জন্মদিন

অনুজের জন্য অযুত শুভেচ্ছা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২১

মোঃ আবদুল হামিদ

আগেও বিভিন্ন সময় বলেছি, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আমার কাছে অনেকটাই বন্দিজীবনের মতো মনে হয়। আমি মাঠের রাজনীতির মানুষ। সেই ষাটের দশকে ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি শুরু করেছিলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক হিসেবে। সুদূর মফস্বলেও আমাদের জন্য ধ্রুবতারা ছিলেন এই মহান নেতা। তাঁরই ছত্রছায়ায় আমি স্থানীয় ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতির গুরুভার গ্রহণের আগ পর্যন্ত সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। যেমন সাধারণ মানুষ, তেমনই সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকরা ছিলেন আমার হৃদয়ের কাছাকাছি। তাদের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা, দুটোই আমি বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছি। প্রথমে ডেপুটি স্পিকার ও পরে স্পিকার, মাঝে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের সঙ্গে সেই হৃদ্যতায় কখনও ছেদ পড়েনি। কিন্তু এখন রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের কারণেই আগের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পারি না। এটা আমার একান্ত দুঃখবোধ। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যম আমার জন্য খোলা জানালার মতো। আমার কাছে দাপ্তরিকভাবে পেপার কাটিং উপস্থাপন করা হয়; কিন্তু এখনও সকালবেলা অখণ্ড সংবাদপত্র পড়া আমার অভ্যাস। বিভিন্ন সময় যখন রাজবন্দি হিসেবে কারাগারে গেছি, তখনও এই অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটেনি। দেশের ও সমাজের প্রকৃত চিত্র সাংবাদিকদের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।

দেশের সাংবাদিকদের কারও কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কয়েক দশকের। তাদেরই একজন ছিলেন দেশের প্রাচীন দৈনিক ইত্তেফাকের সুদীর্ঘ সময়ের বার্তা সম্পাদক এবং পরবর্তী সময় দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারওয়ার। আমরা ছিলাম সমবয়সী ও বন্ধুস্থানীয়। সমকালে সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের সুযোগ্য 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' ছিলেন কবি ও সাংবাদিক মুস্তাফিজ শফি। সমকালের তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক। গোলাম সারওয়ারের প্রয়াণের পর স্বাভাবিকভাবেই তার শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছেন মুস্তাফিজ শফি। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পক্ষে সমকালের যে সম্পাদকীয় নীতি, সেটাকে যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেখে আমার ভালো লাগে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের কারণে সব সময় সম্ভব হয় না, কিন্তু মুস্তাফিজ শফির সাংবাদিকতা নিয়ে আমার অনুচ্চারিত প্রশংসা সব সময়ই তার সঙ্গে থাকে।

বস্তুত সমকালের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই মুস্তাফিজ শফি আমার কাছাকাছি এসেছিলেন। তার আগে তিনি যখন প্রথম আলোতে প্রতিবেদক ছিলেন, যখন নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দৈনিক কালের কণ্ঠ প্রকাশে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন; তখন থেকেই তাকে আমি চিনি। এই তরুণ ও মেধাবী সাংবাদিক খুব সহজেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু এটা স্বীকার করতে হবে, মুস্তাফিজ শফি আমার স্নেহভাজন বৃত্তে প্রবেশ করেছেন সমকালের নির্বাহী সম্পাদক থাকার সময়ই।

সাংবাদিকতা ছাড়াও মুস্তাফিজ শফির সঙ্গে আমার আরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। প্রশাসনিকভাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর সিলেট আলাদা হলেও ভৌগোলিকভাবে এই দুটি অঞ্চলের সম্পর্ক অনেক নিবিড়। দুই অঞ্চলই হাওরাঞ্চল বলে পরিচিত। হাওরাঞ্চলের অভিন্ন জল-হাওয়ায় আমাদের বেড়ে ওঠা; একই সঙ্গে সুরমা-কুশিয়ারা বাহুবেষ্টন করে আছে দুই অঞ্চলকে। আমরা একই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করি। একই রাধারমণ, শাহ আবদুল করিম কিংবা জালাল খাঁ, রশিদ খাঁ, উকিল মুন্সি আমাদের প্রাণে দোলা দেয়। আরেকটি বিষয়ও বলা যেতে পারে, ছাত্রজীবনে আমি যেমন বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের নেতা ছিলাম, মুস্তাফিজ শফিও তেমন ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পাঠ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে।

আমি দেখেছি, মুজিববর্ষ উদযাপনকালে সমকালের সুযোগ্য সম্পাদক, আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন মুস্তাফিজ শফিও বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গ্রন্থ রচনা, সম্পাদনা ও প্রকাশে এগিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু বিষয়ে তার আবেগ ও আগ্রহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অবকাশ নেই। কেবল ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; বর্তমানে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক সমকালেও সূচনালগ্ন থেকে বঙ্গবন্ধু বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ ছিল। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দেশ ও বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা লিখে আসছেন। মুস্তাফিজ শফির বিশেষ অনুরোধে সমকালে আমি নিজেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একাধিকবার লিখেছি, সাক্ষাৎকারে কথা বলেছি। তার অনুরোধ এড়িয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সত্যিই কঠিন। যে কারণে শত ব্যস্ততার মধ্যেও মুস্তাফিজ শফির আবদার আমি ফেলতে পারি না।

এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদও জানাতে চাই। আমি লেখক নই; কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন উপলক্ষেই লিখতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক লেখাও থাকে। বলতে দ্বিধা নেই যে, তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু বিষয়ে লেখাগুলোই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয়। এভাবে আমাকে বিশেষ অনুরোধ করে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুস্তাফিজ শফি যে কিছু লেখা ও কথা আমার কাছ থেকে আদায় করে নিতে পেরেছেন, এটা সুখকর। যে কারণে কয়েক মাস আগে, মুস্তাফিজ শফি যখন বঙ্গবন্ধু বিষয়ে তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর জন্য একটি ভূমিকা লেখার অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন, আমি তাতেও রাজি না হয়ে পারিনি।

সেই ভূমিকার এক অংশে আমি লিখেছিলাম- "সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে মুস্তাফিজ শফির মেধার প্রমাণ আমি দেখে আসছি; কবি এবং লেখক হিসেবেও তার মননের পরিচয় আমি পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি- তার রচিত ও সম্পাদিত বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গ্রন্থগুলোতেও সেই মেধা ও মনন প্রতিফলিত হবে। 'বহুমাত্রিক বঙ্গবন্ধু', 'মুজিব কেন জরুরি', 'শেখ মুজিব মানুষটি কেমন ছিলেন', 'ভাষণ অথবা একটি কবিতার গল্প'- বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মুস্তাফিজ শফির চারটি গ্রন্থই পড়ার জন্য আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করব। আমি প্রত্যাশা করব যে, তার গ্রন্থগুলো লাখো পাঠককে কেবল আলোকিতই করবে না, অন্যান্য লেখক ও সম্পাদককেও অনুপ্রাণিত করবে।"

আজকের এই ক্ষুদ্র লেখার উপলক্ষ অবশ্য খানিকটা ব্যক্তিগত। আমি জেনেছি, ২০ জানুয়ারি ২০২১ স্নেহভাজন মুস্তাফিজ শফি তার জীবনের 'হাফ সেঞ্চুরি' পূর্ণ করতে যাচ্ছেন। এ উপলক্ষেও দুটি কথা লিখতে পারা আমার জন্য নিশ্চয়ই আনন্দের। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও আমি একজন মানুষ। সেই মানুষ আবেগ, ভালোবাসা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। আমিও মুস্তাফিজ শফিকে অনুজপ্রতিম মনে করি। অনুজের জন্মদিনে অগ্রজের পক্ষ থেকে জানাই অযুত শুভেচ্ছা।

আমার তুলনায় যদিও মুস্তাফিজ শফির বয়স খুব বেশি নয়; আবার জীবনে পঞ্চাশ বছর খুব কমও নয়। আমি আনন্দিত যে, সাংবাদিক হিসেবে, লেখক হিসেবে, কবি হিসেবে এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একজন মানুষ হিসেবে মুস্তাফিজ শফি তার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলছেন। মানুষ হিসেবে তার সততা ও সংবেদনশীলতার পরিচয়ও আমি বিভিন্ন উপলক্ষেই পেয়েছি। তার সাফল্য আমাকেও আনন্দিত করে। আমি তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু এবং উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

জন্মদিন উপলক্ষে মুস্তাফিজ শফির বন্ধু ও স্বজন 'উজ্জ্বল পঞ্চাশ' শীর্ষক একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করতে চলেছে বলে জেনেছি। আমি এর সুচারু প্রকাশনা প্রত্যাশা করি। শুভ জন্মদিন, শফি।


  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি