জঙ্গিবাদ নির্মূল হবেই

বিচারকের আত্মদান

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০১৬

মহসিনুল হক

এ দেশে কবে, কখন, কীভাবে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও '৭১-এর পরাজিত শক্তি পাকিস্তানিদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর-আলশামস বাহিনীর সমর্থকরাই যে এ সময়ের জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেপথ্য খলনায়ক সে বিষয়টি আজ পরিষ্কার। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব জঙ্গি সংগঠন কাজ করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে_ জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি, জাগ্রত মুসলিম জনতা, হরকাতুল জিহাদ-হুজি, জাদিদ আল কায়দা, আল্লাহর দল, হিজাব-উত-তৌহিদি, হিযবুত তাহ্রীর, লিবারেটেড ইয়ুথ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, বাঁশের কেল্লা (অনলাইনভিত্তিক) প্রভৃতি।
পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনে দেখা মেলে জঙ্গিদের দেশের ভিন্ন অঞ্চলে সংগঠিত হওয়ার খবর। এমনও খবর প্রকাশ হচ্ছে যে, জামায়াত-শিবিরের ছত্রছায়ায় জঙ্গিরা আবার একত্র হয়ে দেশের প্রশাসন যন্ত্রসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের সংগঠিত করার কাজে আগের মতোই সার্বিক সহযোগিতা করছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।
ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিশ্বব্যাপী ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও তারা ইসরায়েলের ব্যাপারে একদম নিশ্চুপ। ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও ইসরায়েলের ইসলামবিরোধী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি দেয় না আইএস। আরও বিস্ময়কর হচ্ছে, আইএসের বিরুদ্ধে সারাবিশ্ব যুদ্ধ ঘোষণা করলেও ইসরায়েলের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। মাসতুতো ভাইয়ের মতোই একে অন্যকে নীরবে সমর্থন ও পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করছে তারা।
১১ বছর আগে ১৪ নভেম্বর ২০০৫ সালে জেএমবির বোমা হামলায় নিহত হন দুই সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদ। এর আগে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সে বছরের শেষ ৫ মাসে ২৫টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ-বাংলা টিম ও জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। হামলায় নিহত হন দুই বিচারক এবং বিদেশি নাগরিকসহ ১৯ জন। এসব হামলার পর আবার আইএস এবং আল কায়দার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলামের নামে দায় স্বীকার করা হয়েছে। ওইসব ঘটনার পর ক্রমাগতভাবে জঙ্গিরা ব্লগার রাজীব, অভিজিৎ, অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর রহমান, নীলাদ্রি, আরিফ রহমান, ফয়সাল আরেফীন দীপনকে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে জঙ্গিরা ১ জুলাই রাজধানীর গুলশান এলাকার হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলা করে দেশবাসীসহ বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। যেখানে পুলিশ দু'জন, বিদেশি ২০ জন ও জঙ্গি ৬ জন নিহত হয়েছে। এর এক সপ্তাহ যেতে না যেতে ৭ জুলাই ২০১৬ দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জ জেলার শোলাকিয়া ময়দানে জঙ্গিদের হাতে চারজন নিহত হন। চারজনের মধ্যে দু'জন পুলিশের কনস্টেবল। তাদের নাম জহিরুল হক ও আনসারুল। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রানী ভৌমিক নামে এক নারীও নিহত হয়েছেন। আরেকজনের পরিচয় জানা যায়নি। এসব ঘটনা দ্বারা অনুমান করা যায় যে, বাংলাদেশ জঙ্গিদের অন্যতম টার্গেট রাষ্ট্র। এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো এই যে, পুরো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এবং দেশের সরকারকে সমালোচনার পাত্রে পরিণত করা।
গত কয়েক বছরে সারাদেশে উগ্রপন্থিদের অর্ধশত টার্গেটেড কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিচারক, লেখক-প্রকাশক, শিক্ষক, বিদেশি নাগরিক, পুলিশ, ইউএসএইড কর্মকর্তাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের টার্গেটেড কিলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। উগ্রপন্থিদের হাত থেকে বাদ যায়নি বিখ্যাত আলেম জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ফারুকীও। জঙ্গিরা তাকেও হত্যা করেছে। জানা যায়, গত ১৬ মাসে সারাদেশে ৪৫টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৭ জন। ২০১৫ সালের প্রথম ৫ মাসে চারটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ১১ জন। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাস ৫ দিনে ১৬টি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন ১৭ জন ।
প্রাসঙ্গিকভাবে একটি বিষয় আজ উল্লেখ করতে চাই। গত ১ জুলাই জঙ্গিরা রাজধানীর গুলশান এলাকার হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলা ছিল কাপুরুষোচিত কাজ। এ ঘটনার মধ্যেও একটি নৈতিক বিষয় আমাদের আশান্বিত করেছে। 'ফারাজ' নামে এক তরুণের কাহিনী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছে। এই ফারাজ যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ইমোরি ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন। ছুটিতে দেশে এসে তিনি গত ১ জুলাই বন্ধুদের সঙ্গে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। ঢাকার স্যার জন উইলসন ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী তিনি। প্রকৃত বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বন্ধুদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম ও জাতীয়তার মানুষের মানবিকতাকে একসূত্রে সংযুক্ত করেছেন। সেদিন তার সঙ্গে ছিল দুই বন্ধু। সন্ত্রাসীরা ফারাজকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল; কিন্তু ফারাজ ঘোষণা দিলেন বন্ধুদের বিপদের মুখে রেখে তিনি চলে যাবেন না। মৃত্যুকেই শ্রেয় বলেই মেনে নেন তিনি। সে রাতে ফারাজ ও তার বন্ধুরাসহ প্রাণ হারালেন অন্তত ২৪ জন। এর মধ্য দিয়ে একটি ঘটনা প্রমাণিত যে, বাংলাদেশের তরুণরা নৈতিকভাবে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে শিখেছে।
জঙ্গিবাদ কোন ধর্মের নয়। তাই জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে জঙ্গিবাদ উত্থানের বিরুদ্ধে জাতি, দল, ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে আজ এসব জঙ্গির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই যে_ সরকারের মধ্যে যেসব জঙ্গিবাদের দোসর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। তবে যা কিছুই করা হোক না কেন, এদের দমন করতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রসার ও প্রচার বাড়িয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাগ্রত করতে হবে। জঙ্গি দমনের পাশাপাশি উগ্র মৌলবাদী বা যে কোনো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে জয়ী হতে হলে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রসার ও প্রচারে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
আজকের দিনটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে, ২০০৫ সালের এদিনে বাংলাদেশের বিচার অঙ্গন থেকে চিরদিনের জন্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। দুটি তরুণ-তাজা প্রাণ সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং সিনিয়র সহকারী জজ শহীদ সোহেল আহমেদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা সেদিন মুহূর্তেই জেনেছিল বিশ্ববাসী।
প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর এলে দেশের সব বিচারক এক ধরনের মানসিক কষ্টে জর্জরিত হন। 'জগন্নাথ' এবং 'সোহেল' আমাদের বিচার বিভাগকে যেভাবে ঋণী করে গেছেন তা কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়। নিজ অফিসে যাওয়ার সময় ১৪ নভেম্বর ২০০৫ সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে তারা দু'জন জঙ্গিদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পৃথিবীতে এমন কিছু ঋণ আছে, যা শোধ করার চেষ্টা করাও অন্যায়। জগন্নাথ এবং সোহেলের ঋণও শোধ করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের অনেক অখ্যাতকে স্মরণ-বরণ করা হয়। এক সময় নতুন প্রজন্মের কাছে সময়ের ব্যস্ততা এবং বাস্তবতার কারণে জগন্নাথ-সোহেলের স্মৃতি ম্লান হয়ে যাবে। হয়তোবা আমরাও ভুলে যাব তাদের। তবে আর কিছু না হোক, প্রতি বছর যদি ১৪ নভেম্বরের দিনটিকে আমরা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'জঙ্গিবাদবিরোধী দিবস' হিসেবে ঘোষণা করতে পারি, তবেই হয়তো জগন্নাথ-সোহেল দেশবাসীর স্মরণে থাকতে পারে। এটা করতে পারলে জাতি হিসেবেও আমরা কিছুটা দায়মুক্ত হতে পারব।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (উপসচিব) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, ঢাকা