মুজিববর্ষ

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

ড. সেলিম তোহা

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ার সল্ফ্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন খোকা। ছোট থেকেই দুরন্ত খোকা মধুমতী নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে বড় হয়েছেন। ছোট থেকেই খোকা ছিলেন প্রতিবাদী ও অধিকার আদায়ে সচেতন। স্কুল ঘরের ছাদ সংস্কারের দাবি থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সেই ছোট্ট খোকাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালির জাতির পিতা। স্বনামধন্য লেখক আহমদ ছফা শেখ মুজিবুর রহমান নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান এ দুটো যমজ শব্দ, একটা আরেকটার পরিপূরক এবং দুটো মিলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল- প্রোজ্জ্বল এক অচিন্তিত পূর্ব কালান্তরের সূচনা করেছে।'

বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। বাংলাদেশের মানচিত্রের বুকে আজ যে লাল-সবুজের বিজয় নিশান উড়ছে, তার স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি। মানবীয় দ্রোহের গুণে গুণান্বিত মুজিব কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। সোনালি যৌবন থেকে পরিপূর্ণ বঙ্গবন্ধু বাঙালির অধিকার আদায়ে বারবার কারাবরণ করতে পিছপা হননি। ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময় ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু জীবনের মায়া উপেক্ষা করে বিহারে দাঙ্গাকবলিত এলাকায় মুসলমানদের রক্ষা ও উদ্ধার করার জন্য ছুটে গেছেন। আশ্রয় শিবির খুলে দাঙ্গাপীড়িতদের উদ্ধার করে তাদের ট্রেনে বিহার থেকে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে নিজের স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছেছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগকালে দাঙ্গার সময় কলকাতায় মুসলমানদের জীবন যখন বিপন্ন, তখন ইসলামিয়া কলেজে আশ্রয় শিবির প্রতিষ্ঠা করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় মুসলমান নারী-পুরুষ-শিশুদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি সহপাঠীদের নিয়ে দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৪৬ সালে অবিভক্ত ভারতের শেষ নির্বাচনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর, আসাম ও সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণায় ক্লান্তিহীনভাবে ভারতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ভিত রচনা করেছেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায় আন্দোলনে সমর্থন দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হন। অনেকেই মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পেলেও বঙ্গবন্ধু কর্মচারীদের আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার আবেদনই করেননি। পাকিস্তান গঠনের মাত্র চার মাস ১৯ দিন পর অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বাঙালির অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে গড়ে তোলেন ছাত্রলীগ। ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের এক সম্মেলনে তাই বঙ্গবন্ধু বলেন, বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস আর ছাত্রলীগের ইতিহাস এক এবং অভিন্ন।

১৯৪৮ সালে যখন মায়ের ভাষার ওপর পাকিস্তানিদের ঘৃণ্য দৃষ্টি নিপতিত হয় তখনও বঙ্গবন্ধু চুুপ থাকেননি। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আহূত ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সচিবালয়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের এক সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কারাগারে থেকেই বঙ্গবন্ধু এ সংগঠনের ভিত্তিমূল প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক অবদান রাখেন। ফলশ্রুতিতে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুকে তার অনুপস্থিতিতেই এ সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়।

বাংলার প্রত্যেক মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম মমত্ববোধ ছিল; মমত্ববোধ ছিল বাংলার প্রতি। ৭ মার্চের ভাষণেও আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু কোনো নেতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেননি। অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ভাষণের শুরুই করেছেন 'ভায়েরা আমার' বলে। ৭ মার্চের ভাষণে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেন, 'আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।' শান্তিপূর্ণ হরতালে ইয়াহিয়া বাহিনীর আক্রমণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'কী পেলাম আমরা? আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে- তার বুকের ওপরে হচ্ছে গুলি।' বঙ্গবন্ধু ভাষণে আরও উল্লেখ করেছিলেন, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে হরতালে আক্রমণ ও নিরীহ মানুষ হত্যার পর টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট- দেখে যান কীভাবে আমার গরিবের ওপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে; আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন।' ১০ তারিখ রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স করতে চেয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেছিলেন, 'কিসের আরটিসি (রাউন্ড টেবিল)? কার সাথে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো?' 'রক্তের দাগ শুকায় নাই, আমি ১০ তারিখ বলে দিয়েছি, ওই শহীদের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না।'

জাতির পিতা কখনোই প্রধানমন্ত্রিত্ব চাননি। তিনি এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার আপামর জনগণকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। সাবধান আমাদের যেন বদনাম না হয়।' বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চে গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে যখন খবর পেয়েছিলেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হবে; প্রাণের ভয় না করে বঙ্গবন্ধু সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়ি ছেড়ে যাননি।

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ লন্ডন ও ভারত হয়ে বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে বাংলায় ফিরে আসেন। এই দিনটি ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। পাকিস্তানের জেলে থাকতে কোর্ট মার্শালে বঙ্গবন্ধুর বিচারে ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যে সেলে বন্দি ছিলেন, তারই পাশে কবর খোঁড়া হয়। বঙ্গবন্ধু তখনও বীরদর্পে বলেছিলেন, 'তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও, কোনো আপত্তি নাই। মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে পৌঁছে দিও। এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।'

বঙ্গবন্ধুকে কোর্ট মার্শালে বিচার করে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিয়েছিলেন। ১১ আগস্ট, ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধী বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষার জন্য বিশ্বনেতাদের কাছে আহ্বান জানান। ১২ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্ট জানায়, সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি কার্যকর করলে পুরো বিশ্ব তার প্রতিক্রিয়া জানাবে। অতঃপর ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো ও জেনারেল আকবর বঙ্গবন্ধুকে তাদের কাছে হাজির করান। করমর্দনের জন্য ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'দুঃখিত- ও হাতে বাঙালির রক্ত লেগে আছে। ও হাত আমি স্পর্শ করব না।'

বঙ্গবন্ধু তার জীবনের সোনালি দিনগুলো এই বাংলা ও বাংলার মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে গেছেন। দেশে ফিরে তার বক্তব্যে সে ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে- 'আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই, আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি। বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।'
 

অধ্যাপক, আইন বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া