মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরুক বিএনপিও

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০

ডা. কামরুল হাসান জিয়া

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করে, সরকার গঠন করে, তখন তৃণমূলের বিএনপিতে কী প্রতিক্রিয়া হয়- তা আমরা নানাভাবেই দেখেছি। আমার মরহুম শ্বশুর বেঁচে থাকলে হয়তো আরও আশাহত হতেন। সেই আশির দশকেই তিনি ফ্রিডম পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে বিএনপির দহরম-মহরম ভালোভাবে নেননি। আমি শুনেছি, এ নিয়ে বিএনপির তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণার সময় জিয়াউর রহমান নতুন দলটির আহ্বায়ক কমিটির যে ১৮ জনের নাম ঘোষণা করেন, আমার শ্বশুর মরহুম এসএ বারী এটি ছিলেন তাদের একজন। তারও আগে তিনি ১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৫৩ সালে ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের অন্য অংশ ভাসানী ন্যাপের সক্রিয় নেতা ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এসএ বারী এটির হৃদ্যতা ছিল এবং স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দিনাজপুরে সাক্ষাৎ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন- বারী, ঢাকায় আস, দেশটাকে গড়ি। কিন্তু পারিবারিক কারণে তার আর ঢাকা যাওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে দিনাজপুর-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭৫-এ ভারত সরকার গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করা শুরু করলে ভাসানী ন্যাপ ফারাক্কা ব্যারাজ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে। সে সময় ভাসানী ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এসএ বারী এটি। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথমে জিয়ার মন্ত্রিসভায় উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পরে সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করার বিরুদ্ধে দলের ভেতরেই যে কয়জন অবস্থান নিয়েছিলেন, এসএ বারী এটি তাদের একজন। ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিএনপির পরবর্তী ইতিহাস এবং ক্রমেই জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইতিহাস সবার জানা।

একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিষ্ঠিত দল হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছিল, যেভাবে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী দলের দায় কাঁধে তুলে নিয়েছিল; তার খেসারত দলটি গত দেড় দশক ধরে পেয়ে আসছে।

আমরা জানি, বর্তমান আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের ক্ষমতায় টেকসই গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের ধারায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই এখন জাতির সামনে স্বাভাবিক ও অনিবার্য বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বিএনপি নামক দলের অস্তিত্ব প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর নিছক রাজনৈতিক আদর্শ নয়, বরং মহান সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আমি মনে করি, এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ বিএনপির জন্য একবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনও বিএনপি পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দলের গঠনতন্ত্রে, আদর্শে, কর্মসূচিতে আত্তীকরণ করতে। রাজনৈতিক ভিন্নতা জারি রেখেই বিএনপি শপথে-স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি হতে পারে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অন্তরের দৃপ্ত উচ্চারণ 'জয় বাংলা' স্লোগানও ধারণ করতে পারে বিএনপি। এতে করে মুক্তিযুদ্ধের এই অবিনাশী স্লোগানের স্বত্ব একা আওয়ামী লীগের থাকবে না।

বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের ধারায় প্রত্যাবর্তন সার্বিক রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টেকসই করতে হলে আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠিত হতে হবে। তৃণমূলেও প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চার নিমিত্তে যোগ্য দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত নেতৃত্বকে নির্বাচিত করতে হবে জাতীয় কাউন্সিল ও ভোটাভুটির মাধ্যমে। এমনটি হলে নতুন প্রজন্মের লাখ লাখ তরুণ, যুবক, কৃষক-শ্রমিক, প্রকৃত দেশপ্রেমিক, আধুনিক সুশিক্ষিত-স্বশিক্ষিত, কোটি কোটি ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক ধারায় যোগ দিতে পারে। সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে একটি সহায়ক পরিপূরক যুক্তরাজ্য বা পশ্চিমা দেশগুলোর উদারপন্থি ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। এই শূন্য স্থান দখল করা বিএনপির জন্য সবচেয়ে সহজ। ঐক্যবদ্ধ বিকল্প শক্তি হিসেবে নতুন গণতান্ত্রিক পদযাত্রায় আওয়ামী লীগের প্রতি সমান সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথের নবদিগন্তের পথে এগিয়ে যাওয়ার পথ নতুন করে শুরু হবে।

পাশাপাশি আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিই পারে বিএনপিকে জনগণের দলে ঠাঁই করে দিতে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও সংরক্ষণ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মূল প্রবহমান রক্ষণশীল ধারা, যা অমর। বিএনপির জন্য সুযোগ রয়ে গেছে সমান্তরাল আর একটি শক্তিশালী উদারপন্থি প্রবহমান ধারা হিসেবে টিকে থাকার। আর তা হলো বদলে ফেলতে হবে অনেক কিছু। নিজে না বদলালে টেকসই গণতন্ত্র নামে যে মহাসমুদ্র তাতে শক্তিশালী উদারপন্থি ধারা হিসেবে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে যাবে। আমার মতে, রাজনীতির এই ধারায় বিএনপির টিকে থাকার সব উপাদান বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের জন্য অফুরন্ত প্রেরণা নিয়ে জেগে উঠবে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি মওলানা ভাসানীর আদর্শ একবিংশ শতাব্দীর তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারে। এই ধারাই বিএনপির রাজনীতির প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠুক।

সহকারী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন, আর্মি মেডিকেল কলেজ, বগুড়া
[email protected]