নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে

মধ্যপ্রাচ্যে সংকট

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০১৯

ফরিদুল আলম

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষ নানা খাতে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই রয়েছেন সৌদি আরবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নানামুখী সংকটে রয়েছে। আবার কোনো কোনো দেশ তাদের নিজেদের জনশক্তি কাজে লাগাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানাবিধ অস্থিরতা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিরূপ ছায়া ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের টানাপড়েনের বিষয়টির বিরূপ প্রভাবও পড়েছে। বিশাল জনসংখ্যার এ দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা দিক দিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও আমাদের জাতীয় আয়ের অন্যতম খাত প্রবাসী আয় নিয়ে দিন দিন নতুন ঝুঁকি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে ২২ লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক নানা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন এবং আমাদের মোট প্রবাসীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশের বাস সেখানে। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সৌদি সরকার কর্তৃক বিভিন্ন পেশায় ব্যাপক সৌদিকরণের সিদ্ধান্তের ফলে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকসহ সব ধরনের শ্রমিকের জন্যই কাজ করার সুযোগ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে আসন্ন এই বিপদের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের তরফ থেকে নতুন করে শ্রমবাজার খোঁজার প্রয়াস তেমনভাবে লক্ষণীয় হচ্ছে না। এই সংকটের শুরু মূলত ২০১৮ সাল থেকে। যদিও সে বছর আগের বছরের তুলনায় জনশক্তি রফতানি কমেছে; কিন্তু প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েছে আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের তুলনায় শতকরা ১৫ ভাগ। এর মূল কারণ হচ্ছে, ২০১৭ সালে রেকর্ডসংখ্যক জনশক্তি রফতানি হয়েছিল। সে বছর প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক হাজার ৫৫৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং হুন্ডি ব্যবসার লাগাম টেনে ধরতে পারাটাও এই সাফল্যের অন্যতম কারণ (সূত্র :দৈনিক প্রথম আলো, ৪ জানুয়ারি, ২০১৯)। অথচ আগের বছরের তুলনায় জনশক্তি রফতানি ২০১৮ সালে ২৭ শতাংশ কম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যাচ্ছে, এই খাত থেকে চলতি বছরের আয় আশানুরূপ হবে না। এর বাইরে গত বছরের এই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত এসেছেন আট শতাধিক নারী। চলতি বছরের বর্তমান সময় পর্যন্ত নারীসহ শ্রমিকদের ফেরতের এই ধারা অব্যাহত থাকায় প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় বাজারটি আজ ভয়ানক সংকটের সম্মুখীন।

এখন বাংলাদেশের রফতানি আয়ে প্রধান তৈরি পোশাক খাত। জনশক্তি রফতানি এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এক অর্থে সলিড টাকা হিসেবে পরিগণিত এবং সেটা জাতীয় অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের দেশের প্রেরিত মোট জনশক্তির শতকরা ৮০ ভাগের ঠিকানাই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। সৌদি আরব প্রধানতম ঠিকানা হওয়ায় এবং সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি সরকার কর্তৃক বেকারত্বের হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা হিসেবে শ্রমিক ছাঁটাই এবং বিদেশি নাগরিক কর্তৃক সে দেশে ব্যবসার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশাল সংখ্যার শ্রমিক দেশে ফিরে আসবে। তাদের যথাযথ কর্মসংস্থান অথবা নতুন বিকল্প শ্রমবাজারের অন্বেষণ না করলে রেমিট্যান্স তথা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামা সময়ের ব্যাপার। যতদূর জানা যায়, সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কোনো দেশের শ্রমবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে নয়, বরং নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং এ ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে সৌদি সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে কেবল একটাই উপায়, অন্বেষণের সুযোগ রয়েছে আর তা হচ্ছে, বিকল্প বাজারের সন্ধান করা।

বিকল্প বাজারের কথা বলতে গেলে অপ্রিয় হলেও যে সত্যটি উচ্চারণ করতে হয় তা হচ্ছে, কয়েক বছর আগে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে সরকার সক্ষম হয় এবং মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে জি টু জি পদ্ধতিতে সে দেশে শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হলেও পরে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে এই সুযোগটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। কথিত আছে, সে সময় মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানি এবং বাংলাদেশের ১০টি এজেন্সি এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর এজেন্সিগুলো নির্ধারিত অর্থের অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে লোক পাঠাতে থাকে আর এভাবে হাতিয়ে নেয় ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমাদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কেবল একটি তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকে (সূত্র :দৈনিক ইনকিলাব, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭)। এ ছাড়া আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নতুন শ্রমবাজার উন্মোচনের জন্য কোনো দৃশ্যমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা থাকলেও সেখানকার বাজারে আমরা ঢুকতে পারছি না; যার অন্যতম কারণ- আমাদের চেষ্টার অভাব এবং চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে না পারা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই সৌদিকরণের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও গত আড়াই বছরে কেবল বাংলাদেশের ৭০ হাজারের অধিক শ্রমিককে সেখানে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে আউটপাস দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং চলতি বছরে ২০ জুন পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানো আউটপাস ইস্যু হয়েছে ১১ হাজার ১২২ জনের। এসব আউটপাস ইস্যুর কারণ হচ্ছে, তাদের কাজের চুক্তির মেয়াদান্তে তা নবায়ন না হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে এদের অনেকে নির্ধারিত অনুমতির বাইরে অন্য কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে সৌদি সরকার কর্তৃক তাদের আকামা বাতিল করা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, অনেক প্রচেষ্টার পর পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি সৌদি শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আমাদের জন্য আশার বার্তা জাগালেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ব্যাপকহারে তাদের ওপর নির্যাতন এবং কম মজুরিসহ নানা কারণে তারা চাকরি হারিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। তথ্য বলছে, গত বছর গড়ে প্রতি মাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০০ নারী শ্রমিক এই হোমগুলোর আশ্রয়ে ছিলেন এবং পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরে এসেছেন (সূত্র :দৈনিক বণিক বার্তা, ২৭ জুন, ২০১৯)।

যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হচ্ছে জনশক্তি রফতানি। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশ যেখানে সীমিত সম্পদ এবং সীমাহীন চাহিদার কারণে জনসংখ্যাকে উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে এই বিশাল জনসংখ্যার একটা অংশকে বাইরে রফতানি করতে পারলে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে; অন্যদিকে এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যোগ হতে পারে ইতিবাচক ভাবমূর্তি। তবে এই জনসংখ্যাকে রফতানি করার আগে এদের জনশক্তিতে রূপান্তর করা জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি লোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈধ বা অবৈধভাবে বসবাস করছে। এদের মধ্যে রয়েছে পেশাজীবী, দক্ষ, অদক্ষ ও সেমিদক্ষ শ্রমিক, যারা বিদেশে তাদের অবস্থানের সুবাদে প্রেরিত অর্থ দেশে পাঠানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে নীরবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ ষষ্ঠ বৃহত্তম অভিবাসী প্রেরণকারী দেশ এবং সপ্তম বৃহত্তম রেমিট্যান্স আয়কারী দেশ। অভিবাসী প্রেরণের ক্ষেত্রে মেক্সিকো শীর্ষে এবং ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও রেমিট্যান্স অর্জনের ক্ষেত্রে ভারত শীর্ষে রয়েছে। এর কারণ দেশটির প্রচুরসংখ্যক পেশাজীবী বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন, যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নগণ্য।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরের মধ্যে যে সংখ্যায় জনশক্তি বিদেশে রফতানি হয়েছে, এর মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের বেশি অদক্ষ শ্রমিক, যাদের আরও দক্ষ করে পাঠাতে পারলে অধিক পরিমাণে বৈদেশিক অর্থ দেশে আনা যেতে পারত। একটা সময় ছিল যখন বিভিন্ন এজেন্সিগুলো, যাদের মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি প্রেরণ করা হয়, তাদের বলা হতো 'আদম ব্যবসায়ী'। কথাটির মাধ্যমে এ ধরনের এজেন্সি কিংবা এগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি কিছুটা বিদ্রূপ এবং নিজেদের কিছুটা আত্মকষ্ট হয়তো ছিল; যার কারণে নিজেদের 'আদম' এবং এই ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক মানসিকতার নেতিবাচক দিকগুলোকে তুলে ধরতে 'আদম ব্যবসায়ী' কথাটির হয়তো প্রচলন হয়ে থাকবে। কালের বিবর্তনে বর্তমানে এসব ব্যবসায়ী তথাকথিত রিক্রুটিং এজেন্সি নামের আড়ালে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে এলেও এদের অনেকের ব্যবসায়িক চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেনি আদৌ। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত টাকার চেয়ে কয়েকগুণ অর্থ বেশি দিয়ে এসব এজেন্সির মাধ্যমে ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকে। এদের খপ্পরে পড়েই ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে কয়েক দফায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেক ব্যক্তি। এদের ঘৃণ্য মানসিকতার কারণেই অনেক প্রচেষ্টার পর উন্মোচিত শ্রমবাজারগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার উন্মোচন যেমন জরুরি, একই সঙ্গে এসব অসাধু চক্রের লালসা থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়া নিরাপদ করাও ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়