শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বর্তমান উপাচার্য ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বিরচিত 'বঙ্গবন্ধুর কৃষক ও কৃষি ভাবনা' শীর্ষক গ্রন্থটি লেখকের অটোগ্রাফসহ আমার হাতে এসেছিল প্রায় বিদায়ী বছরের আগস্টে। ১১২ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ বইটি প্রকাশ করেছে প্রান্ত প্রকাশন, ২০২০ সালের জুন মাসে। মূল্য ২০০ টাকা।

গ্রন্থটিতে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে- বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে কৃষি ও কৃষক; স্বাধীনতা পরবর্তী কৃষি পুর্নবাসন; বঙ্গবন্ধুর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জোর তাগিদ; পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও বাজেটে কৃষি; বাংলাদেশে কৃষির ভিত গড়েছেন বঙ্গবন্ধু; বঙ্গবন্ধুর সমবায়ভিত্তিক কৃষির রূপরেখা।

বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মনে পড়ছে, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বল্পায়ু জীবনে প্রায়শই 'দুখী মানুষ' নিয়ে কথা বলতেন, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলতেন। লালন সাঁই যাদের 'মনের মানুষ' বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাদের 'সোনার মানুষ' বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে সেই বাঙালিই 'দুখী মানুষ'। লালন সাঁই যেখানে আধ্যাত্মিক উন্নয়নে বারংবার বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেখানে শিক্ষা ও দর্শনে আলোকিত করতে চেয়েছেন; বঙ্গবন্ধু সেখানে বাঙালিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে চেয়েছেন। তার দুখী মানুষের বহুলাংশ আসলে কৃষক। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, যাদের- 'কর্ষিত মাটির পথে পথে/ নতুন সভ্যতা গড়ে পথ।'

পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়- ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধু অখণ্ড বাংলা কিংবা পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার প্রতিটি প্রান্তে প্রান্তে গিয়ে, জনসাধারণের সঙ্গে মিশে মিশে উপলব্ধি করেছিলেন- কৃষিপ্রধান এই ভূখণ্ডে কৃষকরাই সবচেয়ে অবহেলিত। তারা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে শোষিত, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বঞ্চিত। তিনি বুঝেছিলেন যে, কৃষকের মুক্তি ছাড়া আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। আমরা দেখি, এই মহান নেতার জন্মের এক শতাব্দী পরেও সেই আপ্ত নির্দেশিকা সমান তাৎপর্যপূর্ণ।

শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বঙ্গবন্ধুর কৃষক ও কৃষি ভাবনা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন তার শিক্ষায়তনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্নিষ্টতা সূত্রেই, সন্দেহ নেই। এও অস্বীকার করা যাবে না যে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার জীবন, কর্ম, নীতি, চর্চা ও প্রজ্ঞা নিয়ে অনেক গ্রন্থ ও নিবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে; তার মধ্যে কৃষি খাত নিয়েও নেহাত কম নেই। কিন্তু তার মধ্যে আলোচ্য গ্রন্থটি স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে।

গ্রন্থটির প্রথম যে দিকটি আমার চোখে ধরা পড়েছিল, তা এর শিরোনাম। আমরা সাধারণত 'কৃষি' পদবাচ্যের অধীনেই কৃষক প্রত্যয়টি আলোচিত হতে দেখি। এমন প্রবণতার প্রচলন গ্রন্থটির তথ্যসূত্রগুলো দেখলেও বোঝা যায়। কিন্তু মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া তার বদলে আগে কৃষককে এনেছেন। এখানেই মাটির বদলে মানুষের অগ্রাধিকারের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝা যায়। বঙ্গবন্ধু যে 'দুখী মানুষের' মুখে হাসি ফোটানোর সাধনা সারাজীবন করেছেন, তার সঙ্গে এই শিরোনামের যোগসূত্র যথার্থ। প্রসঙ্গক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রামের কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষ নয়, মাটি চেয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই দুখী মানুষেরাই বুকের তাজা রক্ত দিয়ে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে এই মাটির সল্ফ্ভ্রম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল।

গ্রন্থটির দ্বিতীয় স্বাতন্ত্র্য হচ্ছে, কৃষক ও কৃষি ভাবনায় আলোকপাত করতে গিয়ে লেখক অন্য অনেকের মতো কেবল বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বা কারাগারের রোজনামচার মতো তিন-চারটি মৌলিক গ্রন্থের ওপর নির্ভর করেননি। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন উপলক্ষে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর মূল্যবান ভাষণগুলো থেকেও সংগ্রহ করেছেন এই গ্রন্থের রসদ। এই গ্রন্থ উপজীব্য করে বঙ্গবন্ধুর কৃষক ও কৃষি ভাবনা নিয়ে নতুনতর গবেষণা ও গ্রন্থের উন্মেষ হতে পারে।

কৃষি যে নিছক উৎপাদনের বিষয় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজনীতিরও অনুষঙ্গ, সেই কথা আগেই বলেছি। এই গ্রন্থে লেখক দেখিয়েছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কীভাবে খাদ্য উৎপাদন ১৯৭১-৭২ অর্থবছরের ৮২ লাখ টন থেকে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ১ কোটি ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছিল। অন্যদিকে খাদ্য আমদানি কমবেশি ২৮ লাখ টন থেকে নেমে এসেছিল কমবেশি ১৪ লাখ টনে। কিন্তু পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ পট পরিবর্তনের পর ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে সেই খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়েছিল ১ কোটি ৭ লাখ টনে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে কৃষি বিষয়ে যেসব অপপ্রচার রয়েছে, তার অনেকগুলো খণ্ডন করেছে বইটি।

বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে দুটো সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়েছে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধুর কৃষক ও কৃষি ভাবনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পর্যালোচনা ও তুলনা করা যেত। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর কিছু বক্তব্য বা উদ্ৃব্দতির সূত্র বাদ পড়ে গেছে। যেমন বইটি শেষ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর যে চমৎকার ও নাতিদীর্ঘ উদ্ৃব্দতি দিয়ে, তার অংশবিশেষ তুলে ধরছি- 'আমি চাই আমার বাংলার মানুষ বাঁচুক, আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক, আমার বাংলার মানুষ শান্তি পাক।' এই বক্তব্য তিনি কোথায় দিয়েছেন, সেই সূত্র নেই।

অধ্যাপক ভূঁইয়া অনেক বছর ধরে কৃষি বিষয়ে একাডেমিক ও নন-একাডেমিক লেখালেখি করে চলছেন। সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মসূত্রে কৃষি বিষয়ে তার নিবন্ধ প্রকাশের অভিজ্ঞতাও রয়েছে আমাদের। আলোচ্য গ্রন্থটিতেও স্থান পেয়েছে তার প্রকাশিত অন্তত ২৭টি গ্রন্থের তালিকা। কেবল কৃষি ও সংশ্নিষ্ট বিষয়ে এমন তালিকা যে কারও জন্য ঈর্ষা জাগানিয়া। শ্রেণিকক্ষে অধ্যাপনার পাশাপাশি সম্পাদনা করছেন কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল। কৃষিবিষয়ক গবেষণার জন্য পেয়েছেন 'বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার' এবং আরও নানা স্বীকৃতি।

আলোচ্য গ্রন্থটিও তার কৃষিবিষয়ক কাজের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে আশা করা যায়। আমি এই গ্রন্থের বহুল পঠন ও প্রচার প্রত্যাশা করি।

লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com

মন্তব্য করুন