আবদুল মুক্তাদির ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস্‌ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অন্যতম স্থপতি। আবদুল মুক্তাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগ থেকে ফার্মাসিস্ট ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মাসির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর দেশে ফিরে তিনি একাধিক ওষুধ কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস্‌ লিমিটেড। ইনসেপ্‌টা বর্তমানে ৬৮টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তার জন্ম মাগুরায়


সমকাল: করোনা প্রতিষেধকে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

আবদুল মুক্তাদির: এখন পর্যন্ত বিশ্বে করোনা প্রতিষেধকে ভ্যাকসিন তৈরির যে সাফল্য সেটা এডুকেশনাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন ও কমার্শিয়াল অর্গানাইজেশন মিলে করেছে। আমাদের দেশে এ রকম রিসার্চ ইনস্টিটিউট নেই, যাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে ভ্যাকসিন আনা যাবে। একটা ভ্যাকসিন তৈরিতে তার যে পর্যায়ক্রমিক রিসার্চ ও অনুমোদন লাগে, সেই কাঠামো কিন্তু আমাদের দেশে এখনও নেই। ফলে একটা ভ্যাকসিন তৈরি করলেও আমরা কিন্তু সেটা বাজারে দিতে পারতাম না। আমরা এখন যেটা করতে পারি সেটা হলো, অ্যাপ্রোপ্রিয়েট ও নিরাপদ ভ্যাকসিন যেটা বিশ্বে প্রমাণিত হবে, ওই ভ্যাকসিনটা দেশে তৈরি করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ। আমরা ওই সময়ের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিনটা আমরা দেশেই তৈরি করব। মনে রাখতে হবে, সবার আগে একটি ভ্যাকসিনের সেফটি ও এফিকেসি প্রমাণ করতে হবে। সেটা নিশ্চিত হলে আমরা টেকনোলজি নিয়ে আসব এবং ভ্যাকসিন তৈরি করে মানুষের কাছে দিতে পারব।

সমকাল: বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধের চাহিদা ও আস্থা ক্রমেই বাড়ছে। ওষুধ শিল্প খাতে বাংলাদেশ কতটুকু সক্ষমতা অর্জন করেছে?

আবদুল মুক্তাদির: আমাদের দেশের ওষুধ শিল্প খাতের বিকাশ কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে। এই বিকাশের পেছনে যে সক্ষমতা, স্কিল বা দক্ষতা প্রয়োজন, সেটা এক দিনে হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালি উদ্যোক্তারা পূর্ণোদ্যমে ওষুধ শিল্প খাতে বিনিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দেশে ড্রাগ পলিসি বা ওষুধ নীতি তৈরি হলে বুঝতে বাকি থাকে না যে, পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একই সঙ্গে এও দেখা গেল যে, পৃথিবীর সব দেশে ওষুধ তৈরির ইন্ডাস্ট্রি নেই। ফলে ওষুধ রপ্তানির সুযোগ অবারিত হতে থাকল। এখন আমরা হাই কোয়ালিটির ওষুধ তৈরি করছি এবং বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছি। এটি আমাদের বিরাট সক্ষমতা ও সাফল্য। মানসম্মত ওষুধ তৈরি করেই বিশ্ববাজারে আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পেরেছি।

সমকাল: অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডেন্ট (এপিআই) শিল্প পার্ক পরিপূর্ণভাবে চালু হলে ওষুধ খাতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

আবদুল মুক্তাদির: ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে আমরা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাতে রয়েছি। অনেক সময় তাই ওষুধের সঠিক সরবরাহ ও মূল্য ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডেন্ট (এপিআই) হলে ওষুধের মান, দাম, সরবরাহ- তিন ক্ষেত্রেই একটা স্থিতিশীলতা থাকবে; কোনো ঝুঁকি থাকবে না। এটি হলে রপ্তানিতে আমাদের বিরাট সফলতার সূচনা হবে। দেখুন, পৃথিবীর খুব কম দেশেই এপিআই আছে। দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত ছাড়া আর কারোই নেই। এপিআই পরিপূর্ণভাবে চালু হলে আমাদের ওষুধ শিল্প খাতে এক নতুন মাইলফলক তৈরি হবে।

সমকাল: এ ক্ষেত্রে ইনসেপ্‌টা কী ধরনের ওষুধ ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে?

আবদুল মুক্তাদির: আসলে ওষুধের মান নির্ধারণ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রেগুলেটরি বডি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পৃথিবীর যারা উন্নত দেশ তারা এখন ওষুধের মান বা কোয়ালিটি বিচারের জন্য নির্দিষ্ট একটি মানদণ্ড তৈরি করেছে। গোটা বিশ্বের ওষুধ একই মানদণ্ডে যাচাই করা হয়। যাকে বলা হয় হারমোনাজাইশেন। এই হারমোনাজাইশেন করছে আমেরিকা-ইউরোপ ও জাপান। আমরা সব সময় এই হারমোনাজাইশনের কোয়ালিটি সিস্টেমটা অনুসরণ করি বা মেনে চলি। আমরা ওই প্রযুক্তি নিয়ে এসে মানসম্মত ওষুধ তৈরি করি, যাতে পৃথিবীর সব দেশে এই উৎপাদিত ওষুধ গ্রহণযোগ্য হয়। আমাদের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইউনিটও এগুলো মাথায় রেখে কাজ করে।

সমকাল: ইনসেপ্‌টা প্রতিদিন ৬ লাখ ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে সক্ষম বলে আমরা জেনেছি।

আবদুল মুক্তাদির: আসলে আমাদের ভ্যাকসিন প্লান্ট অনেক বড়। এখানে চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্লান্ট রয়েছে। অনেক ওষুধ তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। আমরা হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, রেবিস, টাইফয়েড, কলেরার ভ্যাকসিন তৈরি করছি। হেপাটাইটিস-ই এটাও বাজারে আসবে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের যে সক্ষমতা সেই বিবেচনায় এই অবকাঠামো অল্প কিছু কাজে লাগছে। কারণ আমাদের দেশে ব্যবহূত হয় এমন সব ভ্যাকসিন গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন্স অ্যান্ড ইমুনাইজেশন) থেকে অল্প খরচে বা বিনা খরচে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সে জন্য ভ্যাকসিনের চাহিদা দেশে কম। কিন্তু ট্রিপস চুক্তির আওতায় ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসির কাতার থেকে বেরিয়ে আসার কথা। তখন কিন্তু বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন ক্রয় করতে হবে। আমরা মনে করি, ভ্যাকসিন উৎপাদনে আমাদের যে সক্ষমতা তখন সেটা পুরোপুরি কাজে লাগবে। আগে থেকেই তাই আমরা খানিকটা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। ভ্যাকসিনে আমাদের যে প্রডাকশন ক্ষমতা আছে, তাতে আমাদের দেশকে অন্য কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

সমকাল: ওষুধ ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তিতে আমাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে কি?

আবদুল মুক্তাদির: প্রতিটি বড় কোম্পানিতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন। গ্লোবাল লেভেলে যে ধরনের দক্ষ মানুষ প্রয়োজন, সেটা আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনেক লম্বা সময় ধরে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের ট্রেইন্ডআপ করতে হয়। তবে আশার কথা হলো, দেশে ওষুধ খাতে দক্ষ জনশক্তির একটা পুল তৈরি হয়েছে, যারা অন্যদের শেখাচ্ছে বা সক্ষম করে তুলছে। এটি আমাদের সামনে যেতে আরও সাহায্য করবে। তবে মনে রাখতে হবে, বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে শিক্ষাক্রম রয়েছে, সেখান থেকে সেই মানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও অনেক পিছিয়ে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলছি তাদের কারিকুলামে পরিবর্তন আনতে, যুগোপযোগী করতে।

সমকাল: নকল ও ভেজাল ওষুধ নিয়ে আপনাদের মধ্যে একটা অসন্তোষ রয়েছে। এটা প্রতিরোধ কীভাবে সম্ভব?

আবদুল মুক্তাদির: কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই খারাপ কাজটি করে যাচ্ছে। দেখুন, নকল ও ভেজাল অব্যাহত থাকলে শত সম্ভাবনার এই খাতকে আমরা যেখানে নিয়ে যেতে চাই, সেটা সম্ভব হবে না। ফলে নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে সবাইকে মিলেই কাজ করতে হবে। অবশ্যই সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এই কাজের ধারাবাহিকতায় আরও কঠিন ও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। নকল ওষুধের উৎস অঙ্কুরেই দমন করতে হবে। আমি মনে করি, সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে একটা 'স্পেশালাইজড সেল' গঠন করা উচিত। যাতে এ খাতের সুনাম, মর্যাদা ও অর্জনকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কোনোভাবে নষ্ট করতে না পারে।

সমকাল: সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন?

আবদুল মুক্তাদির: ওষুধ খাতে সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল লক্ষ্য হলো, বাইরের বাজারটা ধরা। কিন্তু দেশের বাইরে বিনিয়োগ করার বিষয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা ও নিয়ম-নীতি রয়েছে। ফলে আমাদের রপ্তানি প্রসারের জন্য যা যা করা দরকার তা করতে পারি না। সরকার যদি বাইরে বিনিয়োগ বিষয়ে ভালো নীতি গ্রহণ করে তাহলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হয়। আমরা বিনিয়োগ করতে পারি না বলে আমাদের ভালো ভালো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। আবার দেখুন, আমরা ওষুধ তৈরি করতে পারি কিন্তু কাঁচামাল তৈরি করতে পারি না। আমরা এখন কাঁচামাল তৈরিতে হাত দিয়েছি। কিন্তু এখানে চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। যেমন ওষুধ শিল্পে অ্যাসিড লাগবেই। কিন্তু এখানে একটা লাইসেন্স পেতে গেলে অনেক ধাপ পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি কাঠখড় পোড়াতে হয়। আমি মনে করি, কিছু নীতি সহজ করতে হবে। কোনো একটি লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সিঙ্গেল পয়েন্ট বের করতে হবে। এগুলো করা হলে ওষুধ রপ্তানির বাজার আরও প্রসারিত হবে।

সমকাল: অর্থনৈতিক উন্নয়নে ওষুধ শিল্পের ভূমিকা সম্পর্ক কিছু বলুন।

আবদুল মুক্তাদির: অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আছে। বর্তমান সরকার যেভাবে শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার ও সহায়তা করছে, তাতে আমার বিশ্বাস, এটা যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে বাংলাদেশ দ্রুতই উন্নত দেশে পরিণত হবে। এ লক্ষ্যে সরকার, জনগণ, উদ্যোক্তা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সমকাল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আবদুল মুক্তাদির: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা। 

মন্তব্য করুন