সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আশুরার শিক্ষা

মহররম

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

বিশ্বসভ্যতা ও মানবেতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হচ্ছে পবিত্র আশুরা। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের তীরে ৬১ হিজরির ১০ মহররম তারিখে পৈশাচিক, মর্মন্তুদ ও বিয়োগান্ত ঘটনা পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসের নানা বাঁকে সংঘটিত হয়েছে তাৎপর্যমণ্ডিত অজস্র ঘটনা। প্রতিটি ঘটনায় সমসাময়িক সমাজ-সভ্যতা নতুন নতুন বার্তা পেয়েছে; বুদ্ধিমানরা সেসব ঘটনা থেকে জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং গোটা বিশ্বলোক কোনো না কোনোভাবে একেক ঘটনা থেকে একেক ধরনের পয়গাম নিয়ে সভ্যতার উৎকর্ষ বিধানে কাজে লাগিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত ওইসব ঘটনার কোনোটি হৃদয়বিদারক, কোনোটি চমকপ্রদ আবার কোনোটি বর্বরতা, অমানবিকতা আর নিষ্ঠুরতায় আচ্ছন্ন। তবে মানবেতিহাসে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অবতারণা হয়েছে, তার সবগুলোর ক্ষেত্রেই জানা-অজানা গভীর তাৎপর্য, অনুপম শিক্ষা আর মহান ঐতিহাসিকতা রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনামতে, ১০ মহররম তারিখে মহান আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত ১০ জন নবী-রাসুলকে বিশেষ অনুগ্রহ ও উন্নত মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন বিধায় এ দিবসকে 'আশুরা' হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বলা যায়, পরিকল্পিত বা কাকতালীয় হলেও বিশ্ব ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে পবিত্র আশুরা তথা মহররম মাসের ১০ তারিখে। গোটা বিশ্ববাসী, বিশেষ করে মুসলিম জগতের কাছে খুবই পবিত্র ও তাৎপর্যময় মহররমের বিধান এবং আশুরা দিবসের শিক্ষা ও ঐতিহাসিকতাই এখানে তুলে ধরা হবে।

আশুরা শব্দটি আরবি আশরুন, আশারা থেকে উদ্গত; যার আভিধানিক অর্থ দশ, দশম বা দশমী। শব্দটি ছিল মূলত 'আশানুরা' অর্থাৎ আশুরা দিবসের মর্যাদা রক্ষার বদৌলতে আলোকোজ্জ্বল জীবনের অধিকারী। 'আশানুরা' থেকে 'নুন' বাদ দিয়ে শব্দটিকে 'আশারা' বা 'আশুরা'তে রূপান্তর করা হয়। ভূমিতে উৎপাদিত শস্য তথা ফল ও ফসলাদির খাজনা বা সংশ্নিষ্ট বিষয়াদির সঙ্গে সংযুক্তির কারণে এক-দশমাংশকে বোঝাতে 'উশর' পরিভাষা ব্যবহূত হয়। আবার পৃথিবীতে জীবনযাপন করা অবস্থায়ই পরম স্বর্গের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন অতীব পুণ্যবানকে বোঝাতে ধর্মীয় পরিভাষায় 'আশারায়ে মুবাশ্বারা' বলা হয়। তবে পবিত্র আশুরার ক্ষেত্রেই পুরো বিশ্বে এই শব্দের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কেননা আশুরার ঘটনা যেমন অনেক বেশি, মানবেতিহাসে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যও তেমনি অপরিসীম। তাই ১০ মহররম তারিখে সংঘটিত সব ঘটনার অবতারণা না করে আমরা এখানে 'আশুরা' শব্দের প্রতি সুবিচারবশত ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ১০টি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, আল্লাহপাকের বাণী- 'ইন্নি জায়িলুন ফিল আরদি খালিফাহ।' অর্থাৎ নিশ্চিতরূপে আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব। এই বাণীর আলোকে আশুরা দিবসেই মহান স্রষ্টা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বমানবের আদি পিতা হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করেন। বেহেশতে অবস্থান করতে দেওয়া, তওবা কবুল করা এবং ধরাপৃষ্ঠে প্রেরণসহ আদমের (আ.) জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এই দিবসেই সংঘটিত হয়েছিল; দ্বিতীয়ত, হজরত নুহের (আ.) সময়কালে মহাসত্যে অবিশ্বাসীদের প্রতি প্রলয়ঙ্করী মহাপ্লাবনের সৃষ্টি হলে সর্বব্যাপী ধ্বংসলীলা থেকে শুধু স্বল্প সংখ্যক বিশ্বাসী মানুষ নবী নুহের (আ.) নৌকায় আরোহণের বদৌলতে আশুরা দিবসেই মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে ঐতিহাসিক জুদি পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্তিকা স্পর্শ করেন; তৃতীয়ত, মুসলিম মিল্লাতের অবিসংবাদিত পিতা হজরত ইবরাহিমের (আ.) জীবনের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই আশুরা দিবসে সংঘটিত হয়। তাঁর ঘটনাবহুল জন্ম, 'খালিলুল্লাহ' তথা আল্লাহর বন্ধু অভিধায় ভূষিত হওয়া এবং খোদাদ্রোহী নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তিলাভের ঘটনা আশুরা দিবসেই ঘটেছিল; চতুর্থত, মহান আল্লাহর নির্বাচিত পয়গম্বর মুসা কালিমুল্লাহর (আ.) খোদাবিদ্বেষী বাদশাহ ফেরাউনের নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে মুক্তি, নীল দরিয়ার মধ্য দিয়ে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, ফেরাউন ও তার অনুসারীদের সলিলসমাধির মতো ঘটনা এই আশুরা দিবসেই সম্পন্ন হয়েছিল। পরম প্রভু তাঁর প্রিয় রাসুল মুসার (আ.) সঙ্গে ঐতিহাসিক তুর পর্বতে কথোপকথন করেছিলেন আশুরা দিবসেই; পঞ্চমত, নবী ইদ্রিসকে (আ.) মহান প্রভু পরম মমতায় পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে চতুর্থ আসমানে আশুরা দিবসেই উত্তোলন করে নেন; ষষ্ঠত, সৌন্দর্যের আধার নবী ইউসুফ (আ.) দীর্ঘ ৪০ বছর স্বীয় পিতা নবী ইয়াকুব (আ.) থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর পিতা-পুত্রের মহামিলন ঘটে এই আশুরা দিবসে; সপ্তমত, ১৮ বছর টানা কঠিন কুষ্ঠরোগ ভোগের পর চরম ধৈর্য ও সংযমের মূর্তপ্রতীক নবী হজরত আইয়ুব (আ.) নিরাময় লাভ করেন আশুরা দিবসে; অষ্টমত, সাময়িকভাবে বাদশাহি হারানো নবী হজরত সোলায়মান (আ.) পুনরায় মহান সত্তার অশেষ কৃপায় রাজত্ব ফিরে পান এই আশুরা দিবসে; নবমত, টানা ৪০ দিন মৎস্যের উদরে অবস্থান করে আশুরা দিবসেই মুক্তি লাভ করেন নবী হজরত ইউনুস (আ.); দশমত, মহীয়সী মারইয়াম তনয় হজরত ঈসার (আ.) জন্ম এবং তাঁর শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে মহান আল্লাহ তাঁকে আশুরা দিবসেই দ্বিতীয় আসমানে তুলে নেন। ১০ জন বিখ্যাত পয়গম্বরের জীবনে সংঘটিত এসব ঘটনা ছাড়াও পবিত্র আশুরা দিবসে মানবেতিহাসের আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার অবতারণা হয়েছে। তবে আজকের পৃথিবীতে পবিত্র আশুরার ব্যাপ্তি, গুরুত্ব ও প্রভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হলো কারবালার মর্মন্তুদ বিয়োগান্ত ঘটনা; যা আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের শ্রেষ্ঠতম উত্তরাধিকারী এবং মহানবীর (সা.) কলিজার টুকরা দৌহিত্র ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদতের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে।

মহররম মাস মুসলিম মিল্লাতের কাছে অতীব পবিত্র ও বরকতময় মাস। কোরআনুল কারিমে যে চারটি মাসকে 'আশহুরে হুরুম' তথা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মহররম তার অন্যতম। এ মাসে কোনো জুলুম বা অন্যায় আচরণ না করতে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ রকম এক সম্মানিত মাসে আশুরার অবস্থান একে নিঃসন্দেহে আরও মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত করেছে। আর সে জন্যই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বমানবতার কাছেই আশুরার বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে। মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) যখন দেখতে পেলেন, ইহুদিরা আশুরা দিবসের সম্মান করে, এ দিবসে রোজাব্রত পালন করে, তখন তিনি মুসলমানদেরও নির্দেশনা দেন আশুরা দিবসে সিয়াম পালন করার। এমনকি রাসুল (সা.) আশুরার আগের দিন বা তার পরের দিনও রোজা পালনের আদেশ করেন। এতে করে আশুরা দিবসের ধর্মীয় গুরুত্ব অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর চেয়ে মুসলমানদের কাছে অধিকতর বেড়ে যায়। মুসলিম শরিফের হাদিসমতে, রমজানের রোজার পরেই মর্যাদার দিক থেকে সর্বোত্তম হলো পবিত্র আশুরার রোজা। বুখারি শরিফের বর্ণনামতে, মহানবীতে (সা.) আশুরা দিবসের রোজা আর রমজানের রোজা পালনের চেয়ে অধিক আগ্রহী আর কখনও দেখা যায়নি। সহিহ মুসলিমের অপর হাদিসের ভাষ্যমতে, রাসুলের (সা. প্রত্যাশা হলো- আশুরা দিবসে রোজা পালনের পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী এক বছরের অপরাধ মার্জনা করে দেবেন।

ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্নিষ্ট হয়ে আছে আশুরার পবিত্র দিবস। এমনকি পৃথিবীর মহাপ্রলয়ও ঘটবে এই দিবসেই, যা মহানবীর (সা.) ভবিষ্যদ্বাণীতে বিবৃত রয়েছে। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই মহান দিবস। যে কোনো মূল্যে সত্য-ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সুবিচার তথা আদল-ইনসাফের অনুপম সৌধ নির্মাণের অমোঘ শিক্ষা দেয় এই আশুরা। ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক মূল্যবোধে, সামাজিক রীতিনীতিতে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তথা সামগ্রিক পরিমণ্ডলে সত্য, ন্যায়নীতি-নিষ্ঠা আর সুবিচারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার শিক্ষাই আসে পবিত্র আশুরা থেকে। মহাসত্যে বিশ্বাস স্থাপন, সর্বশক্তিমান পরম স্রষ্টার অপার মহিমায় নিজেকে সমর্পণ, তাঁর ক্ষমতার বিশালত্বে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, নির্ভরশীলতা ও সুদৃঢ় আস্থা জ্ঞাপন, যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন, সর্বতোভাবে খোদাতায়ালার ঐশী সাহায্যের মুখাপেক্ষিতা, তাঁর সীমাহীন অনুগ্রহ, রহমত আর বরকতের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা এবং জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে মহান খোদাতায়ালার নির্দেশাবলির সামনে মস্তকাবনত হওয়ার শিক্ষা দেয় পবিত্র আশুরা। তাই আমরা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মহররমের বরকতমণ্ডিত বিধান ও তাৎপর্যময় ঐতিহাসিকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরম সত্তার যাবতীয় হুকুম-আহকামের ফরমাবরদার হওয়ার যোগ্যতায় উপনীত হতে পারি- সে তাওফিক প্রার্থনা করছি।

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়