বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক :প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০১৭      

মো. আবদুর রশীদ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাত বছর পর দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাচ্ছেন ৭ এপ্রিল। সময়ের সঙ্গে দু'দেশের সম্পর্কে পারস্পরিক আস্থার জায়গা যেমন পোক্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। এবারের সফর দু'দেশের সম্পর্কের কৌশলগত উল্লম্ফন ঘটিয়ে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে অনেকে মনে করছেন। প্রাপ্তির সমীকরণ থেকে মানুষের মনে অনেক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে দু'দেশের সম্পর্ক ঘূর্ণায়মান। দুই দেশের মানুষের বন্ধন মাটি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি ঘিরে গড়ে উঠেছে, যা বাস্তবিকভাবে অবিচ্ছেদ্য এবং অন্য দেশের সম্পর্ক থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। একে অপরের ক্ষতি না করার মন্ত্র অবিশ্বাস ও অনাস্থা দূর করবে।
প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের ভারত সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। চিরাচরিতভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয় কিন্তু অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণে তেমন বিতর্ক দেখা যায় না। ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা-সম্ভাবনার খবর বিতর্কের মাত্রা বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা বিতর্ককে উচ্চকিত করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক চীনের সঙ্গে তুলনা করে নতুন অঙ্ক কষতে গিয়ে অনেকেই হাবুডুবু খাওয়া শুরু করেছে। সফরের আগেই দু'দেশের লেনদেন নিয়ে সমর্থিত, অসমর্থিত ও কল্পিত ধারণা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
গত অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় ২৭টি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং বাংলাদেশ নৌবহরে দুটি চীনা সাবমেরিনের সংযোজন ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা তৈরিতে উদ্যোগী করেছে বলে শঙ্কার মাত্রাকে উঁচুতে চড়ানো গেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে চীন। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাইরের শক্তি হিসেবে চীনের উপস্থিতি শুধু ভারত নয়, উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা যেমন সামরিক জোট তৈরি করে, তেমনি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও স্বার্থের অভিন্নতা একে অপরকে কাছে নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে এড়িয়ে বাণিজ্য স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্ক হয় কিন্তু আপদ-বিপদ ও নিজ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়ানো বন্ধু পাওয়া দুষ্কর।
চীন-পাকিস্তান সখ্য, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং ভারত ও চীনের মধ্যে আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাস্তব হলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পথ চলবে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার তাগিদ নিয়ে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীনের ভেটো বাংলাদেশের উদ্যোগের পক্ষে ছিল বলে মনে করার কারণ নেই। পাকিস্তানের জঙ্গি নেতা মাসুদ আজহারের নাম আন্তর্জাতিক জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের ভেটো লক্ষ্য করার মতো।
ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে কিছু লক্ষণীয় বাস্তব ঢেকে রাখা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবর্তিত হয়নি কখনও। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মিলে দেশ স্বাধীন করেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পররাষ্ট্রনীতি দিক পাল্টেছে। পাকিস্তান বন্ধু হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয় একটিরও সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কখনোই বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা না গেলেও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি উদ্যোগ শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা প্রসারিত করে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়েছে।
অন্যদিকে গত ৪৭ বছরে দু'দেশের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হয়নি এবং খুব একটা যুদ্ধের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। স্থল সীমানা ও সমুদ্রসীমাসহ অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান হয়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৌ ও স্থল যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন ক্ষেত্রে দু'দেশের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে। দু'দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অনেক আগেই পথচলা শুরু করেছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, সফর, পোতাশ্রয় ভ্রমণ, সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সহযোগিতা চলমান।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অবয়ব আমরা জানি না এখনও। তবে সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খর্বের শর্ত না থাকলে এবং সামরিক জোটের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে সামরিক সহযোগিতা হতে কোনো বাধা নেই। রাজনৈতিকভাবে বন্ধুকে সামরিকভাবে বৈরী ভাবার কোনো যুক্তি নেই। উপরন্তু সামরিক সহযোগিতা প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা দূর করে এবং অবিশ্বাস তাড়ায়।
প্রতিরক্ষা একটি ব্যাপক শব্দ, যেখানে সেনা মোতায়েন থেকে শুরু করে যুক্ত কৌশল তৈরি, ঘাঁটি ব্যবহার, যৌথ মহড়া, যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, তথ্যবিনিময়, সাহায্য ও উদ্ধার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামরিক অবকাঠামো বিনির্মাণ, সামরিক শিল্প ও স্থাপনা তৈরি এবং বেসামরিক বিনিয়োগ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সেনা মোতায়েন ও ঘাঁটি তৈরি বা ব্যবহার ব্যতিরেকে অন্য ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী সুযোগ কাজে লাগাতে অসুবিধা নেই।
সব শীর্ষ সফরে প্রত্যাশা তৈরি হয়। তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের প্রত্যাশা থাকলেও ভারতের পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। তবে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে ভারতের অঙ্গীকার বহাল থাকায় আমরা আশান্বিত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির বাস্তবায়ন হলেও সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের মানুষকে পীড়িত করে। শূন্যে নামিয়ে আনার চ্যালেঞ্জটা ভারতকেই নিতে হবে।
প্রতিরক্ষার অন্তর্নিহিত বিষয় অনুধাবন ও উল্লেখ না করে দেশ বিক্রির ধুয়া তুলে সম্পর্ক উন্নয়নের বিরোধিতা করা হচ্ছে। বিষয়টি যত না সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তার চেয়ে বেশি রাজনীতিনির্ভর। যারা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে সামরিক সহযোগিতায় পেঁৗছেছেন, তারা ভারতের সঙ্গে সহযোগিতাকে সমর্থন করেন না। পাকিস্তানের ভারত-বিরোধিতা একটি অস্তিত্ব রক্ষাকেন্দ্রিক জাতীয় কৌশল। বহুজাতিক বিচিত্রতা সমৃদ্ধ পাকিস্তান টিকে থাকার জন্য ধর্ম ও ভারত বৈরিতাকে জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ভারত বৈরী অবস্থান প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করে। ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরির জন্য পাকিস্তান অঢেল অর্থ ব্যয় করে।
যেমন প্রতিবেশী দেশ বদলানোর কোনো সুযোগ নেই, তেমনি বড় প্রতিবেশী দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বড় প্রতিবেশী মানে আগ্রাসন, দখলদারি, খবরদারি এবং সুবিধাবাজ ভাবার কোনো কারণ নেই। নেতৃত্বের দৃঢ়তা, অর্থনৈতিক সমর্থতা ও কূটনৈতিক দক্ষতাই পারে জাতীয় স্বার্থ ধরে রেখে বড় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
এবারের সফরে অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প নির্মাণ খাতে ৩ থেকে ৫ মার্কিন ডলারের প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক সহায়তা থাকবে। আলাদা সামরিক সাহায্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভুটানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যৌথ বিনিয়োগ এবং ভারতের ওপর দিয়ে আমদানিতে ভারতের সম্মতি ছাড়াও স্থল সীমান্ত বন্দর উন্নয়নসহ আরও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের দৃঢ়তা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিতের মূল আস্থার জায়গা।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল; স্ট্র্যাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আই ক্ল্যডস) নির্বাহী পরিচালক

পরবর্তী খবর পড়ুন : মেগা প্রকল্পে বিলম্ব নয়

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে

প্রায় তিন দশক পর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু ...

ইটভাটায় আইন লঙ্ঘনের জরিমানা বাড়ছে

ইটভাটায় আইন লঙ্ঘনের জরিমানা বাড়ছে

পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ইটভাটা নির্মাণ ও ইট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আইন ...

শাঁখারি কার্ত্তিকের 'বাড়ি' বাঁচানোই দায়

শাঁখারি কার্ত্তিকের 'বাড়ি' বাঁচানোই দায়

শাঁখারি কার্ত্তিক চন্দ্র সেন। বাড়ি ডেফলচড়া শাঁখারিপাড়া। পাবনার চাটমোহর উপজেলার ...

মন্ত্রিসভায় উঠছে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত আইন

মন্ত্রিসভায় উঠছে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত আইন

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে নতুন আইন করছে সরকার। ...

নতুন নৌবাহিনী প্রধান আওরঙ্গজেব চৌধুরী

নতুন নৌবাহিনী প্রধান আওরঙ্গজেব চৌধুরী

নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন এ এম এম এম আওরঙ্গজেব ...

অন্যকে ফাঁসাতে গর্ভের সন্তানকে হত্যা!

অন্যকে ফাঁসাতে গর্ভের সন্তানকে হত্যা!

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ১ মাসের শিশু সন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগে ...

মাদ্রাসা শিক্ষকের একী কাণ্ড!

মাদ্রাসা শিক্ষকের একী কাণ্ড!

সিলেবাস দেওয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে নিয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া ...

ভুয়া ভোটে নির্বাচিতরা ভুয়া প্রতিনিধি: সেলিম

ভুয়া ভোটে নির্বাচিতরা ভুয়া প্রতিনিধি: সেলিম

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম একাদশ জাতীয় ...