কমল হাসানের উক্তি :অস্থির রাজনীতি

সমাজ

প্রকাশ: ২০ মে ২০১৯      

মামুনুর রশীদ

দক্ষিণ ভারতের খ্যাতিমান অভিনেতা-পরিচালক কমল হাসান সম্প্রতি নির্বাচন উপলক্ষে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছেনPolity has gone down বক্তৃতাটি ভারতীয় এক টিভি চ্যানেলে দেখছিলাম আর ভাবার্থটি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। Polityর অর্থটা কী? ডিকশনারি বাদে ও কিছু ইংরেজির শিক্ষক বন্ধুকেও জিজ্ঞেস করলাম। সবটা মিলিয়ে যা দাঁড়াল তা হলো, সংঘবদ্ধভাবে কিছু রাজনীতির উদ্দেশ্যে কাজ করে মানুষের কল্যাণ করা। সেই কল্যাণচিন্তা কমে গেছে ভারতবর্ষে। এখন রাজনীতির স্থান দখল করেছে দলাদলি। নিজের দলের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশের কাজ করার প্রবণতার বিষয়টি কমে গেছে।

বহুদিন আগে ১৯৮৫ সালে মুম্বাই গিয়েছিলাম। মুম্বাইয়ের একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ও মঞ্চাভিনেতা শ্রীরাম লাগুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন, রাজনীতিতে কল্যাণচিন্তা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যার ফলাফল আমরা ভবিষ্যতে টের পাব সবাই। কমল হাসান কথাটি বলেছেন সম্প্রতি ভারতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, বিষয়টি শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর সব দেশেই আজ একই অবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অথবা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী সবারই একই সুর। চীন যেহেতু গণতন্ত্রকে স্বীকার করে না, তাই তাদের অন্য দলকে স্বীকার করার প্রশ্নই উঠে না। জনগণের কল্যাণচিন্তা তখন দলের একচ্ছত্র ভাবনা। রাশিয়াতে পুতিন ছাড়া কোনো কণ্ঠস্বর নেই। সারা পৃথিবী এখন অর্থনীতিবাদী। অর্থই সবকিছুর নিয়ামক। অর্থের শক্তিই একমাত্র জীবনযাপনের মান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে আফ্রিকার কোনো এক সাগরপাড়ের এক মানুষের কথা পড়ছিলাম। মানুষটির ছোট্ট একটা নৌকা ছিল। দুপুরের পর সে সাগরে গিয়ে কিছু মাছ ধরত এবং বিক্রি করে যে অর্থ পেত, তাই দিয়ে বাজার করে একটু নেশা করে মনের সুখে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরত। আশপাশের লোকজন রীতিমতো ঈর্ষান্বিত হতো এই ভেবে যে, লোকটা কী সুন্দর সুখে আছে। কিছুদিন পর ওই গ্রামে দু'জন আমেরিকান আসে। ওই মানুষটির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। মানুষটির নৌকায় একটা ইঞ্জিন লাগিয়ে দেয়। ইঞ্জিন লাগানোর নৌকাটি সমুদ্রের গভীরে যেতে পারে। মাছও বেশি পড়তে থাকে, আয় বেড়ে যায়।

আমেরিকান বন্ধুদের পরামর্শে আরও দুটি নৌকা বানিয়ে কিছু লোক লাগালে আয় বাড়তে থাকে। একসময় সে শহরে চলে যায়। নৌকাগুলো বিক্রি করে বড় একটা ট্রলার কিনে ফেলে। তবে একবার ঝড়ের মধ্যে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। ইতিমধ্যে ব্যবসা বাড়ার কারণে ধারদেনাও হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে সেই সরল মানুষটি তার গ্রামে ফিরে আসে। বহুকষ্টে আবার একটা নৌকা জোগাড় করে। কিন্তু আগের মতো তার মধ্যে আর সেই উদ্যম নেই। নেশা করে ঠিকই; কিন্তু কণ্ঠে তার আর গান নেই। এ কথা ঠিক নয় যে, মানুষ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবে না। সবারই যে ওই রকম পরিণতি হবে, তাও সত্যি নয়। কিন্তু সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন অর্থ-উপার্জন বা উন্নয়ন কোনো সুখী বা উন্নত জীবনের নিরাপত্তা দেয় না। মাঝখানে সব মানবিক গুণ একে একে নির্বাসিত হতে থাকে। অর্থের জন্য বা ক্ষমতার জন্য মানুষ এমনভাবে মরিয়া হতে থাকে, জীবনের অন্য কোনো মানে বা অন্যের ভালো-মন্দ ভাবার কোনো অবকাশ থাকে না। সোজা কথা, এক ধরনের অন্ধত্ব এসে ভর করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানবজাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা তার ইগো বা অহং। এই অহংই নির্ধারণ এক মারাত্মক প্রবণতা, যা হলো 'কোনো ছাড় নয়'। আফ্রিকার এই মানুষটি প্রাকৃতিক উপায়েই কিছু সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হয়েছিল। সে হয়তো কোনো উঁচু মানের শিক্ষা পায়নি; কিন্তু সহজাত যে সংস্কৃতি তাকে গান গাইতে বলত, পরিবারসহ শান্তিতে বসবাসের যে উপায় বাতলে দিয়েছিল, তা থেকে ছিটকে পড়েই যত সমস্যা হলো।

আমরা যার জন্য প্রস্তুত নই তেমনি একটি বিষয় যদি কখনও আমাদের জীবনে চলে আসে, তাহলেই তো যত বিপদ। যেমন শহরগুলোতে অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর একটা হিড়িক চলে এলো। আমাদের দেশের মানুষ ব্যক্তিতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়; কিন্তু জোর করে যখন অ্যাপার্টমেন্টের খাঁচায় বন্দি করা হলো, তখন তার আচরণটাও অতিদ্রুত পাল্টে যেতে লাগল। আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অনভিপ্রেত এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল মধ্যবিত্ত মানুষ। হারিয়ে গেল তার মাত্র সেদিনের একান্নবর্তী পরিবারের আচরণ। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা এবং মানুষে মানুষে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যে সহনশীলতা তা হারাতে শুরু করল দ্রুত।

একবার সনি কোম্পানির প্রধান বলে ফেললেন এমন এক যন্ত্র আবিস্কার করব, যার ফলে মানুষ একক সত্তায় পরিণত হবে। কিছুদিন বাদেই বাজারে এলো ওয়াকম্যান। গান শোনা হয়ে গেল ব্যক্তিগত বিষয়। গান শোনার মতো একটা পারিবারিক এবং সামাজিক আয়োজন হয়ে গেল একার গান শোনার বিষয়। একসময় পর্দার বিনোদন ছিল একটাই সিনেমা। এলো টেলিভিশন দ্বিতীয় পর্দা, তারপর এসেছে ইন্টারনেট আরও ছোট পর্দা, এখন সেলফোনের মনিটরের পর্দা একেবারেই ছোট পর্দা। প্রথমটি সামাজিক, পরেরগুলো একেবারেই ব্যক্তিগত। এসেছে নিত্যনতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেসবুক। এই ফেসবুকের নিত্যদিনের আচরণ এবং অনাচার আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না- এ কথা সত্য; কিন্তু তার জন্য যে প্রস্তুতি প্রয়োজন তা কি আমাদের আছে? বরং অ্যাপার্টমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের কল্যাণে যেসব সঙ্গী জুটে গেছে তাতে একটা ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, যার জন্য আমাদের দেহ এবং মন কোনোটাই প্রস্তুত নয়।

জনবিচ্ছিন্ন এবং সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন মানুষ যখন বৃহত্তর কোনো সামাজিক ঘটনার মধ্যে আসে, তখনই গোলমালটা বাধে। তার ভেতরের চেহারাটা বেরিয়ে আসে। ব্যক্তিস্বার্থটা যখন বড়, তখন ওই বিষয়টাই সবার আগে চলে আসে এবং তা হলো, 'ছাড় দেওয়া যাবে না একটুও'। ভারতে অতীতে নির্বাচনের সময় এ রকম বলগাহীন উক্তি কখনও শোনা যায়নি। পাড়া-মহল্লায় হয়তো এ ধরনের কাঁচা কথা হতো; কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে একটা সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষা শোনা যেত। আমাদের দেশেও তাই। জ্ঞানের বাজার ছোট হয়েছে বলে টাকার বাজারিরা খুব আনন্দিত হয়েছিল; কিন্তু টাকা রক্ষার জন্য এ পরিস্থিতি খুব সুখকর নয়। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য তা আরও ভয়ঙ্কর। কমল হাসান সেই জন্য যথার্থই বলেছেন, চঙখওঞণ POLITY HAS GONE DOWN.