অক্টোপাসের কবলে বিএনপি

রাজনীতি

প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯      

মহিউদ্দিন খান মোহন

সামুদ্রিক প্রাণী অক্টোপাস না দেখলেও নাম শোনেননি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এটি হাড়গোড়বিহীন একটি বিচিত্র জলজ প্রাণী। এর আটটি বাহু আছে, যা দিয়ে শিকারকে সহজেই আটকে ফেলতে পারে। অক্টোপাসের জীবনবৃত্তান্তে দেখা যায়, এগুলো বিভিন্ন আকার ও ওজনের হয়ে থাকে। তবে সচরাচর অক্টোপাসের ওজন হয় ১৪ থেকে ১৫ কেজি আর বাহুগুলো হয় ৯ ফুট লম্বা। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে ২৭২ কেজি ওজন এবং ৩০ ফুট লম্বা বাহুসম্পন্ন বিশালাকৃতির অক্টোপাসের সন্ধান পাওয়ার ইতিহাস আছে। অক্টোপাসের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হলে সহজে কেউ নিস্তার পেয়েছে, এমন নজির নেই। শোনা যায়, সাগর-মহাসাগরে ছোট ছোট জলযান অক্টোপাসের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আর আরোহীদের ঘটেছে সলিলসমাধি। সবকিছু সরিয়ে রেখে হঠাৎ অক্টোপাস নিয়ে কেন পড়লাম- এ প্রশ্ন পাঠক মনে জাগ্রত হওয়া অসঙ্গত নয়। তবে অক্টোপাস সম্পর্কীয় আমার কথাবার্তার পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির বর্তমান অবস্থা দেখে অদৃশ্য কোনো অক্টোপাস ওটাকে পেঁচিয়ে ধরেছে কিনা, এ সন্দেহ করা যেতেই পারে। বিএনপি যে এখন নানামুখী সংকটের সাগরে এক রকম হাবুডুবু খাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মূল নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে দলটি যেন পথ চলতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আদালতের দেওয়া দণ্ড মাথায় নিয়ে সুদূর লন্ডনে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় দলটিকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তারা তা করতে পারছেন বলে মনে হয় না। সক্রিয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চিন্তা ও কৌশলের অমিল, সমন্বয়হীনতা, নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস, একে অপরকে ল্যাং মারার প্রবণতা, মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনতিক্রম্য দূরত্ব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অস্থিরতা, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাকে আরও জটিল করে তোলার মধ্য দিয়ে দলটি এক রকম দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। ফলে দলটির প্রাণশক্তি তৃণমূল কর্মীরা দিন দিন হতাশ হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি, বিএনপির নিজস্ব জোট ২০ দলের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে গৃহদাহ।

বিএনপির অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করার বিষয়টি অপ্রকাশিত ছিল না। গত কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব খবর বেরোচ্ছিল। বিশেষ করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নে নির্বাচিতদের শপথ নেওয়া না নেওয়া বিষয়ে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আলামত স্পষ্ট হচ্ছিল। সংসদে যেতে নির্বাচিতদের আগ্রহের বিষয়টি আগেই প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দলের শীর্ষনেত্রী জেলবন্দি খালেদা জিয়া এবং দ্বিতীয় প্রধান নেতা লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান কোনোভাবেই সংসদে দলের অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলেন না। এমনকি এ ইস্যুতে নির্বাচিতদের সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি স্কাইপেতে অংশ নিয়ে তার কঠোর মনোভাবেরও জানান দিয়েছিলেন। কিন্তু তার নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে নির্বাচিত দলীয় এমপি জাহিদুর রহমান শপথ নেওয়ার পর দল ও বাইরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। সেই সঙ্গে অপর নির্বাচিতদের হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়- কেউ যদি জাহিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাহলে তাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল চার এমপির হঠাৎ শপথ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা শপথ নিয়েছেন- মহাসচিবের এ মন্তব্য সবাইকে হতবাক করে দেয়। বিশেষত, যে নির্বাচনকে 'ভোট ডাকাতির নির্বচন' বলে তারা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং নির্বাচিতরা শপথ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, হঠাৎ তাদের সে সিদ্ধান্তে এমন ইউটার্ন সবাইকে বিস্মিত না করে পারেনি। অনেকেরই মনে প্রশ্ন- কী এমন ঘটেছে যে, খোদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পূর্বের সিদ্ধান্তের একেবারে বিপরীত অবস্থানে চলে গেলেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় এমপিদের শপথে সম্মতি না জানিয়ে উপায় ছিল না তারেক রহমানের। কেননা এটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল যে, দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই উল্লিখিত চারজন শপথ নিয়ে ফেলবেন। সে ক্ষেত্রে দলের চেইন অব কমান্ড এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে মোটা দাগে প্রশ্ন দেখা দেবে। তাতে এটাও প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল, নেতাদের ওপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই আলগা হয়ে গেছে। তাই মুখ রক্ষার জন্যই শেষ পর্যন্ত 'ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিদের্শনা'র কোরামিন দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে সংসদ সদস্যদের শপথ এবং ঐক্যফ্রন্ট প্রশ্নে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে অসন্তোষ চরমে ওঠার বিষয়টি এখন আর অস্পষ্ট নেই। এই ইস্যুতে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে একসঙ্গে পথচলা আন্দালিব রহমান পার্থর বিজেপি ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে গত ৬ মে। এ বিষয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে আন্দালিব বলেছেন, তারা মনে করেন, জোটের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে বিএনপি শপথ নেওয়ায় বর্তমান সংসদ বা একাদশ সংসদ নির্বাচনকে অবৈধ বলার অধিকার হারিয়েছে তারা। তিনি এও বলেছেন, একক সিদ্ধান্তে সংসদে গিয়ে বিএনপি ২০ দলীয় জোটকে উপেক্ষা করেছে। তাই এ জোটে আর অবস্থান করাকে তারা সমীচীন মনে করছেন না। বিজেপির পরপরই জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও। তিনি আলটিমেটাম দিয়েছেন- ১৩ মের মধ্যে বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্ট থেকে সরে আসতে হবে। নইলে তারা আর বিএনপির সঙ্গে থাকবেন না।

বিজেপি বা লেবার পার্টির মতো দলগুলোর জাতীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব বা ভূমিকা রাখার ক্ষমতা হয়তো নেই। তবে বিএনপির বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ এনে দলগুলো জোট ত্যাগ করেছে বা করার হুমকি দিচ্ছে, তা কিছুটা হলেও বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলবে। কেননা এ থেকে জনমনে ধারণা সৃষ্টি হওয়াটা অমূলক নয় যে, বোধ করি বিএনপির নেতৃত্বদানের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি সম্পর্কে যেসব কথাবার্তা বাইরে প্রচার রয়েছে, তাতে দলটির অভ্যন্তরীণ এলোমেলো অবস্থা আর লুকানো নেই। গত কয়েক দিনের পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরে দৃষ্টিপাত করলেই বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট হয়ে যাবে। গত ৫ মে আমাদের সময়ের 'বিএনপিতে সংকট বাড়ছে' শীর্ষক প্রতিবেদনে দলটির এমপিদের শপথ গ্রহণ-পরবর্তী পরিস্থিতির বিশদ বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, একটি ইস্যুতে তিন রকম সিদ্ধান্ত বিএনপিতে নতুন সংকটের সৃষ্টি করেছে। দিন যত গড়াবে, সংকট ততই বাড়বে বলে উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি। সে সংকট তীব্র হয়ে উঠতে পারে যদি দ্রুত খালেদা জিয়া মুক্তি না পান। এ পরিস্থিতিতে বিএনপিতে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে বলেও পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। গত ৩ এপ্রিল এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তুলাধুনা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। দলীয় সিদ্ধান্তে সবাই শপথ নিলেও মহাসচিব কেন সে সিদ্ধান্ত মেনে শপথ নিলেন না- সে প্রশ্ন তুলেছেন মি. রায়। তিনি মির্জা আলমগীরকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আলাদা থেকে আলাদাভাবে হিরো হওয়া যায় না। মহাসচিবের বিরুদ্ধে গয়েশ্বর রায়ের প্রকাশ্যে বিষোদ্গারের পর দলটির হাইকমান্ড নড়েচড়ে বসেছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। গত ৬ মের সমকালে 'চেইন অব কমান্ড রক্ষায় কঠোর বিএনপি' শীর্ষক খবরে শপথ নেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে সতর্ক করে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরদিকে নির্বাচনের পর সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না- মহাসচিব মির্জা আলমগীরের এ মন্তব্য আলোচনার ঝড় তুলেছে। এ নিয়ে বিশিষ্টজন টিভি টক শোতে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি দলটির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতাকেও অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কেননা, ওই সিদ্ধান্তটি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় নেওয়া হয়েছিল। সে সিদ্ধান্তকে একক কর্তৃত্বে মহাসচিব 'ভুল' বা 'সঠিক ছিল না' বলার এখতিয়ার রাখেন কি-না, সে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকে। তিনি নিজেই বলছেন, সংসদের ভেতরে-বাইরে দুই জায়গায় নেত্রীর মুক্তির জন্য ভূমিকা রাখতেই দলীয় এমপিরা শপথ নিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন- তাহলে মহাসচিব কি নেত্রীর মুক্তির জন্য দুই জায়গায় ভূমিকা রাখতে চান না? না হলে তিনি শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকলেন কেন? এসব অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়েও বিএনপি বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে। শুরু থেকেই ২০ দলীয় জোটের অনেক শরিক বিএনপির ঐক্যফ্রন্টে শামিল হওয়ার বিরোধিতা করেছিল। তারা ক্ষুব্ধ ছিল সবাইকে পাশ কাটিয়ে বিএনপির ঐক্যফ্রন্টে যোগদানে। উপরন্তু বিএনপি যখন ২০ দলীয় জোটের চেয়ে ঐক্যফ্রন্টকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিচ্ছিল, তখন শরিকরা হয়েছিল ক্ষুব্ধ। তাদের এই ক্ষুব্ধতার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশও পেয়েছে। এরই চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে আন্দালিব রহমান পার্থের দল বিজেপির জোট ত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। শোনা যাচ্ছে, আরও বেশ কয়েকটি দল একই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে- এমন আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহল। স্মর্তব্য, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল ২০ দলীয় ঐক্যজোট। তার অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতারা সে ঐক্য যেন ধরে রাখতে পারছেন না। তাদের এ ব্যর্থতা দলটিকে হয়তো আরও কঠিন কোনো পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। নানাবিধ সমস্যা-সংকটের অক্টোপাসের বাহুবন্ধনে বিএনপি যে ভালোভাবেই আটকা পড়েছে, তা নিয়ে কারও মনে সংশয় আছে বলে মনে হয় না। সে সর্বগ্রাসী অক্টোপাসের কবল থেকে দলটি কী করে মুক্ত হবে, সেটাই ভাবনার বিষয়।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক