সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

চলমান সন্ত্রাস ও হিসাবের সরলীকরণ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬

এস.এম. আব্রাহাম লিংকন

৫ জুন পুলিশ সুপারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু ও নাটোরের খ্রিস্টান ব্যবসায়ী সুনীল গোমেজসহ বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যা সমগ্র দেশকে নাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে সুনীল গোমেজের হত্যার দায় আইএসের নাম করে স্বীকার করে বিবৃতি দেওয়া হলেও এ অপরাধে আসামি কারা তা এখনও অনুদ্ঘাটিত। একদা ধারণা ছিল- পুলিশ সব খবর রাখে। এখন কিন্তু সে ধারণাটি বদলাতে শুরু করেছে। যখন পুলিশ সুপারের স্ত্রীর হত্যাকারীরা অধরা থাকে তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না- সন্ত্রাসীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়ে বেশ এগিয়ে। বিগত কিছুদিনের ঘটনার হিসাব করলে চিত্রটির সত্যতা মেলে। নিকট সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধরা পড়লেও অবশিষ্টরা অধরাই রয়েছে। সন্ত্রাসীরা যখন কোনো একটি হত্যাকাণ্ড এক মিনিটেই সম্পন্ন করে উধাও হয়ে যায়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, কত পরিকল্পিত ও দক্ষ হলে এটি সম্ভব। তাদের এই দক্ষতা একদিনে অর্জিত হয়নি। একদা সর্বহারার নামে কেউ কেউ গলা কাটত। এখন আইএস, আনসারুল্লাহ বাংলা, জেএমবি, জামায়াত প্রভৃতি নামে হয়। আফগান স্টাইলে বিপ্লব করার মিথ্যা অজুহাতে জেনারেল জিয়া প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট মোহাম্মদ ফরহাদকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটক করেছিলেন। সেই দেশেই আবার 'আমরা সবাই তালেবান বাংলা হবে আফগান' স্লোগানদাতাদের আমরা তারিফ করেছি, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছি। রাষ্ট্রীয় শাসনভারের অংশীদারিত্ব দিয়েছি। ক্ষমতায় যেতে ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। ওদের সন্ত্রাসী না ভেবে ক্যাডার উপাধি দিয়েছি। এযাবৎকালে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যত ছাত্র ও শিক্ষক মৌলবাদীদের হাতে নিহত হয়েছেন, তার ক'টার বিচার সমাপ্ত হয়েছে? বিচারহীনতাও আজকের পরিস্থিতির অন্যতম অনুষঙ্গ।
সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা একদা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে নিজেদের বিকশিত করেছিল। বিকশিত উগ্র মৌলবাদ আজ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা করা সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু যখন সরকার-বিরোধিতার নামে কৃত সন্ত্রাসী কর্মটি রাষ্ট্রের আদর্শ ও অস্তিত্বের বিরুদ্ধে করা হয় তখন সেটি রাষ্ট্রদ্রোহ। চলমান সংকটকে অনেকেই আমরা সরকারের ব্যর্থতা বলে সরল অভিযোগ করে যাচ্ছি। যে কোনো নেতিবাচক ঘটনাই বিদ্যমান সরকারের ব্যর্থতার খতিয়ানে যুক্ত হয়। বিরোধীপক্ষ সেগুলোর সুযোগ নিয়ে থাকে, এটিও সুবিদিত। আবার দেশের প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধী দল একত্র হয়ে থাকে- এটি আমাদের দেশে বিরল ঘটনা। আমরা যে যে রাজনীতিই করি না কেন; রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য আমাদের থাকতেই হবে। সেটি কিন্তু আমাদের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখে থাকলেও কর্মে প্রতিফলিত হচ্ছে না। সম্প্রতি নিজামীর দণ্ড কার্যকরের পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যেভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি- কারোরই কোনো বাক্য খরচ দেখি না। নিজামীরা যে বাংলাদেশকে মানত না; তারা যে এখনও পাকিস্তানি- তা কিন্তু পাকিস্তানের সংসদ সর্বসম্মতভাবে প্রমাণ করেছে। ক্যামেরাপ্রিয় বাকপটু রিজভী আহমেদরা কিংবা চতুর এরশাদ কেউই কিন্তু এর নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ নেননি। ইসলামের নাম ব্যবহার করে এদেশে এখন অসংখ্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আছে। তাদেরও কোনো শব্দ নেই। ইসলামের নামে বোমা ফাটায় কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এদের টুঁ শব্দটি নেই।
আমাদের অনেকের ধারণা আছে, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। ফলে পাকিস্তান যদি সরকার হটাতে কোনো সহযোগিতা দেয় সেটি নীরবে হলেও সমর্থনযোগ্য। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও তার আদর্শবিরোধী শক্তির একটাই কাজ বর্তমান সরকারকে হটানো। এ উদ্দেশ্যে তারা নানা পথে হাঁটাচলা করছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল না- এ নিয়ে কুণ্ঠা নেই। কিন্তু যে ধ্বংসযজ্ঞ ছিল সেটির জনক আবার বিএনপি-জামায়াত। তারা ভোট প্রতিরোধে হরিহর আত্মায় কাজ করেছে। শত হত্যাকাণ্ডের পরও যখন নির্বাচন প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি তখন চেষ্টা করেছে যাতে আন্তর্জাতিক দুনিয়া সমর্থন না দেয়। তারা আমেরিকান সমিতি, ইউরোপ সমিতির বহু কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সভা-সমিতি করলেও সেটি কাজে দেয়নি। বরং ওইসব সমিতিভুক্তরা বলেছেন, যে কোনো সাংবিধানিক সরকারের সঙ্গে তাদের কাজ করতে বাধা নেই। বর্তমান সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের দোলাচলে পড়লেও সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াও দমনে সফলতার কারণে ব্যাপক জনসমর্থন বেড়েছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। পক্ষান্তরে সরকারবিরোধীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পাকিস্তান ছাড়া সমগ্র বিশ্বে সমালোচিত হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী দল গঠনমূলক রাজনীতি না করায় যেমন জনসমর্থন হারিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের আস্থাহীন করে ফেলেছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে সফল নয়_ এ ব্যর্থতার চিত্র স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রকটভাবে প্রতিফলিত। ৬৪ জেলার নির্বাচনে কুড়িগ্রাম জেলা ব্যতীত কোনো জেলাতেই বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি-জামায়াত অবস্থান নিতে পারেনি। এসব সামগ্রিক ব্যর্থতা দলের অভ্যন্তরের নেতাকর্মীদের হতাশ করেছে। অথচ এই সরকারকে না হটালে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। অনেক সময় রাজনীতির হতাশা কাটিয়ে কর্মীদের উজ্জীবিত করতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ঘটনা অনেকেই ঘটান। এ ঘটনাগুলো সেসব নেতিবাচক রাজনীতির ফর্মুলায় কি-না সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।
একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়; জাপানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক ও সরকারপ্রধান হিসেবে বিশ্বনেতৃবৃন্দের তার নেতৃত্ব ও তার সরকারকে প্রশংসার ছবি-খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক বেশি। ঘটনাগুলো ঘটিয়ে তারা বিশ্ববাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করছে- বিশ্বনেতৃবৃন্দ ভুল ঠাকুরে পূজা দিচ্ছে। ঘটনাগুলো পরিকল্পিত- তা অপারেশন ক্যারেক্টার দেখেই বোঝা যায়। হিন্দু-বৌদ্ধদের হত্যা, বিদেশি হত্যা- সবকিছুরই উদ্দেশ্য দেশে যেমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা তেমনি এ সরকারের কাছ থেকে সমর্থন যাতে প্রত্যাহার করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো, তার জন্য একটা ক্ষেত্র তৈরি করা। তাদের বিশেষ চেষ্টা রয়েছে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে একটা কোণঠাসা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া, যাতে ভারতের বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি বিরাগ হয়। আমাদের ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্যগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিবারের ওপর আক্রমণ একটি নতুন কৌশল, যাতে তারা সরকারের প্রতি নেতিবাচক হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন; অনেকেই ভুল উপস্থাপনাও করছি- প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী প্রধান হিসেবে মোদ্দা কথাটি জানেন, কারা এর ইন্ধনদাতা ও পরিকল্পনাকারী, কারা এগুলো করাচ্ছে সেটিই হয়তো বলার চেষ্টা করেছেন। তিনি কিন্তু এক্সিকিউটরদের কথা বলেননি। সরকারের পতন ঘটাতে সন্ত্রাসীরা কোনো শক্তি নয়, কিন্তু সরকারকে বিব্রত করতে সন্ত্রাস অবদান রাখে। ১৯৭১-এ আমরা বিজয়ী হয়েছি কিন্তু জামায়াত বা স্বাধীনতাবিরোধীরা মনে করে তারা পিছিয়ে পড়েছে; পরাজিত হয়নি। পাকিস্তান পার্লামেন্টের নিজামীর নিশান-ই পাকিস্তান খেতাবের সিদ্ধান্ত কিন্তু সে সত্যকে প্রকাশ করেছে। এখানে সরকারের পতন হলে কারা সুবিধাভোগী হবে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। এটিকে এড়িয়ে সরলীকরণ করলে আমাদের খেসারত দিতে হবে।
আইনজীবী ও সাবেক রাকসু নেতা
abrahamlincoln66@gmail.com