বাংলা লিপির উৎপত্তি

ভাষার মাস

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭     আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭      

ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী


বাংলা লিপির প্রাচীনতা এবং তার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে অনেকের মনেই কৌতূহল রয়েছে। সাধারণভাবে এ প্রসঙ্গে কিছু কথা এই নিবন্ধে আলোচিত হলো; যাতে করে এ বিষয়ে আগ্রহী পাঠকরা একটা মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারেন।

এ কথা আমাদের সবারই জানা, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে দুই ধরনের লিপি প্রচলিত ছিল। এর একটি ব্রাহ্মী লিপি, অপরটি খরোষ্ঠী লিপি। এই দুই লিপিতেই মৌর্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকালের অসংখ্য শিলালিপি উৎকীর্ণ হয়। খরোষ্ঠী লিপি লেখা হতো ডান থেকে বামে; পক্ষান্তরে ব্রাহ্মীলিপি লেখা হতো বাম থেকে ডানে। খরোষ্ঠী লিপি ভারতবর্ষে আসে সেমিটিক ব্যবসায়ী শ্রেণির মাধ্যমে। অনেকের অনুমান, পারস্য সম্রাট দারার রাজত্বকালে এই লিপি প্রাচীন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় বিস্তৃতি লাভ করে। সম্রাট অশোকের শাহবাজগঢ়ী এবং মানশেরা শিলালেখ খরোষ্ঠীতে খোদিত। তবে সম্রাট অশোকের পরে খরোষ্ঠী লিপির ব্যবহার যে কারণেই হোক লোপ পায়। কারণ এ সময়েই প্রাচীন ভারতের সাধারণ লিপি হয়ে দাঁড়ায় (common script) ব্রাহ্মী লিপি। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ব্রাহ্মীলিপি ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে অঞ্চলভেদে এর আকার বদলাতে শুরু করে। কারণ লিপিকারের রুচি, সংস্কার ও লিখন সরঞ্জামের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রত্যেক দেশেই জনগণের মধ্যে একটি বিশিষ্ট লিখনরীতি দাঁড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এ জন্য দেখা যায়, ভারতবর্ষের এক একটি অঞ্চলে জনগণের মধ্যে প্রচলিত ব্রাহ্মীলিপির আলাদা আলাদা ছাঁচ তৈরি হতো। পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মীলিপির এরূপ বিভিন্ন অঞ্চলের রূপভেদ থেকেই আধুনিক ভারতীয় বর্ণমালার লিপিগুলোর উদ্ভব হয়েছে। এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে, ব্রাহ্মীলিপির উৎস কী? কোথা থেকে এলো? এর জবাব দু'রকম হতে পারে। একটি হতে পারে, হয়তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের কোনো চিত্রলিপি (pictograph) থেকে যে লিপির উদ্ভব হয়েছিল, তাই কালক্রমে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মীলিপিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

বাংলা লিপির উৎপত্তি

ব্রাহ্মীলিপির উৎপত্তি সম্পর্কে দ্বিতীয় মতটি হলো, ব্রাহ্মীর প্রাচীন লিপি উপাদান অভারতীয়। বিদেশি কোনো জাতির কাছ থেকে ভারতীয়রা ওই লিপির উপাদান ধার করেছিল। পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার প্রিন্সেপ, ওয়েবার, বুলার প্রমুখ এই দ্বিতীয় মত পোষণ করেন। ম্যাক্সমুলার একখানে লিখেছেন_

Before the time of Panini or before the spread of/Buddhism in India writing was absolutely unknown.

এদের বক্তব্য, গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের ভারত জয়ের পরবর্তী সময়ে, ভারতে গ্রিকদের যাতায়াত শুরু হয়। এই গ্রিক নাগরিকদের দ্বারাই প্রাচীন গ্রিস থেকে গ্রিক বর্ণমালা ভারতে চলে আসে; যা ক্রমান্বয়ে ভারতীয়রা আত্মীকৃত করে সাধারণ লিপিতে পরিণত করেন। এদের আরও বক্তব্য রয়েছে যুক্তির সপক্ষে, তা হলো প্রাচীন সেমেটিক লিপির সঙ্গেও ব্রাহ্মীলিপির সাদৃশ্য। সেমেটিক লিপির ফিনিসীয়, আরবি, হিব্রু বর্ণমালা লেখা হয়ে থাকে বাম থেকে ডানে। ব্রাহ্মীলিপিও একসময় বাম থেকে ডানে লেখা হতো। এ প্রসঙ্গে উপর্যুক্ত পণ্ডিতদের অভিমত, প্রাচীনকালে সেমীয়দের লিপির আঁধারে ভারতীয় আর্যরা প্রয়োজন অনুসারে সংস্কার ও পরিমার্জনা করে ব্রাহ্মীলিপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পণ্ডিত বুলারের অভিমত, ব্রাহ্মী বর্ণমালার বাইশটি চিহ্ন উত্তর সেমীয় লিপি থেকে সোজাসুজিভাবে ব্রাহ্মীলিপিতে চলে এসেছে; বাকিগুলো ওই আদলেই পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে। তার ধারণা, ফিনিসীয় বণিকদের যখন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে ঘন ঘন যাতায়াত ছিল; তখনই এই লিপি এ দেশে চলে আসে। তাদের বাটখারায় সেমীয় লিপিতেই পরিমাণ লেখা থাকত।

ব্রাহ্মীলিপি এ দেশেরই Indigenous productনাকি বাইরে থেকে এসেছে এ কথা সঠিকভাবে প্রমাণিত হবে তখন, যখন আমরা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহরগুলোর পাঠোদ্ধার করতে সমর্থ হবো। এই সিলমোহরগুলোর ওপর অনেক লিপিচিহ্ন রয়েছে; তাতে কী লেখা রয়েছে তার সঠিক পাঠোদ্ধার এখনও হয়নি। তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের অভিমত, এই লিপি লেখা হতো ডান থেকে বামে। এই অভিমত যদি সঠিক ধরে নিই; তাহলে এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যাবে ব্রাহ্মীলিপির প্রাচীন উৎস অবশ্যই ভারতীয় নয়।

ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা লিপির উৎপত্তি সম্পর্কে এ কথা বলতে হয় যে, উত্তর ভারতেও ব্রাহ্মীলিপির আকারগত পরিবর্তন প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়। কুষাণ ও গুপ্ত সম্রাটদের আমলে উত্তরী ব্রাহ্মী বর্ণগুলো বদলে যায় এবং খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে দেশভেদে এর তিনটি রূপ পরিলক্ষিত হয়। ব্রাহ্মীর এই ত্রিরূপ থেকেই উত্তর ভারতীয় আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি হয়েছে। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ব্রাহ্মীর যে বিশেষ রূপটি প্রচলিত ছিল তাকে বলা হয় 'সারদা' লিপি। উত্তর ভারতের মধ্য প্রদেশে ব্রাহ্মীলিপির যে রূপটি বিকাশ লাভ করেছিল, তা 'নাগরলিপি' নামে বিকাশ লাভ করে। আর এই 'নাগরলিপি' থেকেই 'দেবনাগরী' বর্ণমালার উদ্ভব ঘটেছে। অপরদিকে উত্তর ভারতের পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে ব্রাহ্মীর যে পরিবর্তিত রূপটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার নাম দেওয়া হয় 'কুটিল লিপি'। 'কুটিল লিপি'র কালক্রমিক পরিণতিই যে আমাদের বাংলা লিপি সে বিষয়ে পণ্ডিতরা সবাই মোটামুটি একমত।

বাংলাদেশে গুপ্ত শাসনামলে যে প্রাদেশিক লিপিমালার স্বাতন্ত্র্য পরিলক্ষিত হয়, তা ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে পরিপুষ্ট হয়। উপমহাদেশীয় লিপির ঘরানা থেকে এ সময়ই উদ্ভব ঘটে বাংলা লিপির। এই লিপির প্রথম সন্ধান লাভ করা যায় ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত সমাচার দেবের (আনুমানিক ৫২৫-৬০০ খ্রিস্টাব্দ কালের) তাম্র শাসনে। দশম শতাব্দীর শেষ ভাগে বাংলার শাসক পাল রাজারা যখন চরম দুর্দশায় পতিত হন, তখন দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপাল পিতৃ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বিলুপ্ত পিতৃ রাজ্য উদ্ধার করে পাল সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন।

এই মহীপালের শাসনকালের স্বাক্ষরবহ তৃতীয় ও চতুর্থ সংবৎসরে বিষ্ণু ও গণেশ মূর্তির পাদপীঠে উৎকীর্ণ দুটি নিদর্শন পাওয়া গেছে কুমিল্লা জেলার বাঘাউরা এবং নারায়ণপুর নামক স্থান থেকে। ওই পাদপীঠের লিপি থেকে জানা যায়, সিংহাসনে আরোহণের দুই-তিন বছরের মধ্যেই তিনি পূর্ববঙ্গ অধিকার করেছিলেন। মহীপালের বাণগড় লিপিতে সংযোজিত অ, উ, ক, খ, গ, ধ, ন, ম, ল, জ এবং ক্ষ অনেকটা বাংলা অক্ষরের আকার ধারণ করেছে। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার দেওপাড়ায় প্রাপ্ত দ্বাদশ শতাব্দীতে উৎকীর্ণ বিজয় সেনের 'বঙ্গাল প্রশস্তিতে যে লিপি ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে ২২টি একেবারে পুরোপুরি বাংলা অক্ষর। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই আমরা সম্পূর্ণ বাংলা লিপি পাই তাম্র শাসনের মাধ্যমে। সমসাময়িক কালে প্রাপ্ত যে কোনো তাম্র শাসন নিরীক্ষা করলেই এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সহজতর হবে। তবে উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত বাংলা লিপির ক্ষেত্রে যে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছে, তা বলাই বাহুল্য।

pr_saif@yahoo.com

অধ্যাপক, লিবারেল আর্টস, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর ও প্রাক্তন অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়