এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হুমায়ুন রশিদ। ডিসিসিআইর সাবেক এই সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হুমায়ুন রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সমকাল: করোনাকালে এনার্জি প্যাকের ব্যবসা কেমন চলছে?

হুমায়ুন রশিদ: সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ সার্বিক পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এনার্জি প্যাকের ব্যবসাও এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যেহেতু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করি, তাই ব্যবসা থেমে থাকেনি। কারণ এর চাহিদা থাকে সব সময়।

সমকাল: করোনা মহামারির মধ্যে দেশের সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে কিছু বলুন

হুমায়ুন রশিদ: আমার মতে, করোনার মধ্যেও তুলনামূলকভাবে দেশের অর্থনীতি ভালো চলছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। কৃষি কাজ চলছে, রেমিট্যান্স আসছে, ধীরগতি হলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলমান আছে। ফলে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো বলেই আমি মনে করি।

সমকাল: করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

হুমায়ুন রশিদ: করোনার কারণে নতুন নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইন ব্যবসায় বিপ্লব ঘটেছে। ছোটখাটো অনেক বিষয় অনলাইনেই সেরে ফেলা যায়, যা আগে ভাবা যায়নি। করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে প্রকৌশল সংশ্নিষ্ট ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বাণিজ্য, খাদ্য সরবরাহ ব্যবসা আরও বিকশিত হবে।

সমকাল: আর্থিক খাতে দুর্নীতি বেড়েইে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কী রকম প্রভাব ফেলে, সমাধান কী?

হুমায়ুন রশিদ: দুর্নীতি বাড়লে আর্থিক খাতের ওপর জনগণের বিশ্বাস নষ্ট হয়, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের সম্মতি ছাড়া শুধু একজন-দু'জন এমডির পক্ষে বড় ধরনের দুর্নীতি করা সম্ভব না। কিন্তু আলোচনায় সব সময় শুধু এমডিদের নামই আসে। যেমন পি কে হালদারের কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন। কিন্তু তার একার পক্ষে তো এই টাকা সরানো সম্ভব হয়নি। কেউ ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম নিচ্ছেন না। দুর্নীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন তারা যদি সে দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করেন তাহলে দুর্নীতি বাড়তেই থাকবে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। দুর্নীতি হচ্ছে কেন- সেটা আগে দেখতে হবে। এখানে দুই পক্ষ লাভবান হচ্ছে। যিনি ঘুষ দিচ্ছেন আর যিনি নিচ্ছেন। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সিস্টেমটাকে বদলাতে হবে।

সমকাল: দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের কী অবস্থা?

হুমায়ুন রশিদ: বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসছে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগে আগ্রহ কম। আবার সরকারি ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে চায় না। পুঁজি লগ্নি করাই যে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা, তা তারা মনে করে না। তারা ভাবে, যাকে টাকা ঋণ দিলাম তাকে উপকার করলাম। কিন্তু এর বিনিময়ে সে যে মুনাফা পাচ্ছে, সেটা মাথায় রাখে না। অর্থনীতির অনেক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, আমাদের অনেক ভালো অর্জন আছে, দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির গ্রোথ ভালো, বিশাল যুবশক্তি রয়েছে। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেসের মান বাড়াতে হবে। অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে কর ব্যবস্থা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। যেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন।

সমকাল: পুঁজিবাজারে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আসছে না কেন? বাজার থেকে কেন তারা পুঁজি সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেয় না?

হুমায়ুন রশিদ: পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানিগুলো না আসার কারণ আস্থার সংকট। রেগুলেশনে ঘাটতি। জবাদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এসব কারণে অনেকে আসতে চায় না। সরকারি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রিক জটিলতা একটা বড় বাধা। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনকে বুঝতে হবে বাজার ভালো করতে হলে ভালো ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পুঁজিবাজার বন্ড বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন উদ্যোক্তারা। দেশে বড় বড় অবকাঠামোগত কাজ হচ্ছে, বন্ড ছেড়ে এগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা যায়। লোকজনের হাতে টাকা-পয়সা আছে। কিন্তু নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা পাচ্ছে না। এসব অর্থ বিনিয়োগে কাজে লাগানো গেলে বিদেশের কাছে হাত পাততে হতো না। সরকার চাইলে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড নামে একটি বন্ড ছাড়তে পারে। এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে পারে।

সমকাল: করোনায় দেশের বিদ্যুৎ খাত কেমন চলছে?

হুমায়ুন রশিদ: করোনায় দেশের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষতি হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন দ্বিগুণেরও বেশি। তবে লোড ম্যানেজমেন্টটা ঠিকমতো করতে হবে। গভীর রাতে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমে যায়। প্রয়োজনে রাতের বেলা মিল-কারখানা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যুতের পিক-ননপিক সমস্যা সমাধান করতে হবে। সামনে দেশে অনেক ইকোনমিক জোন আসছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এটাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে।

সমকাল: বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের সমস্যা নিয়ে আপনার মতামত কী?

হুমায়ুন রশিদ: সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনেক কাজ করতে হবে। গাড়ি যতই আধুনিক হোক, রাস্তা ভালো না হলে তা থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না। ফলে বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক ও সক্ষম না হলে শিল্প খাতের উন্নতি আশানুরূপ হবে না। আপনি যতই আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেন, কারখানা অটোমেশন করেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সফটওয়্যার বসান, কোনো কাজে লাগবে না, যদি না নিরবচ্ছিন্ন ও কোয়ালিটি বিদ্যুৎ পান। বিনিয়োগটা পুরোটাই লোকসানে পরিণত হবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেভাবে বেড়েছে, একইভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনও ঠিক করতে হবে। যাতে সবাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায়।

সমকাল: সরকার এক সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। এখন কয়লার পরিবর্তে এলএনজির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। এভাবে বারবার পরিকল্পনার পরিবর্তনকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কীভাবে দেখছেন?

হুমায়ুন রশিদ: একসময় সব ধরনের ফসিল ফুয়েলই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বহুমুখী জ্বালানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। এজন্য কয়লার ওপরও কিছুটা নির্ভরতা থাকতে হবে। কারণ গ্যাসের সরবরাহে যদি কখনও সমস্যা হয়, তাহলে কয়লা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। এলএনজির দাম দ্রুত পরিবর্তনশীল। তারপরও বিশ্বে এলএনজির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে সবদিকে নজর দিয়ে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান নিশ্চিত করে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সুসংহত করতে হবে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সমকাল: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। বাংলাদেশের অর্জন কী?

হুমায়ুন রশিদ: তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক নানান সূচকে আমাদের উন্নতি হয়েছে। এই সূচককে আরও অর্থবহ করতে হবে। আমাদের চিকিৎসাসেবাকে সুচিকিৎসায় নিতে হবে। আশার কথা হলো, এই মহামারি সরকার সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে, যা হয়তো অনেকে ভাবতেই পারেননি। গত এপ্রিলের পর থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য-বাজারঘাট এমনকি শাক-সবজি অনলাইনে কেনাকাটা হচ্ছে। এই যে একটা পরিবর্তন, এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের একটা তরুণ প্রজন্ম রয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশ করোনা মহামারিতে অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারণ তাদের তরুণ প্রজন্ম এতটা সৃজনশীল ও শক্তিশালী নয়।

সমকাল: ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে কী বাধা রয়েছে, সমাধান কী?

হুমায়ুন রশিদ
: আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা এখনই চিহ্নিত করতে হবে। আগামীতে আমরা মধ্য আয়ের দেশ হবো। তখন রপ্তানি খাতে অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে আমাদের নেগোসিয়েশন দক্ষতা বাড়াতে হবে। তরুণ জনশক্তির জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকেও কর্মমুখী করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না।

সমকাল: এনার্জি প্যাককে সামনে কোথায় দেখতে চান?

হুমায়ুন রশিদ: শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বকে বাজার ধরে কাজ করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে এনার্জি প্যাক ন্যাশনাল কোম্পানি থেকে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি হতে চায়। ভারত পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না।

সমকাল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

হুমায়ুন রশিদ: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

মন্তব্য করুন