ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের নায়কের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

স্মরণ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

শেখর দত্ত

আজ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা, একাত্তরে গেরিলা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আশির দশকের প্রথমার্ধে শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ও দ্বিতীয়ার্ধে স্বৈরাচারী এরশাদ পতনের যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম রাজনীতিক এবং অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের ১০তম মৃত্যুবার্ষিকী। রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলন ছাড়া জীবনের প্রথমদিকে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবনের প্রথমদিকে ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে পাকিস্তানি ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন এবং শেষদিকে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন।

এককথায় বলা যায়, পাকিস্তানি আমলে ষাটের দশকে সামরিক শাসনবিরোধী গণজাগরণ শুরুর পর থেকে আমৃত্যু তিনি নেতৃত্বের মধ্যে থেকে দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। আন্দোলন-সংগঠন যেখানেই থাকতেন, সেখানেই তিনি হতেন মধ্যমণি। ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া-মেনন গ্রুপে বিভক্ত হলে তিনি দুই কমিটিরই সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। গণজাগরণে যথাযথ ভূমিকার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিককে খুবই স্নেহ করতেন এবং আদর করে 'মাইনক্যা' বলে ডাকতেন। সত্যিকার অর্থেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামে পোড় খাওয়া কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত একটি মানিক।

মানুষের মনোভাব, যাকে বলা যেতে পারে আন্দোলনের 'মুড', তা বোঝার ক্ষেত্রে সাইফউদ্দিন মানিক ছিলেন সহযোদ্ধা বলয়ে অগ্রণী। পাকা রাঁধুনি যেমন বুঝতে পারেন কখন কী চাপাতে হবে চুলায়, কখন নামাতে হবে রান্না; তেমনি আন্দোলন কখন ধেয়ে আসছে, ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে কখন কী করতে হবে, এসব বোঝার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ছিল ভার। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আগে তিনি আত্মগোপন অবস্থায় (আন্ডারগ্রাউন্ড) ছিলেন। সেখানে থেকেই তিনি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কাজে অংশ নিতেন। আসাদ শহীদ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ৬-দফা সংবলিত ১১-দফা বিশেষত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিলের দাবিতে ২৪ জানুয়ারি হরতাল অবিশ্বাস্যরূপে আবির্ভূত হয়। সকালে সেক্রেটারিয়েটের সামনে স্কুলছাত্র মতিউরসহ কয়েকজন শহীদ হলে আন্দোলনের রূপ যায় পাল্টে। সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। এ ধরনের পরিস্থিতির খবর পেয়ে দুপুরে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির পরামর্শে সাইফউদ্দিন মানিক আত্মগোপন অবস্থা থেকে বের হয়ে ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের কাছে চলে আসেন। তখন বিক্ষুব্ধ জনতা সরকারি অফিস, এমনকি ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। বিকেলে ছিল পল্টনে জনসভা। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। সেনাবাহিনীর রাস্তায় নামার খবর পাওয়া যায়। এ অবস্থায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঠিক করে, পল্টনে জনসভা করা ঠিক হবে না। বিক্ষুুব্ধ জনতার মুখে দোয়া-দরুদ তুলে দিতে হবে এবং ইকবাল হলের মাঠে জানাজা পড়া হবে- এ খবর মুখে মুখে ঢাকা শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

দোয়া-দরুদ পড়া ও জানাজার ফলে জনতার প্রচণ্ড মারমুখী, বিক্ষুব্ধ ভাব কিছুটা প্রশমিত হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ওই দিন একদিকে প্রচুর রক্তক্ষয় ও ধ্বংস এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে চণ্ড দমন-পীড়নের মাধ্যমে শুরুতেই গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করা আইয়ুব সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। বলা বাহুল্য, জনতার মুখে দোয়া-দরুদ তুলে দেওয়া এবং জানাজা হবে ইকবাল হলে- এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শহরব্যাপী মুখে মুখে প্রচার করার বিষয়ে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যেতে আরও এক বিশেষ মুহূর্তে সাইফউদ্দিন মানিকের অবদান স্মরণে রাখার মতো। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে মানুষ জানতে পারে- আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শেখ মুজিব মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশে যে বিজয়ের যে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়, তাতে গণঅভ্যুত্থান যে 'জনগণের উৎসব'- তা প্রমাণিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে সিদ্ধান্ত হয়- রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহসহ অন্যান্য নেতা মুক্ত হন।

এ অবস্থায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে দুই ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া ও মেনন) দাবি করে, মুক্ত সব রাজনৈতিক নেতাকে একসঙ্গে সংবর্ধনা দেওয়া হোক। ছাত্রলীগ তা না মানলে ওই দুই দল থেকে প্রস্তাব আসে, শেখ মুজিব একাই বক্তৃতা করুন ঠিক আছে, তবে মণি সিংহ, মওলানা ভাসানী ও মোজাফফর আহমেদ সংবর্ধনা মঞ্চে বসবেন। এনএসএফ বলে ভুট্টোর কথা। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করলে এক পর্যায়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। জনগণ তখন শেখ মুজিবকেই সংবর্ধনা দিতে উন্মুখ ছিল। জনগণের মনোভাব ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐক্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে পরিস্থিতি বুঝে এই জটিলতাকে সামাল দেন সাইফউদ্দিন মানিক। ওই সংবর্ধনা সভা থেকে নেতার প্রতি জনতার আবেগ-উচ্ছ্বাসের মধ্যে শেখ মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে কোনো প্রকাশ্য বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি ছাড়াই অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ, যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের 'ড্রেস রিহার্সেল'-এ পরিণত করে।

ইতিমধ্যে বিগত ৫০ বছরে আমাদের জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উৎসমুখে মহান গৌরবে সুপ্রতিষ্ঠিত গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছে। এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে ঘোষণা না থাকা সত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ হয়ে ওঠেন বক্তৃতার ভেতর দিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রধান নেতা আর সাইফউদ্দিন মানিকের কাছ থেকে ছাত্র-জনতা প্রত্যাশা করত পরিস্থিতির বিশ্নেষণ ও আন্দোলনের কর্মসূচির নির্দেশ। তাই ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক আন্দোলনের 'মূল নেতা' হিসেবে জনগণের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। বলাই বাহুল্য, ছাত্রনেতারা তখন সবাই বয়সে ছিলেন তরুণ, আর অভিজ্ঞতাও বেশি ছিল না। কিন্তু মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধ থেকে ছাত্র-জনতার উৎসাহ নবপর্যায়ে উন্নীত করা, বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতা, দিকনির্দেশনা প্রদান করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদ ও সাইফউদ্দিন মানিকের সঙ্গে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১০ জন নেতা তখন সর্বোচ্চ মাত্রায় দৃঢ়তা, ঐকান্তিকতা, প্রত্যুৎপন্নতা ও সাহসের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন, তা আমাদের জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ছাত্রনেতা সাইফউদ্দিন মানিক শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন এবং ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর শ্রমিক অঞ্চলে অরাজকতা-বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শ্রমিক শ্রেণিকে দেশ গড়ার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করাতে যেসব শ্রমিক নেতা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে সাইফউদ্দিন মানিক অগ্রপথিক। এরশাদের স্বৈর শাসনামলে ১৯৮৩ সালে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ গঠন,

৫-দফা প্রণয়ন এবং সরকারকে চুক্তি করতে বাধ্য করার আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সাইফউদ্দিন মানিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সেই দিনগুলোতে শ্রমিক আন্দোলনকে জাতীয় রাজনীতির যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে তার ভূমিকাই ছিল প্রধান।

উল্লিখিত সব কারণেই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের অকাল মৃত্যু হলে স্বাভাবিকভাবেই সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণে তিনি ৮ দলের অন্যতম নেতা হিসেবে যথাযোগ্য ভূমিকা রাখার ভেতর দিয়ে জাতীয় নেতারূপে প্রতিষ্ঠা পান। পরবর্তীকালে বিশ্ব-সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়া এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে তিনি গণফোরামে যোগ দেন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

আমরা যারা তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহযোদ্ধা, তারা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার মূলনীতিকে রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করা এবং জামায়াতকে রাজনীতি থেকে চিরনির্বাসিত করার ব্যাপারে সব সময় তিনি ছিলেন সোচ্চার। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে চিন্তা করতেন না। তিনি জীবিত থাকলে গণফোরাম জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিগত নির্বাচনে যেত- এমনটা কোনোভাবেই মনে হয় না। তার অকালমৃত্যুতে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের মতো এমন খুব কম নেতাই পাওয়া যাবে, যার জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবমণ্ডিত সময়কালে প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র, শ্রমিক ও জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল। জাতির রাজনীতির ইতিহাসে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে এই জননেতার নাম। প্রয়াণ দিনে তাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

রাজনীতিক