তেরশ্রীবাসীর প্রত্যাশা

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মজিবর রহমান

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে মানিকগঞ্জ জেলার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে অগ্রসরমান ছিল জেলার ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী এলাকা। ব্রিটিশ শাসনামলে এই এলাকার কৃতী সন্তান শিক্ষাবিদ বিপল্গবী কমরেড প্রমথ নাথ নন্দী, বিপল্গবী যতীন্দ্র নাথ সরকার, আফসার উদ্দিন মাস্টারসহ নাম না জানা অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, হাটবাজার ইজারা প্রথা উচ্ছেদের সূচনা করা হয়েছিল হিন্দু অধ্যুষিত ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী এলাকা থেকেই। মানিকগঞ্জ মহকুমা শহর যখন কোনো কলেজের স্বপ্ন দেখেনি, ঠিক সে সময় সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের স্বনামধন্য ডাক্তার বঙ্গবন্ধু পরিবারের চিকিৎসক এই এলাকার কৃতী সন্তান ডা. এমএন নন্দী, তেরশ্রী স্টেটের সাবেক জমিদার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ স্বর্গীয় সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, আফসার উদ্দিন মাস্টারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৪২ সালে মহকুমা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরবর্তী অজপাড়াগাঁয়ে ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয় তেরশ্রী কলেজ; ১৯৫২ সালে বিপল্গবী প্রমথ নাথ নন্দী, যতীন্দ্র নাথ সরকারের নেতৃত্বে মহান মাতৃভাষা আন্দোলনের সূচনা করা হয়েছিল তেরশ্রী থেকে। সে সময় তেরশ্রী হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ওয়াজউদ্দিনসহ কয়েকজন তরুণ ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেল-হাজতে পাঠানো হয়।

ডা. এমএন নন্দী, আফসার উদ্দিন মাস্টার, তাহেজ উদ্দিন ঠাকুর, যুব নেতা আবদুর রহমান ঠাকুরের নেতৃত্বে ১৯৬১-৬৩ সালে পূর্ব বাংলার ফোক কালচারের নব ইতিহাসের সূচনা করা হয়েছিল এই তেরশ্রী থেকে। সাত দিনব্যাপী আয়োজিত 'হারামনি মজলিশ' অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুলল্গাহ্‌, বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন ড. অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকী, ড. অধ্যাপক মোতাহার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবি মনছুর উদ্দিন আহম্মেদ, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ফয়েজ আহ্‌মদ, সংবাদের সম্পাদক আহমদুল কবিরসহ অনেক শিক্ষাবিদ ও গুণীজন এবং ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক ও চিত্রশিল্পীবৃন্দ। ১৯৭১ সালে স্থানীয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা আবদুর রহমান ঠাকুর, আবদুল মতিন, আবদুল হাকিম মাস্টারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং প্রাথমিক ট্রেনিং দিয়ে ভারতে ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়েছিল। মানিকগঞ্জ জেলার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত তেরশ্রী এলাকার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্রে স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধীদের গোপন যোগাযোগ ও সহযোগিতায় '৭১-এর ২২ নভেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের অতর্কিত হামলায় ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হিন্দু অধ্যুষিত তেরশ্রী এলাকার গ্রাম-বাজারসহ শতাধিক ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নারকীয় তাণ্ডব সৃষ্টি করা হয়েছিল।

তেরশ্রী স্টেটের সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ ৪৩ জন নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে নির্মম ও জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এবং এলজিইডির ডিজাইন পল্গ্যান ও এস্টিমেটের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মহান স্বাধীনতার ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা ও জানার জন্য সম্প্রতি তেরশ্রীতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দলীয় কর্মিসভায় মানিকগঞ্জ-১ আসনের এমপি জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এএম নাঈমুর রহমান (দুর্জয়) অবশেষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তেরশ্রী. ঘিওর তথা মানিকগঞ্জ জেলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, স্মৃতিসৌধের পাশেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও একটি মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

মুক্তিযোদ্ধা

mrohman29@yahoo.com