উপকূলের বাস্তবতা ও বৃষ্টির পানি

এসডিজি

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ড. নমিতা হালদার, এনডিসি

দেশের উপকূল অঞ্চলে জীবন থেকে নেওয়া দুর্ভাগ্যজনক এক অভিজ্ঞতার উপাখ্যান হলো খাবার পানি। পানির অপর নাম জীবন। তবে জীবন রক্ষাকারী এ মৌলিক উপাদানটি সহজলভ্যতায় দেশের অঞ্চলভেদে রয়েছে তারতম্য। যেমন পাহাড়ি অঞ্চলে পানি অত্যন্ত দুর্লভ। আর উপকূলে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেলেও তা লবণাক্ত, ব্যবহারের অনুপযোগী। সার্বিকভাবে দেশের সেচ, গৃহস্থালি, খাবার পানি সংগ্রহ প্রভৃতি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির অপরিমিত ব্যবহার বিষয়ে শুধু ঢাকা শহরের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, একের পর এক গভীর নলকূপ বসানোয় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। এর ফলে মাটির নিচেও পানি ক্রমে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে এবং পানি সংগ্রহজনিত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ১৯৮২ সাল থেকে গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম বেড়েছে ১১ গুণ। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৯৫. ৫ শতাংশ পানি সরবরাহে ভর্তুকি দেয় সরকার। এই ভর্তুকির অর্ধেক টাকা চলে যায় সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের কাছে। আর সবচেয়ে গরিব ২০ শতাংশের কাছে যায় মাত্র ৪.৫ শতাংশ। তবে যাদেরকে সরকারিভাবে পানি সরবরাহ করা হয় না বা যারা ভর্তুকির কোনো সুবিধা পায় না, সেই উপকূলের প্রান্তিক মানুষের ভরসা কী? বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ অর্থাৎ ৪৭,২০১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপকূলে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ অর্থাৎ সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। কোনো কোনো গবেষণায় ১৯টি জেলাকে উপকূলীয় জেলা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭-১৮ বছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় জেলা ১৫টি। যথা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। এসব জেলার ১৩১টি উপজেলা লবণ পানির আগ্রাসনে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত।

জুলাই থেকে অক্টোবর প্রাকৃতিকভাবে মিঠা পানি সহজলভ্য হয়, যা বর্ষা দ্বারা প্রভাবিত। উপকূলের নদনদী, পুকুর, জলাশয়ে শুকনা মৌসুমের শুরু থেকেই পানির লবণাক্ততা দেখা দেয়। নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে পানি লোনা হতে শুরু করে। মিষ্টি পানির অভাবে রবিশস্য চাষ করা যায় না। এপ্রিল-জুন মাসে এ পানি তিক্ত এবং সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ পানিতে সাবানে কোনো ফেনা না হওয়ায় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জীবনযাপন করা যায় না। পানির লবণাক্ততা প্রলম্বিত হওয়ায় বাগেরহাট জেলার সর্বত্র এ বছর আমন ধান লাগানোর জন্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেরিতে লাগানোতে এ ধানের উৎপাদন নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণকে উপেক্ষা করেও উপকূলে চলছে ফসল ফলানোর অবিরাম প্রচেষ্টা। যেখানে ভূউপরিস্থ এও ভূগর্ভস্থ পানি লোনা বা ব্যবহারের অনুপযোগী, সেখানে মানুষের ভরসা শুধুই বৃষ্টির পানি। উপকূলের অধিবাসীরা ছোট-বড় মাটির পাত্রে বর্ষাকালে পানি ধরে রেখে মৌসুম শেষে কিছুদিন ওই পানি ব্যবহার করতে পারে। তবে দারিদ্র্যের কারণে পানি সংরক্ষণের সরঞ্জাম সংগ্রহ করা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিরা কংক্রিটের ট্যাংক তৈরি করে বাড়ির টিনের চালের পানি সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করে। তবে কোনোভাবেই এ পানি একটি পরিবারের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। উপকূলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে ছাত্রছাত্রীরা পানির সংকটকে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে হোস্টেল ত্যাগ করার ঘটনা ঘটে। সরকারি কর্মচারীরা বোতলজাত পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়। আর্থিক চাপ ও শারীরিক সমস্যার কারণে তারা ঘন ঘন বদলির শরণাপন্ন হয়। প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশে যখন বছরে গড়ে ১২০০ মিলিমিটার থেকে ৫৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, তখন পানির মতো মৌলিক জীবন রক্ষাকারী উপাদানকে সারা বছর কোনোভাবেই কি উপকূল অঞ্চলের মানুষের আওতায় আনা যায় না?

সরকারি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের যে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী ১৯ বছর আগে দিয়েছিলেন, তা পুনর্নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এত দিনে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ঢাকার ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি দ্বারা বাথরুমে ফ্ল্যাশ, গাড়ি ধোয়া বা বাগান করার কাজে চাহিদার ১৫-২০ শতাংশ পূরণের কথা বলা হচ্ছে। নগরবাসী তো জানে না, উপকূল অঞ্চলের মানুষের কাছে বৃষ্টির পানি হলো অমৃত। তারা শুকনা মৌসুমে এক গ্লাস বৃষ্টির পানি পান করার সুযোগ পেলে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খুলনা বিভাগ আজ ভয়াবহ ঝুঁকিতে। তবে সেখানেও প্রকল্প ব্যয় বরাদ্দে রয়েছে বৈষম্যের অভিযোগ। দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলার কোনো কোনো অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার ফলে মিঠা পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-৬ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ অনুযায়ী উপকূলবাসীকে লবণাক্ততা বিষয়ে সতর্ক করা হবে। কিন্তু মানুষ সতর্ক হয়ে সংকট মোকাবিলা করবে কীভাবে? বিশুদ্ধ সুপেয় পানি কোথায় পাবে? রিজার্ভ অসমোসিস, পিএসএফ, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ডিজেলিন্যাশন প্লান্ট সবই পরীক্ষিত; তবে ফলদায়ক হয়েছে সামান্যই। শহর ও পৌরসভাকেন্দ্রিক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোনো প্রকল্পই বলতে গেলে সুফল দেয়নি মিঠা পানিপ্রত্যাশীদের। পুকুর খননেও রয়েছে নানাবিধ অনিয়ম।

পানির ক্ষেত্রে মানবাধিকারের সংজ্ঞাটি একটু মিলিয়ে নেওয়া যায়। মানুষের জীবন, অধিকার, সমতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ-সুবিধাই মানবাধিকার। পানি তো শুধু প্রয়োজন নয়, জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৫(ক) ধারায় বলা হয়েছে, 'নিজের ও নিজ পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের নিমিত্ত পর্যাপ্ত জীবনমানের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবামূলক কার্যাদির সুযোগ এবং বেকারত্ব, পীড়া, অক্ষমতা, বৈধব্য, বার্ধক্য অথবা অনিবার্য কারণে জীবনযাপনে অন্যান্য অপারগতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।' মিঠা পানি সংগ্রহের জন্য ২০ কিলোমিটার দূরের কোনো পুকুর বা জলাশয় পর্যন্ত যেতে হয় যে নারীকে, তার জন্য বড় ঝুঁকি অকাল গর্ভপাত এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা। সরকারি প্রকল্প নকশায় আবশ্যিকভাবে জলাধার অন্তর্ভুক্তকরণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি হলো, ওয়ান সাইজ ফিটস অল। যেমন- দেশব্যাপী উপজেলা পরিষদ, ডাকবাংলো, টিটিসি, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভবনের নকশা হুবহু এক রকম হতে হবে এবং তার বাজেটও এক সমান। এমনকি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পরিমাণও এক। উপকূলের স্থাপনার ক্ষেত্রে লবণাক্ততারোধী বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার না করলে নির্মাণে মারাত্মক ত্রুটি থেকে যায়। উপকূলের ক্ষেত্রে নির্মাণকালও একটি বড় কারণ।

আলোচ্য উপস্থাপনায় উপকূলের জেলাগুলোয় লবণ পানির সমস্যা মোকাবিলায় কিছু বাস্তব সুপারিশ তুলে ধরা হলো :১. উপকূলের সঙ্গে মিঠা পানির অঞ্চলের প্রকল্পের হুবহু তুলনা করলে ভুল হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো চিহ্নিত দেশের ১৫টি উপকূলীয় জেলার ১৩১টি উপজেলায় যে কোনো সরকারি স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের তলদেশে আবশ্যিকভাবে জলাধার রাখতে হবে। ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। লবণাক্ততা প্রতিরোধকারী সিমেন্ট, আর্দ্রতা রোধকারী কেমিক্যালসহ অন্য যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তার জন্য উপকূলে অবশ্যই প্রকল্প ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। নির্মাণ-পরবতী নিয়মিতভাবে ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও উপকূলের জন্য বেশি ধরতে হবে; ২. এসব উপজেলায় পৌরসভার অনুমোদনযোগ্য বেসরকারি স্থাপনা-আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক জলাধার রাখার বিষয়টি কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে; ৩. উপকূলের প্রতি গ্রামে সরকারিভাবে জলাধার নির্মাণপূর্বক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শুকনা মৌসুমে স্বল্পমূল্যে গ্রামবাসীর কাছে এ পানি বিক্রয় করা যাবে। প্রতিটি উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয় রয়েছে। উপদ্রুত এলাকা চিহ্নিত করা তাদেরই কাজ; ৪. সরকার কর্তৃক চিহ্নিত সময়ে ইলিশ মাছ না ধরার জন্য জেলেদের প্রণোদনা হিসেবে চাল ও নগদ অর্থ দেওয়ার যে বিধান চালু হয়েছে, তার সুফল দেশবাসী পাচ্ছে। উপকূলের যেসব নারী দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে, সুপেয় পানি সরবরাহে নিয়োজিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর তাদের জন্য বিশেষ ভাতা-ভর্তুকি-প্রণোদনা চালু করতে পারে; ৫. ১৫টি উপকূলীয় জেলা এবং এর ১৩১টি উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্য পাহাড়ি ভাতার মতো সুপেয় পানি ভাতা চালু করা প্রয়োজন।

দেশের প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষের বসতি উপকূল অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক। উপকূলের প্রতিটি গৃহস্থালির দায়িত্ব নেওয়া একটি সুদূর সম্ভাবনার বিষয়। তবে নির্ধারিত সময়ে পানির জন্য পরিবারপ্রতি সীমিত আকারে ভর্তুকি দেওয়া সরকারের পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়। উপদ্রুত এলাকার সব সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব বৃষ্টির পানি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা সম্ভব।

সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ ও সাবেক সচিব