জলবায়ু ঝুঁকি

এসডিজি বাস্তবায়নে গৃহীত পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২১

মো. আবুল কালাম আজাদ

২০১৬ সালে এসডিজি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সূচনাকালে ২৪৪টি উপাত্তের মধ্যে কেবল ১১২টি প্রাথমিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ছিল। বিগত ৪ বছরে ১৬১টি প্রাথমিক উপাত্ত ব্যবহূত হচ্ছে এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ২০১৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত আনুমানিক ৯২৮.৪৮ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন। গড়ে বার্ষিক ৬৬.৩২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা একই সময়ের জিডিপির ১৯.৭৫%। এই ৬৬ বিলিয়নের মধ্যে দেশীয় অর্থায়ন ৮৫% এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ১৫%। দেশীয় অর্থায়নের মধ্যে সরকারি, বেসরকারি ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে হবে যথাক্রমে ৩৩.৫%, ৪২% এবং ৫.৫%। পরিকল্পনা করা হয়েছে যে বেসরকারি সংস্থা ৪% বিনিয়োগ করবে। বৈদেশিক সহায়তা এবং অনুদান হিসেবে ৫% এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ১০% হবে।

এসডিজিকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত কর্মশালা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সকল জেলা এবং উপজেলা ৩৯ + ১ এসডিজি সূচকে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজির ১৩২টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৩৯ সূচককে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ৩৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা, শিক্ষা, লিঙ্গসমতা এবং অন্যান্য। অবশিষ্ট +১ 'কাউকে পেছনে না ফেলা' সূচকটি সংশ্নিষ্ট অঞ্চলের চাহিদার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট জেলা বা উপজেলার চাহিদার আলোকে নিরূপিত হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রতিকূলতা, সফলতার গল্প, ভালো কাজের অনুসরণ এবং এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখানোর জন্য ২০১৭ এবং ২০২০ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে স্বেচ্ছায় জাতীয় প্রতিবেদন (ভলানটারি ন্যাশনাল রিপোর্টিং) প্রকাশ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা মহামারির সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই দুইয়ে মিলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা কর্মসূচি অধিকতর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ আরও বিপদগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৯-২০-এ আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮.২%, বিশ্বব্যাপী মহামারির জন্য তা ৫.২৪%-এ নেমে এসেছে। কভিড-১৯-এর কারণে প্রথম তিন মাসে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কমপক্ষে ১০% অতিরিক্ত লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। তবে রেকর্ড বলছে, কভিড-১৯-এর মন্দা প্রভাব থেকে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তাদের সাময়িকীতে মতামত প্রকাশ করেছে যে, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং একাধিকবার বন্যার পরেও ২০২১ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৫%। আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪% বৃদ্ধি পেয়ে ১,৮৮৮ মার্কিন ডলার হবে, যা প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় বেশি।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৫.২%, যেখানে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি (-) ৬.৮% এবং সর্বনিম্ন মালদ্বীপে (-) ২০। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আগের মতো ফিরে গেছে; আগস্ট ২০১৯-এ রেমিট্যান্স ছিল ১৪৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছর ৩৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৬৩.৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, ২০১৯ বছরের জুলাই মাসের তুলনায় গত জুলাই মাসে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ৬২% বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও ২০২০ সালের জুনে তৈরি পোশাক খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি (-) ৮.৬৫% ছিল, তবে আগস্টে এটি বৃদ্ধি পায় (+) ৪৪.৩৩%। আগস্ট ২০১৯ মাসে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ২.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৩.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সালের জুলাই মাসে মোট রপ্তানি আয় ৩.৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। ২০২০ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৮.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৫% বেশি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশ এসডিজি বাস্তবায়নের বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রারম্ভিকভাবে সফলতা দেখিয়েছে। এগুলো হচ্ছে- দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুধা হ্রাস, ৫ বছরের কম বয়সী মৃত্যুহার, নবজাতক মৃত্যুহার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় শিক্ষাস্তরে সফলতা এবং লিঙ্গ সমতা। বিদ্যুতের ব্যবহার এখন প্রায় ৯৯%-এর ঘরে। প্রত্যেক কর্মরত ব্যক্তির প্রকৃত জিডিপির বার্ষিক বৃদ্ধির হার বেড়েছে এবং জিডিপির অনুপাত হিসাবে উৎপাদন মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি পেয়েছে, বাজেট বরাদ্দ এবং অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষাও বৃদ্ধি পেয়েছে।


এসডিজি অর্জনে আমাদের অনেক ইতিবাচক সফলতা রয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নের প্রথম চালিকা শক্তি হলো সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয়। ইতিবাচক সফলতাগুলো হচ্ছে- অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দরিদ্রবান্ধব ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনা, টেকসই জিডিপি বৃদ্ধি, আয় নির্ভরতা অনুপাত হ্রাস, মৃত্যুহার হ্রাস, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস, নারী শ্রমশক্তির বর্ধন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, অভিবাসী শ্রমিকদের অর্থ প্রেরণ এবং আইসিটির বহুমাত্রিক ব্যবহার; যার প্রয়োগে এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।

কভিড-১৯ মোকাবিলার লক্ষ্যে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য সামাজিক সুরক্ষা কৌশল হিসেবে সরকার প্রায় ১২.১১ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মোট দেশীয় উৎপাদনের ৩.৭৫%। এই প্রণোদনা প্যাকেজ কভিড-১৯-এর প্রস্তুতি, জরুরি সাড়াদান এবং পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কভিড-১৯ মোকাবিলায় ৩১ দফা নির্দেশনাসহ একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছেন। সম্মুখযোদ্ধাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা, জীবন বীমা এবং নগদ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ২০০০ চিকিৎসক ও ৫০০০ নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক ল্যাব টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে অতিরিক্ত ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা দিয়ে একটি বিশেষ সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব হচ্ছে- নারীর ক্ষমতায়ন, আশ্রয়ণ (গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন) প্রকল্প, শিক্ষা সহায়তা, আমার বাড়ি আমার খামার, ডিজিটাল বাংলাদেশ, কমিউনিটি ক্লিনিক, বিনিয়োগ উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং সকলের জন্য বিদ্যুৎ। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমরা আশা করি, ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে প্রায় ৬০০০ ডলার এবং ২০৪১ সালে হবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার।

'ভিশন ২০৪১' অনুসারে ২০৩১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৯% এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৯.৯০% অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার হবে ২.৫৫% ও ২০৪১ সালের মধ্যে হবে ১%-এরও কম এবং ২০৩১ সালের মধ্যে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ৭% ও ২০৪১ সালের মধ্যে ২.৫৯% হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভোলা গ্যাস পাইপলাইন, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কয়লা টার্মিনাল, উপকূলীয় অঞ্চলে পেট্রো-রাসায়নিক শিল্প এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের মতো অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সম্পদ আহরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদার করা এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী জলবায়ুর পাশাপাশি ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিঃসন্দেহে বড় প্রতিকূলতা। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ২ ডজনেরও বেশি হাইটেক পার্ক স্থাপনের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃজন, শিক্ষার মান উন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণা, উদ্ভাবনী ডিজিটালাইজেশন, প্রশাসনের গতিশীলতা, মহিলা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং রপ্তানির বৈচিত্র্যকরণের জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কথা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শামিল হবে বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ 'সোনার বাংলা' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে। আমাদের স্বপ্ন, ২০৪১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশকে উদ্ভাবনী বাংলাদেশে রূপান্তরিত করা এবং ২০৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার ১০০ বছরে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে উদযাপন করারও পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে একটি 'সহনশীল নিরাপদ জলবায়ু ও সমৃদ্ধ ব-দ্বীপ' অর্জনের অভিপ্রায় নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

  সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) ওসাবেক মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়