আত্মকেন্দ্রিকতার অপসংস্কৃতি

সমাজ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

মযহারুল ইসলাম বাবলা

আমাদের সামাজিক জীবনের স্বাভাবিকতার ছন্দপতন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। পরিবারগুলো তো একে একে ভেঙে প্রায় প্রতিটি পরিবার এখন ছোট্ট পরিসরের হয়ে পড়েছে। পরিবারভুক্ত বলতে কেবলই কর্তা, স্ত্রী ও সন্তান। এর বাইরে আর কেউ পরিবারভুক্ত নয়। যুগটা যার যার তার তার। কেউ কারও নয় সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনাচারে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা এখন সর্বত্রে বিরাজ করছে এবং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজও আর তার পূর্ব অবস্থানে নেই। সমাজকে এখন কেউ তোয়াক্কা করে না। সমাজও তাই ভাঙছে। সমাজের অস্তিত্বও বিলীন হওয়ার পথে। অন্য যে কোনো প্রাণীর থেকে মানুষকে পৃথক করা যায় মানুষের উদ্ভাবনী জ্ঞানে এবং সামাজিকতার সংস্কৃতিতে। কেননা মানুষ একা মরতে পারে বটে; তবে বাঁচতে হলে তার পরিধির সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হয়। সমাজ আর সামাজিক বন্ধনে মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল নয়। সমাজের নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের বেষ্টনীর মধ্যেই সমাজ এবং মানুষ আবদ্ধ। মানুষ একীভূত হলে গণবিরোধী-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা থাকে। তাই রাষ্ট্রই বিচ্ছিন্নতার কৌশল প্রয়োগ করে অভিনব কৌশলে সমাজ ও পরিবারে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, এ অভিযোগ আছে। এই রাষ্ট্র পরিচালনা করার বিধান নির্বাচিত সরকারের। সরকার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী। রাষ্ট্র নির্বাচিত সরকারের অনুগত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ও সরকার সমান্তরাল, একে অপরের পরিপূরক। কেউ কারও অধীনে নয়, নয় বৈরী। বরং পরস্পর হরাত্মা। উভয়ের শাসন-শোষণের লক্ষ্যবস্তু আপামর জনগণ।

সুদীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে জনমানুষের জীবনাচারে সমাজের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। সেই ভূমিকায় ইতি ও নেতি থাকলেও সমাজের সামষ্টিক সামাজিক আচার-আচরণ সবাইকে পালন করতে হতো। সমাজকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামতো কিছু করার উপায় কারও ছিল না। সামাজিক-বহির্ভূত কর্মের জন্য মাশুল পর্যন্ত দিতে হতো। সমাজের কর্তৃত্ব ছিল সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেকের ওপর। অনৈতিক, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে কঠিন শাস্তি পেতে হতো। একান্নবর্তী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্ষেত্রেও সমাজের অপ্রকাশ্য বিধিনিষেধ ছিল। সামাজিক গ্লানিকে ভয় পাওয়ার আশঙ্কা সবাই করত বলেই সমাজের সামাজিকতার বৃত্তের বাইরে যেতে কেউ সাহস পেত না। সেই সমাজ এখন গত হয়েছে। বংশপরম্পরায় গ্রামে যাদের বাস, সেখানে এখনও সমাজ বলে কিছু আছে। আছে সামাজিক আচার, নিয়ম-কানুনও। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব পুরান শহরের আদি বাসিন্দাদের প্রাধান্য যেসব এলাকায় এখনও আছে, সেখানে সমাজের অস্তিত্ব দেখা যায়। সেসব সমাজেও ভাঙনের ঘণ্টাধ্বনি বাজছে সত্য; তবে স্বল্প পরিসরে হলেও টিকে আছে। বাংলাদেশের নতুন শহরের বনেদি এলাকায় কিংবা ফ্ল্যাটে বসবাসকারী এলাকাগুলোয় সমাজ বলতে কার্যত কিছুই নেই। একই ভবনে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও কেউ কাউকে চেনে না। চিনতেও চায় না। একই ভবনের এক ফ্ল্যাটে বিয়ের বা সামাজিক উৎসবমুখর অপর ফ্ল্যাটে মৃত ব্যক্তির লাশ বহনের দৃশ্য সমান্তরালভাবে দেখা যায়। বহিরাগতরা অনেকে আসে উৎসব-আয়োজনে অংশ নিতে; অন্যদিকে অনেকে আসে মৃত ব্যক্তির শোক জ্ঞাপনে। অথচ একসময় একই সমাজে আকস্মিক কারও মৃত্যুতে বিয়ের অনুষ্ঠান বাতিলের অসংখ্য দৃষ্টান্তের কথা জানা যায়। মানুষের মধ্যকার সহমর্মিতা, মানবিকতা, সামাজিক আচার, সামাষ্টিক সংস্কৃতি এখন আর অবশিষ্ট নেই।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার ওপর থেকে নিচ অবধি খাড়াখাড়িভাবে নেমে এসেছে। উজান থেকে ভাটির দিকের নদীর স্রোতের মতো রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে পড়েছে, তেমনি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবারে। এই বিচ্ছিন্নতার তোপেই সমাজ ভাঙছে। ভাঙছে পরিবার। মানুষ ক্রমাগত আত্মকেন্দ্রিকতার অভিমুখে ছুটছে। কেউ কাউকে নিয়ে ভাবছে না বা ভাবার অবকাশ পাচ্ছে না। নিজেকে নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত। নিজের উন্নতিকেই মুখ্য ভাবছে সামষ্টিক ভাবনাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে। আমাদের সমাজ ও পরিবারের অতীত সংস্কৃতি এখন ধুয়েমুছে গেছে। সমাজের কোনোই কর্তৃত্ব নেই সমাজের অভ্যন্তরে থাকা মানুষের মধ্যে। মানুষও সমাজকে তোয়াক্কা করে না। স্বেচ্ছাচারিতাকে পর্যন্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে গণ্য করেছে। এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাচ্ছে অনাচারও। বেকার কর্মহীন মানুষের নানা অপকীর্তিতে সমাজ প্রতিনিয়ত কলুষিত হচ্ছে। সামাজিক অপরাধপ্রবণতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধর্ষণ নামক ব্যাধির ছোবল থেকে নারী-শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। ঠুনকো কারণে মানুষ মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। সংবাদমাধ্যমে নৃশংসতার খবর প্রায়ই থাকছে। একটি নৃশংস ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং বাদ-প্রতিবাদের মুখে ক্রমাগত অপর ঘটনা আগের ঘটনাকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে। হত্যা, খুন, গুম, ধর্ষণ, গণধর্ষণসহ ক্রমাগত ঘটে চলা নৃশংস ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জননিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। অনিবার্যভাবে বলা যায়, সমাজের সামাজিকহীনতার কারণে একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সামাজিক বন্ধনে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা-আন্তরিকতা, সহনশীলতা সৃষ্টির যে সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সেসব সম্প্রীতির সম্পর্ক বিলীন হয়ে পরস্পরের আন্তঃসম্পর্কের বন্ধনগুলো আর ক্রিয়াশীল নেই। ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। সমাজে নৃশংস অপরাধপ্রবণতা চরম আকারে বাড়ছে, অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও কেন এর রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না-এটিই প্রশ্ন। অনেকেই পর্বতসমেত অপরাধ-অনাচার করলেও রয়ে যাচ্ছে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। সরকারের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহির বালাই অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে দেখা যায়, অনাচার-দমন-পীড়নে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সরকার নিত্য ব্যবহার করে যাচ্ছে। পরস্পর হয়ে উঠেছে একে অপরের পরিপূরকরূপে।

সমাজ ও সামাজিক বিচ্ছিন্ন মানুষ প্রযুক্তির অধীন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট, ফেসবুকে নতুন প্রজন্ম ঝুঁকে থাকছে। নয়তো ডিশ-টিভিতে দেশ-বিদেশের চ্যানেলগুলোতে তারা আচ্ছন্ন। আমাদের প্রচলিত সমাজের সামাজিকতার সংস্কৃতি লুপ্ত হওয়ার পেছনে বিদ্যমান ব্যবস্থাই দায়ী। আর এ জন্যই সমাজে ক্রমাগত ঘটে চলেছে নৃশংস সব ঘটনা। এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় বিদ্যমান ব্যবস্থা পাল্টানো। ব্যবস্থা না পাল্টালে কিছুই পাল্টাবে না। বরং ঘটে চলা অসামাজিকতা এবং নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটেই চলবে। আর আমরা ক্রমাগত আক্রান্ত হতে থাকব। একই সঙ্গে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে।

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত