একটি জাতির কাছে তাদের স্বাধীনতার ইতিহাস সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল। পরম প্রিয় সেই ইতিহাস। নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস জানার জন্য উদগ্রীব থাকে। কী এমন হলো, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পঠন-পাঠন তরুণদের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে রইল? এটাও গবেষণার বিষয়, কেন বিকৃত ইতিহাস টিকে রইল দীর্ঘ সময় ধরে? স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এই পর্যালোচনা সময়ের দাবিদার। ইতিহাস সম্পর্কে যারা জ্ঞান রাখেন, তারা সবাই স্বীকার করবেন, ইতিহাস ফিকশনের চেয়েও বেশি সাবজেক্টিভ। প্রত্যেক ইতিহাসবিদই ইতিহাসকে নির্মোহভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন।

প্রায় প্রত্যেক একাডেমিক স্কলারই কোনো না কোনোভাবে নিজের অজান্তেই অথবা অজ্ঞাতে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে একটি পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করেন। এ মুহূর্তে নির্মোহ ইতিহাসের বড় প্রয়োজন এই জাতির বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য, যারা এই জাতিসত্তাকে আরও বহুদূর নিয়ে যাবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার সময় জয়-পরাজয় বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় ছিল না। বাঙালির বিজয় অর্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানিদের পাশাপাশি পরাজিত হয়েছিল আরও বেশকিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী, যাদের বিশাল একটা অংশ স্বাধীন বাংলাদেশে বিজয়ী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রং বদলে মিশে গেছে। শুধু মিশে গেলেও অসুবিধা হতো না, '৭১-এ অর্জিত স্বাধীনতার সূর্যকে ডুবিয়ে দিতে তারা বারবার অস্ত্র ধরেছে; খামচে ধরেছে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা।

ভুলে গেলে চলবে না, জুলফিকার আলি ভুট্টোর কনফেডারেশন বানানোর স্বপ্ন সফল করতে পশ্চিম পাকিস্তানি পরাজিত শক্তি ব্যবহার করেছে তাদের সহায়ক শক্তি জামায়াতে ইসলামীসহ বেশকিছু শক্তি। অপশক্তি বঙ্গবন্ধুর সরকারকে মাত্র ৩ বছর ৭ মাসের মধ্যেই ঘায়েল করে বসে। সপরিবারে হত্যা করে জাতির পিতাকে। ১৯৭৫ সালের পর থেকেই স্বাধীনতার এই বিপক্ষ শক্তি দীর্ঘকাল পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণার বাংলাদেশ সৃষ্টির সব আয়োজন করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান 'জয় বাংলা' ধ্বংস করে ফেলা হয়। পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় সব স্তর থেকেই বাংলাদেশ বেতার-টেলিভিশনে বাজতে থাকে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' স্লোগানটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটিও ছিনতাই হয়ে যায়। স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়ে দেওয়া হয় জিয়াউর রহমানকে। আরও অনেক কিছুই করা হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মাত্র ৯ মাসের হলেও স্বাধীনতার ইতিহাস কি ২৬ মার্চ থেকে? নাকি আরও আগের? কত আগে? '৭০-এর নির্বাচন, '৬৯-এর ছয় দফা, ১১ দফার আন্দোলন থেকে? অবশ্যই নয়। বরং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ববাংলা আরেকবার পরাধীন হয়ে পড়ে। পরাধীনতার বিষয়টি সুস্থ হয়ে পড়ে অল্প দিনের মধ্যেই। পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ পূর্ববাংলা হলেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কত রকমভাবে বঞ্চনা করা হয়েছে; কীভাবে পূর্ববাংলাকে কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানের একটি কলোনি করে রাখার পাঁয়তারা করা হয়েছে; সে আলোচনা দীর্ঘ। সংক্ষেপে বঞ্চনার বিষয়গুলো হলো- রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক।

আজকের তরুণ প্রজন্মকে কি জানানো হয়েছে স্বাধিকারের সেই আন্দোলনই এক সময় হয়ে গেছে স্বাধীনতার আন্দোলন এবং চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ? হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর মতো বর্ষীয়ান নেতাদের সঙ্গে বিজলির মতো জ্বলে উঠেছেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নবীন-প্রবীণদের এই অপূর্ব সমন্বয়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সুস্পষ্টভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানকে দেখিয়ে দেয় পূর্ববাংলার শক্তি। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর সঙ্গে বেইমানদের তালিকা দীর্ঘ হতে শুরু করে। জিন্নাহর পর খাজা নাজিমুদ্দিন, তারপর স্যার গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ, ইস্কান্দর মির্জা, পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের হাত ধরে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলি ভুট্টোর দলের সঙ্গে অসংখ্য দালাল কুচক্রী প্রতিহত করেই চলে স্বাধীনতার আন্দোলন। শেরেবাংলার ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব, যেটি লাহোর প্রস্তাব হিসেবে খ্যাত ৬ দফায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই সুর প্রতিধ্বনিত করলেন। তাতেই ক্ষান্ত থাকেননি। নিজস্ব সামরিক শক্তি, নিজস্ব মুদ্রা ইত্যাদি দফা একাত্তরের পূর্ববাংলার স্বাধীনতার দাবিকেই প্রতিষ্ঠিত করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের ২৭ বছর অতিবাহিত করেন লেখাপড়ায়। পড়াশোনা চলাকালে প্রায় ৩ বছর বিভিন্ন অসুখে ভোগেন। ছাত্রজীবন ও ১৩ বছরের জেল-জুলুম বাদ দিলে ১৫ বছর ৪ মাস সময় পান একটি জাতি গঠনের। তাও নিরবচ্ছিন্ন নয়। মোট কথা, ১৬ বছর বয়স থেকে জেল খাটতে এবং একটি জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। বাঙালির ন্যায্য দাবি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী নস্যাৎ করতে যতই চোখ রাঙাতে থাকে; ছয় দফার আন্দোলনকে প্রবল বিপ্লবের দিকে ধাবিত করেন। সিংহপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫৫ বছরের জীবনে ১৪ বছরের জেল-জুলুম তাকে এক বিন্দুও দমাতে পারেনি, বরং তার ভেতরের আগুনই জ্বালিয়ে দেয় প্রবলভাবে। মার্টিন লুথার কিং যেমনটি তার জনগণকে বলেছিলেন- আই হ্যাভ এ ড্রিম। বঙ্গবন্ধু তেমন যেন একই সুরে ৭ কোটি বাঙালিকে জাগিয়ে তুললেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, '৭০-এর নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২ আসনে জয়লাভ করেন। জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল পায় ৮১টি আসন। আর কোনো দলই ৯টির বেশি আসন পায়নি।

বাঙালির ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তারা বিপুলসংখ্যক আসনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। এটাও যুক্ত হয় বাঙালির বঞ্চনার ইতিহাসে, যা বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফাকে এক দফায় পরিণত করে। আর তা হলো বাঙালির স্বাধীনতা। তিনি জানতেন, আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিতে পেরেছেন বিপ্লবে ফুঁসে ওঠা একটি জাতিগোষ্ঠীকে; তারা স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে না আনা পর্যন্ত থামবে না। স্বাধীনতার ভাষণে শোনালেন তিনি স্বাধীনতার অমোঘ বাণী- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেন। জন্ম নিল লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ। স্বাধীন রাষ্ট্রকে শত্রুমুক্ত করার জন্য শুরু হলো সংগ্রাম। বাঙালি সেনা, পুলিশ, ইপিআর, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, মজুর- আপামর জনসাধারণ ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে।

দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করার পর ১৬ ডিসেম্বর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দেশ হলো শত্রুমুক্ত। জাতির পিতা তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। বাঙালি তার দেওয়া হুকুম মেনে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন করল। কিন্তু জাতির পিতার কী হবে- সেই চিন্তায় বাঙালি আনন্দের সঙ্গে দুঃখ-বেদনার অশ্রু মিলিয়ে দিল। ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে বাংলাদেশে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আবেগে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন তিনি। পরে লাখো মানুষের সামনে দেশের মাটিকে চুমু খেয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন- "কবিগুরু, তুমি বলেছিলে- 'সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ কর নি।' কবিগুরু দেখে যাও... বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে...।" তার পরের ইতিহাস প্রথমেই বর্ণনা করেছি।

আজ বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে উন্নয়নের মডেল। বঙ্গবন্ধুর মতো বাঙালির উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেন; স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা; যিনি বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু- পদ্মা সেতু নির্মাণ করলেন। উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক আরও চওড়া হোক ক্রমান্বয়ে।

অধ্যাপক; প্রাক্তন পরিচালক, মাউশি, ঢাকা

মন্তব্য করুন