা নীতিমালা দরকার। ভাষা নীতিমালা ভাষাকে ফ্রেমে আটকে রাখতে পারবে না; কিন্তু একটা কাঠামো ঠিক করে দাবি সে রাখবেই। তবে ভাষার মান, ভদ্রতা, শিষ্টতা বজায় রাখার স্বার্থে একটা জাতীয় নীতি দরকার। এই নীতি দেশের সব অঞ্চল থেকে উপাদান নিয়ে মান বাংলার উৎকর্ষ সাধনে কার্যকর করে ব্যবহারের শিক্ষা ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থাই ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রধানতম উপায়। শিক্ষক হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হবে ভাষাজ্ঞান, বিশেষত বাংলা ভাষাজ্ঞান। মনে রাখতে হবে, ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার ওপরে ভিত্তি করেই আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। তাই ভাষার শুধু আলোচনা বা নিরীক্ষা না করে, কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই।
লেখক, অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
murshedsm@du.ac.bd

মন্তব্য করুন