ভ্রান্তি অবসানে আর কালক্ষয় নয়

জাতীয় সঙ্গীত

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৮      

ড. সাখাওয়াৎ আনসারী

সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদের (১) দফায় ঘোষিত হয়েছে- "প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সঙ্গীত 'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম দশ চরণ।" জাতীয় সঙ্গীত সম্পর্কিত বিধানাবলি আইনের দ্বারা নির্ধারিত হবে বলে উল্লেখকৃত হয়েছে এর (৪) দফায়। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রাষ্ট্র অনুমোদিত কোনো রেকর্ড নেই। অধিকন্তু রয়েছে এর কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের সুর, গায়কী ও তথ্য সংক্রান্ত নানা বিভ্রান্তি। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর হওয়ায় বলা যেতে পারে, সাংবিধানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতীয় সঙ্গীতটি আমরা সুনির্দিষ্ট বিধান ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদনহীনভাবে গেয়ে চলেছি। দ্রুত এ অবস্থার অবসান কাম্য।

রবীন্দ্রনাথের মোট ২২৩২টি গানের মধ্যে 'স্বদেশ' পর্বভুক্ত গানের সংখ্যা ৪৬। স্বদেশি এই গানগুলোর বড় একটি অংশই রচিত হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের কালে। বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধিতায় কলকাতা তখন উত্তাল; চলছে বিলেতি দ্রব্য বর্জনের শপথসহ নানা কর্মকাণ্ড। এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এই সময়েই তিনি লিখেছিলেন স্বদেশ পর্বের বিখ্যাত এই গানটি। এর পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। ফলে জানা যায়নি রচনার সুনির্দিষ্ট তারিখও। তবে গানটি প্রথম গীত হয়েছিল সমবেতভাবে কলকাতার টাউন হলে, ২৫ আগস্ট ১৯০৫ (৯ ভাদ্র ১৩১২) তারিখে। সভার উদ্বোধন হয় নবরচিত এই গানেরই মাধ্যমে। প্রথমবার শোনার পর গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, সভাপতির ভাষণের পর এটি পুনর্গীত হয়েছিল। গানটি গাওয়ার সময় সভায় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে যান এবং গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। সেই শুরু; এর পর বঙ্গভঙ্গের আগে ও পরে কলকাতার কত অনুষ্ঠানে কতবার যে এটি গাওয়া হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। ধীরে ধীরে এটি কলকাতা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। ওই বছরেরই ৭ সেপ্টেম্বর (২২ ভাদ্র) 'সঞ্জীবনী' পত্রিকায় গানটি রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরসহ প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পর রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত আশ্বিন সংখ্যা 'বঙ্গদর্শন' (পৃ. ২৪৭-৪৮), ২৭ সেপ্টেম্বর (১১ আশ্বিন) প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের 'স্বদেশ' পুস্তক এবং ৩০ সেপ্টেম্বর (১৪ আশ্বিন) রবীন্দ্রনাথের 'বাউল' পুস্তিকায় এই গানটি মুদ্রিত হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে- প্রথমবার গীত হওয়ার মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে এই গানটি চারবার মুদ্রিত হয়। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ চারণকবির এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন যে, মাসখানেকের মধ্যে তিনি যে ২২-২৩টি গান রচনা করেছিলেন, সেগুলো তৎকালে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। গানগুলো শেখার জন্য মানুষ এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিল যে, কলকাতার বিখ্যাত ডন সোসাইটিকে রবীন্দ্রনাথের শুধু স্বদেশি গানগুলোই শেখানোর জন্য ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এর সবকিছুই 'আমার সোনার বাংলা'সহ অপরাপর গানের জনপ্রিয়তা-নির্দেশক।

বঙ্গভঙ্গের কাল থেকে রবীন্দ্রনাথের গানে বাউলের সুর লভ্য। শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি লালনের গানের সঙ্গে যেমন, তেমনই পরিচিত হয়েছিলেন গগন হরকরার (পূর্ণ নাম :গগনচন্দ্র দাম, ১৮৪৫? - ১৯১০?) গানের সঙ্গেও। গগনের গানগুলো সংগ্রহ করে (১৮৮৯ খ্রি.) রবীন্দ্রনাথই প্রথম 'প্রবাসী পত্র' পত্রিকায় প্রকাশও (১৩২২ ব.) করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাগিনী সরলা দেবী 'লালন ফকির ও গগন' শীর্ষক একটি প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন, যাতে গগনের 'আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে' গানটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সরলা কর্তৃকই 'শতগান' শীর্ষক একটি গ্রন্থও প্রকাশিত (বৈশাখ ১৩০৭ ব.) হয়েছিল, যেখানে এই গানটির স্বরলিপিও তিনি করেছিলেন। 'আমার সোনার বাংলা' গানটির সুর তৈরি হয়েছিল গগনের এই গানের সুরেই। 'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম স্বরলিপি রবীন্দ্রনাথের ভাতিজি ইন্দিরা দেবী কর্তৃক কৃত, যা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর-সম্পাদিত 'সঙ্গীত-প্রকাশিকা'য় (আশ্বিন ১৩১২ ব., পৃ. ১৩-১৭) প্রকাশিত হয়। এতে গানটির সুর উল্লেখ করা হয় 'বাউলের সুর'। এই স্বরলিপিটির ৬৬ বছর পর এর আরও একটি স্বরলিপি প্রকাশিত হয় 'স্বরলিপিপত্র' ১৩৭৮-এ; স্বরলিপিকার শান্তিদেব ঘোষ। স্বরলিপিটি প্রস্তুত হয়েছিল সুচিত্রা মিত্র-গীত গ্রামোফোন রেকর্ড অনুসারে। এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ইন্দিরা এবং শান্তিদেব-কৃত স্বরলিপি দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে আমরা যেভাবে গাই, তা কোনো স্বরলিপিরই হুবহু অনুকরণে না হলেও নগণ্য ব্যতিক্রম বাদে শান্তিদেব-সুচিত্রারই অনুসারী। এখন প্রশ্ন হলো- রবীন্দ্রনাথ 'আমার সোনার বাংলা'সহ স্বদেশি এত গানের জন্য কেন বাউলের সুর বেছে নিলেন?

বাউল গান লোকসঙ্গীতের অন্তর্গত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- সহজ ভাষা, কথা ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত সুরে হৃদয়গ্রাহী আবেদন ও প্রকৃতিনির্ভরতা, বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবেশের বহুল ব্যবহার। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ  হতে বাঙালি জনতা 'আমার সোনার বাংলা'কে গভীরভাবে গ্রহণ করে নিলেও এক অর্থে এর পুনর্জন্ম ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে।

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি এবং ৩ মার্চ ঢাকার দুটি বিশাল জনসভায় গানটি গীত হয়। এটি গীত হয়েছিল ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের আগেও। এসব কিছুর আগে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানসহ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদে নানা অনুষ্ঠানেও এটি গীত হয়েছিল। মুজিবনগর সরকার একে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিলে এটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে প্রথম গীত হয় একাত্তরের ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। মুক্তিযুদ্ধকালে এটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পরিবেশিত হতো। দেশ স্বাধীন হলে এটি লাভ করে জাতীয় সঙ্গীতের সাংবিধানিক স্বীকৃতি।

গানটির ঐতিহাসিক নানা দিক সংক্ষেপে ওপরে উপস্থাপন করেছি। জাতীয় সঙ্গীত জাতীয় সত্তার পরিচয়বাহী। নিজের খেয়ালখুশিমতো যাতে কেউ এটি না গাইতে পারে, সে জন্যই সর্বজনস্বীকৃত একটি রেকর্ড প্রস্তুত করা অবশ্যকর্তব্য। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র এখনও কোনো রেকর্ড প্রস্তুত করেনি। এ পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে- আমরা তাহলে কোন রেকর্ড অনুসরণে গানটি শিখেছি? স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস যখন দেখলেন, এর সর্বজনস্বীকৃত কোনো যন্ত্রসঙ্গীত নেই, তখন তিনি বিলেত থেকে এর একটি অর্কেস্ট্রেশন তৈরি করেছিলেন, যেটি অদ্যাবধি বেতার-টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় সর্বস্থানে বাদিত হয়। এটি ছিল পাশ্চাত্য নোটেশনের ভিত্তিতে করা একটি মার্শাল ভার্সন। সমর দাসের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এই যন্ত্রসঙ্গীতে স্বরলিপি পূর্ণ অনুসৃত হয়নি। কণ্ঠসঙ্গীত হিসেবে এখন যেটি বাজছে, তার সঙ্গেও রয়েছে এই যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যাপক পার্থক্য। কণ্ঠসঙ্গীত আমাদের মধ্যে যে আবেগের সৃষ্টি করে, এই যন্ত্রসঙ্গীতের সুর কি তেমন আবেগের সৃষ্টি করে? এর প্রধান কারণ হয়তোবা মার্শাল ভার্সন বলে এতে ব্যবহূত হয়েছে পাশ্চাত্য যন্ত্র। অথচ 'আমার সোনার বাংলা' তৈরি হয়েছে বাউলের মতো লোকসঙ্গীতের সুরে। লোকসঙ্গীতে লোকবাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় এই যন্ত্রসঙ্গীতে একতারা, দোতরা, ডুগডুগি, খমক, ঢোলক, সারিন্দা, বাঁশি প্রভৃতির ব্যবহারই যে কাম্য ছিল, তা-ও উল্লেখের বিশেষ দাবি রাখে। আমরা এমন একটি যন্ত্রসঙ্গীতের রেকর্ড চাই, যাতে স্বরলিপির পূর্ণ অনুসৃতি থাকবে, লোকবাদ্যযন্ত্রের যথোপযুক্ত ব্যবহার থাকবে, পূর্ণ মর্মস্পর্শী সুরের মূর্ছনা থাকবে এবং যা হবে কণ্ঠসঙ্গীতের রেকর্ডের সঙ্গে সম্পূূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমাদের সংবিধান ঘোষণা করেছে, জাতীয় সঙ্গীত হলো 'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম দশ চরণ। লিখিতরূপের বহু জায়গায় এই অংশটুকুকে দশ চরণে উপস্থাপন না করে দশের বেশি চরণে উপস্থাপন করা হয়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। যন্ত্রসঙ্গীত হিসেবে প্রথম চার লাইন বাজানোর বিধানের কথা প্রায় সর্বত্র উল্লেখ করা হয়। এটিও ভ্রান্ত। প্রকৃতপক্ষে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় পাঁচ লাইন। এই পাঁচটি লাইন হলো :এক. আমার সোনার বাংলা ... ভালবাসি। / দুই. চিরদিন ... বাঁশি /তিন. ওমা ... করে, / চার. মরি হায়, হায়রে-/ পাঁচ. ও মা, অঘ্রাণে ... মধুর হাসি/।

শতাধিক বছর বয়সী এমন একটি জনপ্রিয় ও ইতিহাসখ্যাত গান জাতীয় সঙ্গীত হওয়ায় এটি নিয়ে আমাদের যা করণীয়, তা করতে আমরা যেন আর কালক্ষয় না করি- এই প্রত্যাশা করছি।

অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বত্র নন-লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিরাজ করছে: মওদুদ

সর্বত্র নন-লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিরাজ করছে: মওদুদ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, দেশে নির্বাচনের ...

গম্ভীরের অবসরের কারণ ধোনী?

গম্ভীরের অবসরের কারণ ধোনী?

নাম গম্ভীর হলেও মাঠে তিনি মোটেও গম্ভীর ছিলেন না। গৌতম ...

জামিন পেলেন হুয়াওয়ের সিএফও

জামিন পেলেন হুয়াওয়ের সিএফও

চীনের টেলিকম জায়ান্ট হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেইয়ের মেয়ে মেন ওয়ানঝো’কে ...

সুখী দাম্পত্যের চাবিকাঠি

সুখী দাম্পত্যের চাবিকাঠি

আপনারা কি এমন দম্পতি যারা নিজেদের মজার কোন ডাক নামে ...

রিকশাচালককে পিটিয়ে আ'লীগ থেকে বহিষ্কার হলেন সেই নারী

রিকশাচালককে পিটিয়ে আ'লীগ থেকে বহিষ্কার হলেন সেই নারী

রিকশাচালককে মারধরের ঘটনায় ঢাকা মহানগর উত্তরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী ...

বাশারকে ছাড়ানোর অপেক্ষা মাশরাফির

বাশারকে ছাড়ানোর অপেক্ষা মাশরাফির

বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা; এ নিয়ে সম্ভবত কোন ...

সেরে উঠছেন টেলি সামাদ, নেয়া হচ্ছে বেডে

সেরে উঠছেন টেলি সামাদ, নেয়া হচ্ছে বেডে

গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের ...

শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কোটালীপাড়া

শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কোটালীপাড়া

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের প্রচার শুরু করতে বুধবার গোপালগঞ্জের ...