শিক্ষার প্রায়োগিক বিবেচনা

মানবসম্পদ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২০

ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'হতভাগ্যের গান' কবিতায় নিগূঢ় মিনতি ছিল- 'কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস? হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস। রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা, গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস। হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস' বিশ্ববাসীর কাছে ক্রান্তিকালের এই দুঃসময়ে উল্লেখ্য কবিতার অনুধাবন অবশ্যম্ভাবী। এটি অনস্বীকার্য যে, কভিড-১৯ সংক্রমণ বিস্তার এবং জীবন নিধনের অদমনীয় তাণ্ডব বিশ্বব্যাপী যে মর্মন্তুদ আর্তনাদ সৃষ্টি করেছে, তার পরিসমাপ্তির কোনো চৌহদ্দি এখনও পরিপূর্ণভাবে অজানা। সংক্রমণ বিস্তারের ভয়াবহতা এবং এর ফলে সৃষ্ট মহামন্দা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব সর্বোপরি আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি চরম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তা বলা যায়।

আধুনিক জ্ঞান সভ্যতার কিংবদন্তি অবেক্ষক দর্শনশাস্ত্রের জনক মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের মতানুসারে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ বাইরের আবরণ মাত্র। মানুষের সত্যিকার সৌন্দর্য হচ্ছে হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত জ্ঞান। তিনি বলেছিলেন, 'জ্ঞানই সর্বোত্তম গুণ', 'জ্ঞানই শক্তি'। শিক্ষা ও জ্ঞানের নিগূঢ় বিভাজন গর্বিত উপলব্ধিতে আনা না হলে প্রত্যয় দুটির ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃত অর্থে জ্ঞান হলো শিক্ষার পরিশীলিত-পরিমার্জিত অনুধাবন। যে শিক্ষা অন্যের কষ্টে বা অন্য-হৃদয়ের রক্তক্ষরণ নিজের বিবেককে তাড়িত ও বোধকে বেদনাকাতর না করে, সে শিক্ষা কখনও জ্ঞানে রূপান্তরিত হয় না। সক্রেটিস মূলত সত্যাশ্রয়ী জ্ঞানের প্রকৃত ধারক ছিলেন বলেই মিথ্যার কাছে আত্মসমর্পণ না করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা অধিকতর শ্রেয় মনে করেছেন। এই সত্য-প্রচার অপরাধেই তাকে হেমলক গাছের ভয়ানক বিষাক্ত রস- বিষ পানে আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল।

আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা যে, মহান জ্ঞানসাধক ডায়োজিনিস জ্ঞান অনুসন্ধানে জীবনে কখনও বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করেননি। জ্ঞানের আরেক মহান সাধক অ্যারিস্টটল সম্পর্কে মহাবীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, 'আমার জীবনের জন্য হয়তো আমি আমার জন্মদাতা পিতার কাছে ঋণী। কিন্তু আমাকে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সত্যিকার মানুষ করে গড়ে তুলেছেন আমার শিক্ষাগুরু অ্যারিস্টটল।' চিকিৎসাবিজ্ঞানের আদি জনক হিপোক্রেটিসের অমর বাণী ছিল- 'জীবন খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু শিক্ষা দীর্ঘতর। সুদিন চলে যাচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা বিপজ্জনক এবং বিচার-বিবেচনা করাও খুব কঠিন কাজ। তবুও আমাদের তৈরি থাকতে হবে, সে শুধু আমাদের নিজের সুখের জন্য নয়। অপরের জন্যও।' বিশ্বখ্যাত বরেণ্য জ্ঞানসাধকসহ প্রায় সব মনীষীর জীবনপ্রবাহের পথ পরিক্রমায় শিক্ষাই ছিল অতীন্দ্রিয় পাথেয়। 'শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড'- এই প্রচলিত প্রবাদবাক্য শুধু বাচনিক প্রকরণে নয়, প্রায়োগিক বিবেচনায় সর্বকালেই সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ বাহন ছিল।

উন্নত বিশ্বে উন্নয়নের পেছনে প্রণিধানযোগ্য বিনিয়োগ হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, জ্ঞানসৃজনে সমৃদ্ধ গবেষণা, মেধাসম্পন্ন যোগ্যতর শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার যথার্থ নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন ব্যতীত গুণগত শিক্ষার বাস্তবায়ন সমধিক কল্পনাপ্রসূত। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর; প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক-স্নাতক-স্নাতকোত্তরসহ অধিকতর উচ্চশিক্ষায় প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তিদের প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের অনুশীলন-নির্ভর উৎকর্ষ ফলাফলই নির্ধারণ করতে পারে গুণগত শিক্ষার মানদণ্ড। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক তথ্য-প্রযুক্তি-মনন-সৃজনশীল জ্ঞানের উন্মেষই 'মানবপুঁজি' বা সমৃদ্ধ মানবসম্পদ উৎপাদনে সুষ্ঠু ভূমিকা পালন করতে পারে।

আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সর্ব-অধিকাংশ ক্ষেত্রে নূ্যনতম প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণবিহীন বা ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্তদের শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ-পদায়নে গুণগত শিক্ষার প্রচার ও প্রসার সুদূরপরাহত বলেই অনুমেয়। মুখরোচক বিভিন্ন গুঞ্জনে প্রচারিত যে, দেশ বা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অর্জিত উচ্চশিক্ষা বা পিএইচ.ডি ডিগ্রিধারীদের কেউ কেউ অন্যদের দিয়ে অভিসন্দর্ভ লিখিয়ে নেওয়ার প্রবণতা গুণগত শিক্ষা বা গবেষণার ভাবমূর্তিকে প্রচণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এ ধরনের উচ্চতর ডিগ্রি ব্যবহার করে বর্ণচোরা অনুপ্রবেশকারী দল ও নীতি বদলে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক অনুকম্পা-কৃপা-অনুগ্রহ-অনুদান বা অনৈতিক পন্থায় নানা স্তরে নিয়োগ-পদ-পদায়ন কোনোভাবেই জাতির অত্যুজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনা করতে পারে না।

উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নূ্যনতম শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও নিয়োগ বাণিজ্য শুধু নিজস্ব বাহিনী সৃষ্টির নামান্তর মাত্র। এভাবে নিয়োগ-পদ-পদক অর্জন অশুভ শক্তিমত্তা দিয়ে চর দখলের মতো ভূমিদস্যুদের বশংবদদেরই অধিকতর অপকর্মে জড়িয়ে ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির পথকেই প্রশস্ত করবে। গুণগত শিক্ষার প্রকৃতি ও পরিধির চলমান মিথস্ট্ক্রিয়া অব্যাহতভাবে প্রণোদিত হলে কোনো এক সময় জাতি-রাষ্ট্র হেত্বাভাস চরিত্রকে ধারণ করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের শিক্ষা পরিবারের সর্বোচ্চ অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার একনিষ্ঠ ভূমিকা কষ্টসাধ্য হলেও বস্তুনিষ্ঠ যাচাই-বাছাইয়ের দীয়মানতা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়।

মেধাবী শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্রের জন্য মানবসম্পদ-সমৃদ্ধ উন্নততর পরিবেশ তৈরিতে উৎকৃষ্ট জ্ঞানসৃজন ও বিতরণে ব্যত্যয় ঘটলে জাতিকে ভবিষ্যতে কঠিন মূল্য দিতে হবে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার পথ নির্ণয় ও প্রদর্শনে অপকৌশল, ছলচাতুরী, প্রতারণা, জালিয়াতি, অনৈতিক অর্থ বিনিময়ে তদবির-লবিং বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিদের শুধু স্বীয় বিবেকের আদালতে নয়, দেশবাসীর প্রচণ্ড ক্ষোভ-নিন্দা-ঘৃণা-আক্রোশের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর প্রতিধ্বনি দ্রুত ঘনীভূত। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বিগত কয়েক মাসে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে বিবেচনায় নিয়েই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, কারিগরি-বৃত্তিমূলক ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের আকার যথাক্রমে ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি, ৩৩ হাজার ১১৭ কোটি ও ৮ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকৌশল বা ধারণাপত্রের উপস্থাপন ব্যতিরেকে বাজেট বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই বিভাবিত হয়।

যুগে যুগে ধার্মিকতা, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মনুষ্যত্ব ও সত্যবাদিতার জয়গানে শিক্ষা-জ্ঞান হয়েছে প্রাগ্রসর সভ্যতার চন্দ্রাতপ আরাধনা। বিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞান-ব্যবসায় প্রশাসন-তথ্য-প্রযুক্তি-কারিগরি শিক্ষায় উঁচুমানের গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং এর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সূচকে নৈর্ব্যক্তিক তাৎপর্য-বিচার ব্যতীত গুণগত শিক্ষার প্রতিশ্রুতি শুধু অসার প্রতিগ্রাহই হবে। করোনা ও এর অতিক্রান্তকালে দ্রুততার সঙ্গে আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, রুচিশীল বিনোদন এবং মনন-সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের পরিচর্যা-অনুশীলনে সবাইকে মনোযোগী হতে হবে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা, ধর্মান্ধতা ও অপসংস্কৃতির কুৎসিত বাতাবরণে লিঙ্গভেদে অপ্রাপ্তবয়স্ক সব স্তরের মানুষের অসামাজিক কার্যক্রম, মাদকসেবন বা অপ্রকৃতিস্থ অপরাধ সংহার করার প্রায়োগিক কর্মকৌশল এবং পরিপত্র অত্যাজ্য।

মহান স্রষ্টার কাছে আকুল নিবেদন- বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ববাসীকে যেন এই মহামারি-মহাদুর্যোগ থেকে উদ্ধার করে মানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও ধার্মিকতার যোগ্যতম মানবসন্তানদের বিশ্ব কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনে নবতর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, তেজস্বী সাহস ও মনোবল প্রদান করেন।


 
সাবেক উপাচার্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়