বহমান সময়ের স্রোতে দিন, ক্ষণ, মাস, বছর অতিক্রান্ত হয়। সময়ের সঙ্গে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়। তবে অনেকেই বেঁচে থাকেন সময়ের স্রোতে। কিংবদন্তি মুহম্মদ খসরু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে বেঁচে থাকবেন চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রবাদতুল্য কর্মে। নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনে আত্মোৎসর্গিত খেপাটে আলোকিত এ মানুষটি ছয় দশক আগে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা করেন। বহুমাত্রিক সৃজনশীল চলচ্চিত্র উপভোগের অপার আগ্রহ ও রুচিবোধ বিস্তৃত করেছিলেন তিনি প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে। তার আঁকা ছবি ব্যবহূত হয়েছে বইয়ের প্রচ্ছদে। ভালো বাঁশি বাজাতেন। তার তোলা আলোকচিত্রে হয় সত্যজিৎ রায়ের পোস্টার। সাহিত্য, চিত্রকলা ও ধ্রুপদি সংগীত বোদ্ধা মুহম্মদ খসরু ছিলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ। চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর তরুণদের হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা।

সমগ্র জীবনের চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রজ্ঞা আর স্বপ্ন নিয়ে মুহম্মদ খসরু শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলেন আন্তরিকভাবে, কোনো রকম একটা ক্যামেরা হলেও ছবি বানানোর যুদ্ধটা শুরু করবেন। শেষ অবধি যুদ্ধটা থেমে যায়। জগতে অনেক অপ্রয়োজনীয় কর্মযজ্ঞ হয়। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি কাজ সেদিন করা যায়নি। নিজেদের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা ছিল। চেনা-জানার গণ্ডির সুহৃদরাও শেষ পর্যন্ত আগ্রহী হলেন না। সব রকম চেষ্টায় উল্লেখযোগ্য কোনো রকম অগ্রগতি হয়নি। বঞ্চিত হই আমরা; বঞ্চিত হয় এ দেশের চলচ্চিত্র। মুহম্মদ খসরুর ছবি বানানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা অধরা থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত সেলুলয়েডে ধারণ করা যায়নি। 'নামহীন-গোত্রহীন' নির্মাণের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

ভারতের হুগলি জেলায় ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুহম্মদ খসরু। প্রথাবিরুদ্ধ এ মানুষটি জন্মদিন পালনে আগ্রহী ছিলেন না। জন্ম তারিখটি অপ্রকাশিত ছিল। ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জের মোহনপুরে তার পৈতৃক ভিটা। বাবার চাকরিসূত্রে ছিলেন হুগলিতে। পঞ্চাশের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে পুনরায় পৈতৃক ভিটায় ফেরেন। মুহম্মদ খসরুর ১৯৭৫ সালে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার 'পালঙ্ক' ছবিতে ভারতীয় চলচ্চিত্রকার রাজেন তরফদারের সঙ্গে সহকারী পরিচালক ছিলেন। সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্তদের কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি তাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি সতীর্থদের নিয়ে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে তোলেন, যা আজকের বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি।

চলচ্চিত্র সংসদ বা ফিল্ম সোসাইটি এ দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অনুষঙ্গ। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র নিয়ে সংগঠন তৈরির রূপকার মুহম্মদ খসরুও ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ ও জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। তার প্রজ্ঞায় সৃষ্টি হয় নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম মানসম্পন্ন প্রকাশনা 'ধ্রুপদী', 'চলচ্চিত্র পত্র' ও 'ক্যামেরা যখন রাইফেল'। প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে অসংখ্য অনিন্দ্যসুন্দর সংকলন। এ সময় এসব অনুপম প্রকাশনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সঙ্গে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এ সবকিছুই হয়েছে মুহম্মদ খসরুর অমানুষিক শ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টায়।

পূর্ব পাকিস্তানে সে আমলে বিদেশি সিনেমা জোগাড় করা ছিল দুরূহ। কিন্তু মুহম্মদ খসরু ফিল্ম সোসাইটির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। সে প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের আগ্রহী বিভিন্ন পর্যায়ের তরুণ প্রজন্ম সুযোগ পায় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার নানা ভাষার ধ্রুপদি চলচ্চিত্র দেখার। মুহম্মদ খসরু নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন চলচ্চিত্রবিষয়ক বিশাল পাঠাগার। সেখানে সারাবিশ্বের চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনা ছাড়াও রয়েছে দুষ্প্রাপ্য বই, ম্যাগাজিন ও জার্নাল। তিনি ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন বইয়ের দোকানগুলোতে প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। সংগ্রহ করেছেন দরকারি দুষ্প্রাপ্য বই-পুস্তক ও সাময়িকী। দেশি-বিদেশি বোদ্ধাদের নিয়ে ওয়ার্কশপ-সেমিনার করে তরুণদের মধ্যে চলচ্চিত্রের শুদ্ধতার বীজ বুনে দিতে চেয়েছেন। চলচ্চিত্রকে বিস্তৃত পরিসরে চর্চার স্বপ্ন নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফিল্ম স্টাডি সেন্টার।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) নকশা কেন্দ্রে আলোকচিত্রী হিসেবে মুহম্মদ খসরু কর্মজীবন শুরু করেন। অবসরের পরও প্রায়ই ঢাকায় আসতেন। সব সময় থাকতেন গ্রামের বাড়ি মোহনপুরে। অনেক ব্যক্তিগত অনুভব আর স্মৃতি রয়েছে তার সঙ্গে। তিনি বেঁচে আছেন ভালোবাসার আন্তরিকতা আর অনেক মুহূর্তের স্মৃতিতে। তার হৃদয়ে ছিল আমাদের জন্য ভালোবাসার উষ্ণতা। এমনকি আমার লেখালেখির প্রতিও ছিল তার খুব মনোযোগ। 'আমার মেয়ে : আত্মজার সাথে কথোপকথন' প্রকাশ হলে তিনি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। মুহম্মদ খসরুর প্রেম-ভালোবাসা, জীবনের অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা। পালিত কন্যা রাজেশ্বরীর কথাও বলছিলেন। বিয়ে না করার কারণ বলেছিলেন খুব মজা করে। অকৃত্রিম ঢাকাইয়া ভাষায়- 'কেউ তো রাজি হইলো না; বিয়ে করুম কারে?' বিভিন্ন ছুটিতে কয়েকবার মোহনপুরের বাড়ি বেড়াতে গেছি। ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে খসরু ভাইয়ের প্রস্থানের সংবাদ পেলাম। তার সঙ্গে শেষ দেখা ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি রওনা হই শিলিগুড়ির উদ্দেশে। গন্তব্য সিকিম। অনেক দূরে তখন; সাদা বরফের দেশ- সিকিমে। অনেক রাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল- সকালে মুহম্মদ খসরুকে নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনে। যদিও তিনি সব ভালোমন্দের অনেক ঊর্ধ্বে।

অমরত্বের লোভ তাকে কখনও হাতছানি দেয়নি। খ্যাতি, অর্থ, বিত্তবৈভব, জীবনের ঝলকানি, রাষ্ট্রীয় পদক, পদ- কোনো কিছুরই প্রত্যাশা করেননি। তবুও প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে বিস্তার ঘটেছে তার স্বপ্নযাত্রার। এ কথা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশে যতদিন চলচ্চিত্রচর্চা হবে, নানা প্রাসঙ্গিকতায় ততদিন মুহম্মদ খসরুও চর্চিত হবেন, বহমান থাকবেন। ব্যক্তি মুহম্মদ খসরু বেঁচে থাকবেন আমাদের ভালোবাসার চাদরে। মায়ায় জড়ানো একটি সম্পর্কের অনুভবে।

গবেষক ও পরিবেশকর্মী

মন্তব্য করুন