স্মরণ

জ্যোতি বসু: বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

রাশেদ খান মেনন

কমরেড জ্যোতি বসুকে প্রথম দেখি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য সিপিআই (এম) তখন সহায়তা কমিটি গঠন করেছে। পশ্চিমবাংলায় আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থী ছাড়াও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থি সংগঠন ও ব্যক্তিদের সংগঠিত হতেও তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকায় ২৫ মার্চের গণহত্যার কালরাতের পর আমরা তখন ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরে চলে এসেছি। সেখানে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে খবর এলো, মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত ভূমিকা গ্রহণ করতে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থি সংগঠনগুলোর এক বৈঠক আহ্বানের পরামর্শ দিয়েছে সিপিআই (এম)। তারা এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এ খবরের ভিত্তিতে ভারতের আগরতলা হয়ে কলকাতা গেলাম। সেখানে সিপিআইর (এম) পক্ষ থেকে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। সেখানেই প্রথম পরিচয় হলো সিপিআইর (এম) সর্বভারতীয় ও পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বের সঙ্গে। এই সুবাদেই জ্যোতি বসুর সঙ্গে প্রথম দেখা। আর প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় পেয়ে।

দেশে থাকতেই জ্যোতি বসু সম্পর্কে এক প্রবল আগ্রহ ছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার স্বল্প পরেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঐতিহাসিক বিতর্ক শুরু হয়। তাতে দেশে দেশে ভাগ হয়ে পড়েন কমিউনিস্ট কর্মীরা। কেউ মস্কোর পক্ষে, কেউ চীনের পক্ষে। এ ধরনের এক সময়ে খবর এলো, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে গেছে। চীনাপন্থি নামে পরিচিতরা সিপিআই (মার্কসবাদী) গঠন করেছেন। জ্যোতি বসু ছিলেন সিপিআই (এম) নেতা।

এপার বাংলায় তখন প্রবল জাগরণ জাতীয়তাবাদী চেতনার। কমিউনিস্টরা তার বাইরে নয়। বরং এখানে বিতর্ক- কোন পথে বাংলাদেশে স্বাধীনতা আসবে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আগেই দেশে আওয়াজ উঠেছে- 'শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধর/ পূর্ববাংলা স্বাধীন কর।' প্রথমদিকে পশ্চিমবাংলার নকশালপন্থিদের সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান উজ্জীবিত করলেও অচিরেই আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, নকশাল আন্দোলনের ব্যক্তি হত্যার পথ, গণসংগঠন বিলুপ্ত করা- এসব আমাদের পথ নয়। বরং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলা স্বাধীন করতে হবে। আমরা তখন 'স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা' প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছি। সে কারণে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আমাদের এতটুকু সময় লাগেনি।

সে সময় বাংলাদেশের বামপন্থিদের জন্য সিপিআইর (এম) বাড়ানো হাত ছিল বড় ভরসা। কারণ চীনের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান আমাদের হতাশ করে তুলেছিল। আর ভারতে গিয়ে নকশালপন্থি আন্দোলনের যে চেহারার সঙ্গে পরিচিত হলাম, তাতে তাদের তথাকথিত বিপ্লববাদ সম্পর্কে যে সামান্য মোহ ছিল, সেটাও কেটে গেছে।

বস্তুত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জ্যোতি বসু যে ভূমিকা রেখেছিলেন তার ঋণ শোধ করা যাবে না। এদেশের মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিদের অংশগ্রহণ ভারত সরকার সন্দেহের চোখে দেখত। সে সময় যদি সিপিআইর (এম) আশ্রয় ও সহযোগিতা না পাওয়া যেত তবে বামপন্থিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ দুরূহ হতো। আমাদের হয় দেশের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে হতো অথবা ভারতে শরণার্থী হয়ে দিন কাটাতে হতো। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে জ্যোতি বসু যে বক্তৃতা দেন, তা অনন্য। তিনি সরাসরি ভারত সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানান।

মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য তার নেতৃত্বেই সিপিআই (এম) বড় ধরনের তহবিল সংগ্রহ করে। ১৯৭১-এর জুন মাসে সিপিআইর (এম) সহযোগিতায় কলকাতার বেলেঘাটায় একটি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থি কমিউনিস্ট ও অন্যদের নিয়ে একটি সভা হয়। সেখানে মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতেই তাকে আহ্বায়ক করে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে আমরা জ্যোতি বসুর পরামর্শ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি ও কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত সর্বপ্রকার সহায়তার কথা বললেও আমাদের কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত নিজেদেরই স্থির করতে বলেন। অপর দেশে পার্টি ও আন্দোলনের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ বা নিজেদের মত চাপিয়ে না দেওয়ার এই নীতি সিপিআই (এম) সব সময় অনুসরণ করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস জ্যোতি বসুর সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সিপিআইর (এম) দপ্তরে তার ছোট ঘরে বসে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এ সময় তার বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা, বিশেষ করে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে কাজ করছিলাম, তাদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ লক্ষ্য করেছি।

জ্যোতি বসু :১৯১৪-২০১০

জ্যোতি বসু বাংলাদেশকে কত ভালোবাসতেন, সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি পরবর্তীকালে গঙ্গার পানি বণ্টন বিষেয় সৃষ্ট বিরোধে তার ভূমিকা নিয়ে। তখন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের শাসন। দিল্লি গেছি বেড়াতে। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার আমাদের বললেন, তিনি গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে পশ্চিমবাংলায় যাচ্ছেন জ্যোতি বসুর সঙ্গে আলোচনা করতে। আমরা যেন তার আগেই তার সঙ্গে দেশে ফেরার পথে কলকাতায় গিয়ে প্রাথমিক আলাপ করে একটা ইতিবাচক ক্ষেত্র প্রস্তুত করি। আমার মনে আছে, কলকাতায় নেমে আমি, রনো আর কর্নেল আকবর (পরে বিএনপির মন্ত্রী) সিপিআই (এম) অফিসে গিয়ে জ্যোতি বসুর কাছে গঙ্গার পানি প্রশ্নে বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতার বিষয়ে বেশ সময় ধরে আলাপ করি। তিনি আমাদের কথা খুব মন দিয়ে শোনেন এবং আলোচনার ভিত্তিতে এর একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য কেন্দ্রকে বলবেন বলে আশ্বাস দেন। পরদিন হাইকমিশনার তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি তাকেও গঙ্গার পানির ন্যায়সঙ্গত সমাধানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন এবং আকাশবাণী সে কথা প্রচার করলে আমাদের আনন্দ রাখার জায়গা ছিল না। এর ধারাবাহিকতায় জ্যোতি বসুর বিশেষ উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরই ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে এর কিছুদিন আগে তিনি কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও অসীম দাশগুপ্তকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। এর কিছু আগেই কংগ্রেস সরকারের পতন হয়েছে এবং দিল্লিতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছে। সে সময় কথা উঠেছিল শুধু নয়; একেবারে স্থির নিশ্চিত ছিল- জ্যোতি বসু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু সিপিআই (এম) কেন্দ্রীয় কমিটি তাতে মত দেয়নি। দিল্লির কেন্দ্রে একজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী- এ ধরনের একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনার অপমৃত্যুতে এদেশে আমরা নিদারুণভাবে হতাশ হয়েছিলাম। তার পরপরই তিনি বাংলাদেশে আসেন। এ ব্যাপারে তার ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে বিশেষ কৌতূহলী ছিলাম। তবে এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করার কোনো সাহস ছিল না। কিন্তু ঘটনা এমন দাঁড়াল যে, আমাদের পার্টির দেওয়া সংবর্ধনা সভায় নিয়ে আসার জন্য কমরেড রনো তাকে আনতে গেলে তিনি নিজে থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে তাকে বলেন, তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া ছিল একটি 'ঐতিহাসিক ভুল'। রনোর কাছ থেকে এটা জানার পর আমরা বিস্মিতই হয়েছিলাম। তবে তিনি আমাদের মনের কথাই প্রতিধ্বনিত করেছিলেন।

জ্যোতি বসুর বাংলাদেশের প্রতি পক্ষপাতিত্বের আরও প্রমাণ পাই তিন বিঘা করিডোর সমাধানে তার উদ্যোগী ভূমিকার ঘটনায়। এ ক্ষেত্রে তাকে বামফ্রন্টের শরিক আরএসপির কিছু নেতার চরম বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তার পরোয়া করেননি। সম্প্রতি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির রাজ্য সরকারের যে বিরোধিতা আমরা দেখেছি, সেটা জ্যোতি বসু বা বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবাংলার ক্ষমতায় থাকলে হতো না।

জ্যোতি বসু শুধু একজন ভালো কমিউনিস্ট নেতা বা তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন না; ছিলেন দক্ষ প্রশাসক। পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, শিল্পোন্নয়ন- এসব ক্ষেত্রেই তার সরকারের অনন্যসাধারণ ভূমিকা ছিল।

জ্যোতি বসু অনলবর্ষী বক্তা ছিলেন না; ছিলেন ধীরভাষী। কিন্তু তার বক্তৃতা ও আলাপকালে যে দৃঢ়তা ফুটে উঠত, তাতে তার ব্যক্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কলকাতায় কিউবা সংহতি সম্মেলনের সময় তাকে দেখেছি ডিটেইলাস-এ যাওয়া নেতা হিসেবে। ওই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা যে হোটেলে থাকতেন, তার ব্যবস্থা কী রকম সেটা তাকে নিজে গিয়ে খোঁজ নিতে দেখেছি।

জ্যোতি বসুর সঙ্গে আমার ছিল শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক। তিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তো বটেই, পরে যখনই কলকাতায় গেছি, তার সঙ্গে দেখা না করে আসিনি। তাই আমাদের পার্টি- বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা কমরেড অমল সেনের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে তার মহাপ্রয়াণের খবর যখন পেলাম, তখন সেই অনুষ্ঠান শুরু করেই ঢাকায় ফিরে এসেছিলাম তার শেষকৃত্যে উপস্থিত হওয়ার ব্যবস্থা করতে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গিয়েছিলেন সেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। তার সাথী হয়ে কমরেড জ্যোতি বসুকে শেষ দেখার সুযোগ আমার ঘটে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার সুযোগ ঘটেছে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে কাজ করার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যও পেয়েছি। এগুলো আমার জীবনের পরম সম্পদ। ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে কমরেড চৌ-এন-লাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও ঘটেছে। কমরেড ফিদেল কাস্ত্রো ও কমরেড কিম ইল সুংয়ের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ করার সুযোগ হয়েছে। তবে একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে প্রকৃতই যিনি আমাকে মোহাবিষ্ট করেছেন, তিনি জ্যোতি বসু। তিনি সব বাঙালির মনেই চিরজীবী। কমরেড জ্যোতি বসু লাল সালাম।

সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি