শরণার্থী

রোহিঙ্গা সংকট এবং 'সতর্ক আশাবাদ'

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরম বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ৬টি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বৈঠকের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশার কথা জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো শুরু হতে পারে চলতি বছরই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, তিনি এ ব্যাপারে 'সতর্কভাবে আশাবাদী'। রোডম্যাপ বাস্তবায়নে যে ৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সরকার পরিচালিত নৃশংস গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রাণ রক্ষায় পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার সাদরে বরণ করে। সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ জীবন-যাপনে মৌলিক চাহিদা পূরণসহ সামগ্রিক সার্থক ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। নিকট অতীতে ইউরোপের ২৭টি উন্নত রাষ্ট্র সিরিয়া, ইরাক ও অন্যান্য দেশের নির্যাতিত-নিগৃহীত প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীকে ঘিরে অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। এখনও দক্ষিণ আমেরিকা-আফ্রিকা-অনুন্নত দেশের বিপুল সংখ্যক দেশান্তরী নাগরিকের মানবেতর জীবন থেকে উদ্ধারকল্পে শিল্পোন্নত দেশগুলোয় অভিবাসনের প্রচেষ্টা যারপরনাই যন্ত্রণাদগ্ধ। আর্থিক-কারিগরি সাহায্যের আড়ালে জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে প্রদেয় সহযোগিতা কদাচার উদ্দেশ্য সাধনে কার্যকর রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে একই ধারাবাহিকতায় তাদের মুখরোচক বাচনিক আশ্বাস বাস্তবায়নে এখনও ফলপ্রসূ অর্জন দৃশ্যমান নয়। তিন বছরের অধিককাল অতিক্রান্ত হলেও বিপুল জনঅধ্যুষিত ক্ষুদ্রায়তনের বাংলাদেশকে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক-অযৌক্তিক ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার একর ভূমি ব্যবহারকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নতুন আগমনে সাড়ে ছয় হাজার একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের জন্য নান্দনিক আবাসনসহ পর্যাপ্ত সুবিধা সংবলিত ভাসানচরে দুই দফায় ৪০৬টি পরিবারের প্রায় ৩ হাজার ৪৪৬ জন রোহিঙ্গার অবস্থান প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে আরও ২ হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তুচ্যুত এসব রোহিঙ্গা শরণার্থী দেশে প্রতিনিয়তই নানামুখী সমস্যা তৈরি করে চলেছে। পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও সেবন-ডাকাতি-হত্যা-খুন-নিজেদের মধ্যে মারামারিসহ দুঃসহ ঘটনায় পুরো কক্সবাজার জেলায় অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অবৈধ ও অনৈতিক পন্থায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট-জন্মনিবন্ধন-জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সনদ সংগ্রহ করে বিদেশ গমন-নারী পাচারের হীন স্বার্থসিদ্ধিতে তৎপর রয়েছে। এসব উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তাদের যথাযথ প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের নানা উদ্যোগ সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা হলেও প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান পরিপূর্ণভাবেই রহস্যাবৃত। আদৌ চীন-ভারতসহ বিশ্বসভার সংশ্নিষ্ট নেতৃবৃন্দ সমস্যা উত্তরণে আন্তরিক কিনা, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয়ের উদ্রেক হয়েছে। ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমার সরকারের আন্তরিকতার অভাবের বিষয়টি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়েছে। মন্ত্রী ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের একই ধরনের অনাহূত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেছেন, ১৯৯২ সালে ২ লাখ ৫৩ হাজার শরণার্থীর মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার সরকার ফিরিয়ে নিয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, 'ইতোমধ্যে চারটি মিটিং করেছি। সর্বশেষ মিটিংটা খুবই পজিটিভ মিটিং ছিল। তারা একবাক্যে ওয়াদা করেছে, তারা লোকগুলোকে (রোহিঙ্গা) বুঝাবে। তাদের দেশের উন্নতি হয়েছে। অন্য সময় কিন্তু বলত না। কিন্তু রোহিঙ্গারা তাদের সরকারকে বিশ্বাস করে না। সে জন্য আমরা মিয়ানমারকে বলেছি, তোমাদের বিশ্বাসের ফারাক রয়েছে। বিশ্বাস বাড়ানোর জন্য আমরা তিনবার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু তারা 'হ্যাঁ' বা 'না' কোনো উত্তর দেয়নি। আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আলোচনার মাধ্যমে বড় বড় সমস্যার সমাধান করেছি। আমরা মনে করি, আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব।'

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যকরণে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে আরোপিত শর্তগুলো মিয়ানমার বা প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলো মোটেও আমলে নিয়েছে বলে নূ্যনতম প্রতীয়মান হচ্ছে না। শর্তগুলোর অন্যতম হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা, কেড়ে নেওয়া ভিটেমাটি ফেরত, জানমালের নিরাপত্তা, গণহত্যা-ধর্ষণসহ নির্যাতনে জড়িত সেনাবাহিনী-উগ্রপন্থি মগদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার, ২০১২ সালে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে আশ্রয় শিবিরে রাখা ১ লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গাকে নিজেদের বাসস্থান ফিরিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।

অতিসম্প্রতি ভাসানচরে পাড়ি জমানো রোহিঙ্গাদের অতিশয় সন্তুষ্টি এবং ছেড়ে আসা ক্যাম্পগুলোকে নরকের সঙ্গে তুলনা অন্য রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে অধিকমাত্রায় আগ্রহশীল করে তুলছে। অধিকতর প্রচারিত যে, জাতিসংঘ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন-হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার এই স্থানান্তরের বিরোধিতা ক্রমাগতভাবে দেশবাসীকে হতাশাগ্রস্ত করছে।

দেশবাসী সম্যক অবগত আছে যে, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে রাখাইন রাজ্যে বেশকিছু বাড়ি নির্মাণ করা হলেও তাদের প্রত্যাবাসনে চীনকে প্রভাবিত করার বিষয়ে দেশবাসী সমধিক সন্দিহান। গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় চীনের আগ্রহ, ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে চীন-মিয়ানমারের নিগূঢ় সম্পর্ক ও বিশ্বপরিমণ্ডলে সাম্প্রতিক চীনের প্রভাব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকট দ্রুততর সময়ের মধ্যে নিরসন সুদূরপরাহত মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্তৃক যৌথভাবে গত ১৮ নভেম্বর চতুর্থবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। 'দ্য সিচুয়েশন অব হিউম্যান রাইটস অব দ্য রোহিঙ্গা মুসলিমস অ্যান্ড আদার মাইনরিটিজ ইন মিয়ানমার' শিরোনামে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক কদর্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা প্রস্তাব গৃহীত হয়। বিস্ময়কর ব্যাপারটি হচ্ছে এই, ১৩২ ভোটের সমর্থনে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলেও চীন-রাশিয়াসহ ৯টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। ভারত, জাপান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মতো অত্যন্ত বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো ভোট না দেওয়ার তালিকায় রয়েছে। এই দৃশ্যপট নতুন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে অতিশয় দুর্বল করে মিয়ানমার সরকারের ভূমিকাকেই অতিমাত্রায় সবল করার বিষয়টি সহজেই অনুমেয়।

উল্লিখিত পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবারের বক্তব্য অসীম গুরুত্ব বহন করে। তার মতে, রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু মানবিক সমস্যা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। রোহিঙ্গা সংকটকেন্দ্রিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে এর প্রভাব থেকে চীন-ভারত কেউ বাদ যাবে না। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তাদের জন্য সেফ জোন প্রতিষ্ঠায় জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব আবারও অনিবার্যভাবে সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার পক্ষ থেকে যথাক্রমে মিয়ানমারে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত না হওয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ভূমিকা রাখা উচিত ইত্যাদি চন্দ্রোদয় বক্তব্যের কার্যকারিতা অসার দীপনেই ধর্তব্য।

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে মিয়ানমারের অতি-জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের

ঘৃণা ও ধর্মীয় অসহিষুষ্ণতার আবরণে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যা-অবৈধ গ্রেপ্তার-নির্যাতন-ধর্ষণ-অপব্যবহার ও জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্যবাধকতা রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রস্তাবিত 'সেফ জোন নির্মাণ এবং পূর্ণ মানবিক মর্যাদা-নিরাপত্তা-অধিকারের' ভিত্তিতে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এ সমস্যার টেকসই এবং একমাত্র স্থায়ী সমাধান। অসমর্থিত নানা সামাজিক প্রতিবেদনে জানা যায়, এই নিপীড়িত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় ইত্যবসরে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বড় অংশ হিসেবে তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে দেশের নানা অঞ্চলে ছদ্মবেশে ছড়িয়ে ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতাকে বেগবান করছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যা সমাধানে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরিতে অশুভ শক্তির প্রভাব বহুলাংশেই আবিস্কৃত ও প্রকৃষ্ট অনুভূত। বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে তাদের আত্তীকরণ ও অভিবাসনে উপযোগী পরিবেশ এবং ক্ষেত্র নির্মাণে অদৃশ্য রহস্যের মূলে লুকিয়ে থাকা উৎসগুলোর উপলব্ধি বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বাণিজ্য-উন্নয়ন-বন্ধুত্বের সম্পর্ককে উজ্জ্বলতর করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে প্রতিবেশী ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর ইতিবাচক দায়িত্বশীল ভূমিকা অগ্রগণ্য হওয়া উচিত। চীন-মিয়ানমার-ভারত-পাকিস্তান সমর্থনে ব্যক্তিস্বার্থে স্বকীয় জাতীয় সত্তাকে বিলীন করা কখনও সুস্থ চিন্তা-চেতনার পরিচায়ক হতে পারে না। মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন মাতৃভূমির দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে ধর্ম-বর্ণ-দলমত নির্বিশেষে সবারই কাম্য সাবলীল প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হোক। অতীতের মতো সব সমস্যার সমাধানে অর্থবহ আলাপ-আলোচনার পূর্ণতায় পরাজয় বা পরাভূত করার কুচক্রী মহলের সব অপতৎপরতা নস্যাৎ করে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ বিজয়ী হবেই- দেশের আপামর জনগণের মতো এটি আমারও দৃঢ় বিশ্বাস।

শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়