ছদ্মবেশী মমতা ও প্রকৃত বিজেপি

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২০

গৌতম রায়

এনআরসি, এনপিআর, সিএএসহ কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের যাবতীয় জনবিরোধী আইনের প্রতিবাদে স্বাধীন ভারতে এ রকম স্বতঃস্ম্ফূর্ত আন্দোলন সর্বাত্মকভাবে এর আগে কখনও সংঘটিত হয়নি। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যে ধরনের আন্দোলন ঘটেছিল, সেই আন্দোলনের ভেতর স্বতঃস্ম্ফূর্ততা থাকলেও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, দেশের যাবতীয় বিরোধী নেতাদের জেলে পুড়ে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি করেছিল। বর্তমান রাষ্ট্রশক্তি দেশের নাগরিকদের ওপর তা প্রয়োগের চেষ্টা করছে না তা নয়। সময়ের নিরিখে দেশের জনমানুষের ভেতরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে ক্ষোভের আগুন যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে গুণ্ডাগিরি করে এই আন্দোলনকে দমনের উদ্দেশ্যে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শক্তি কীভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে, গত ৫ জানুয়ারি (২০২০) দিলিল্গর জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় মহিলা হোস্টেলে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের গুণ্ডামির ভেতর দিয়ে তা আমরা দেখলাম।

বেশ কিছুদিন ধরেই এনআরসি, এনপিএ, সিএএ ইত্যাদি কেন্দ্রের জনবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন কিছু আচার-আচরণগত বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের কাছে মনে হতে শুরু করেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো একটি মুখ হয়ে উঠতে পারেন। সাধারণ মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাটিকে সঙ্গত করার লক্ষ্যে একাংশের বুদ্ধিজীবী, যারা মমতাকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রগতিশীলতার প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, তারা ইতোমধ্যেই আসরে নেমে পড়েছেন।

বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করে ভোটে গিয়ে, সংসদে গিয়ে, বাজপেয়ি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে, ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যে আইনে পিতা বা মাতা, যে কোনো একজনের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার নিরিখে, ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব নির্ধারণের কথা বলে, এনআরসি, এনপিএ, সিএএসহ যাবতীয় বিভাজনের রাজনীতির সম্ভাবনাকে খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেই আইনটিকে যে মমতা এবং তার দল সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে সমর্থন করেছে, পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই মমতার আজকে কেন্দ্রের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে, প্রতিবাদের নামে এই ছদ্মবেশ ধারণ, মমতার ছদ্ম প্রতিবাদের ভেতর দিয়ে তাকে বিজেপিবিরোধী আন্দোলনের আইকন হিসেবে তুলে ধরা- এই গোটা পরিকল্পনাটির ভেতরে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শক্তিকে সব রকম সুবিধা করে দেওয়ারই প্রচেষ্টা রয়েছে, সেটি বুঝতে আমাদের কোনো রকম অসুবিধা হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের বুকে দুটি জায়গায় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে- এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর বামপন্থিদের নেতৃত্বে প্রবল জনবিক্ষোভ ধ্বনিত হয়। এই বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সংকল্পটি বামপন্থিরা সামগ্রিকভাবে নিজেদের পরিসরকে অতিক্রম করে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারেন। জাতীয় কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের বুকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরির এই আশঙ্কা ঘিরে তাদের উদ্বেগের কথা গোপন রাখেনি।

এ রকম একটি পরিস্থিতিতে হিডকোর মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন বাধ্য হয় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরির জন্য কোনো জমি বরাদ্দ করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন যাবতীয় জমির মালিক একাই হিডকো নয়। হিডকোর পক্ষ থেকে জমির বরাদ্দ না করা হলে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্য কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে যে জমি বরাদ্দ করা হবে না- তার গ্যারান্টি কোথায় রয়েছে?

ভুলে গেলে চলবে না, এনপিআরের প্রশ্নটিকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার জনগণনার একটি অধ্যায় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। সেই চেষ্টার শরিক কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এনপিআর তৈরির জন্য যাবতীয় পর্যায়ক্রম রচনা করা শুরু করে দেওয়া হয়েছিল সরকারি স্তরে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বাম গণতান্ত্রিক শিবিরের সর্বাত্মক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভিত্তিতে এবং দেশব্যাপী প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে তৈরি পরিস্থিতির ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাধ্য হন এই ঘোষণা করতে যে, তিনি এনপিআর আপাতত স্থগিত রাখছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপাতত স্থগিত ঘোষণা করলেও এনপিআর বাতিল- এই কথাটি কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়নের সুরে আজ পর্যন্ত বলার মতো হিম্মত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়নি। মমতার বিজেপিবিরোধী আন্দোলনের ভেতরে যদি এতটুকু সততা থাকত, তাহলে খুব নিশ্চিতভাবে তিনি এনপিআর স্থগিত নয়, বাতিল ঘোষণা করতেন। সে সম্পর্কে কেরালার বিধানসভায় যেরকমভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রস্তাব গ্রহণ করতেন।

এই পরিস্থিতির ভেতরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যে কিষান মান্ডি তৈরি হয়েছিল, যেগুলো এখন প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলোর লোকধারণের ক্ষমতা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে একটি সমীক্ষা চালানো হচ্ছিল। এই কিষান মান্ডিগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি এবং সেগুলো রাজ্যের অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী ভূমিকা পালন করছে, সেগুলো জানার জন্য যদি সমীক্ষা করার দরকার থাকে, তাহলে রাজ্য সরকারের হাতে থাকা যাবতীয় কাগজপত্র কিন্তু যথেষ্ট। তার জন্য শারীরিকভাবে সমীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই।

রাজ্যের অর্থনীতির কোনো প্রশ্নের সঙ্গে কিষান মান্ডিগুলোর লোকধারণের ক্ষমতার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তাহলে কেন এনআরসি, এনপিআর ঘিরে এই বিতর্কের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পক্ষ থেকে কিষান মান্ডিগুলোতে লোকধারণের ক্ষমতা ঘিরে হাতে-কলমে সমীক্ষা চালানো হয়েছে?

ভারতবর্ষের জেল আইন অনুযায়ী জেলা শাসক প্রয়োজনের ভিত্তিতে যে কোনো ইমারতকে সাময়িক জেলখানা বলে ঘোষণা করতে পারেন। এমনভাবে জম্মু-কাশ্মীরে, সে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. ফারুক আবদুলল্গাহ, ওমর আবদুলল্গাহ, মেহেবুবা মুফতিসহ বহু রাজনৈতিক নেতার সরকারি বা বেসরকারি বাসগৃহকে সাময়িক জেল, সাবজেল হিসেবে ঘোষণা করে, তার ভেতরে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে।

আপদকালীন অবস্থার দোহাই দিয়ে যে কোনো ইমারতকে জেলা শাসক কর্তৃক সাবজেল বলে ঘোষণার ব্রিটিশ তৈরি আইনকে সংশোধনের সুপারিশ প্রথম করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক পরই তারাপদ লাহিড়ী কমিশনের মাধ্যমে। সেই সুপারিশের ক্ষেত্রগুলো পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন থাকাকালীন বলবৎ হলেও, ব্রিটিশের তৈরির জেলকোডে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ভারতের সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে গোটা দেশের মানুষের ভেতর তৈরি হওয়া জনবিক্ষোভ এবং সেই বিক্ষোভকে মোকাবিলা করতে, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে পাশে নিয়ে, সাম্প্রদায়িক বিজেপির প্রকাশ্য গুণ্ডাগিরি- এই গোটা পরিবেশ-পরিস্থিতিকে গুলিয়ে দিতে, জনমানুষ থেকে জনবিচ্ছিন্ন বিজেপিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

বিজেপির একদা প্রকাশ্য বর্তমানে গোপন বন্ধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটা বড় রকমের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ছদ্মবেশী বিজেপিবিরোধী হিসেবে আসরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের ফলে একদিকে যেমন হিন্দু-মুসলমানে গোটা দেশের সমাজব্যবস্থাটাকে দ্বিধাবিভক্ত করে, ব্রিটিশের অনুকরণে ভাজক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে, বিজেপি সরকার এবং তাদের মস্তিস্ক আরএসএসের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসনের পথ সুগম করা হচ্ছে; অপরপক্ষে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের প্রতি সাধারণ মানুষের তৈরি হওয়া তীব্র মানসিকতাকে ইতিবাচক দিকে মুখ ফিরিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চলেছে।
 
ভারতীয় গবেষক