২১ ফেব্রুয়ারি ছিল গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের জন্মদিন। এই শিল্পী আমাদের প্রান্তিকজনদের নিয়ে যেমন গান গেয়েছেন, তেমনি বিশ্বনন্দিত নেতাদের নিয়েও গান করেছেন। তার গানে লোকায়ত সংস্কৃতিই প্রাধান্য পেয়েছে। লোকায়ত সংস্টৃ্কতি হাজার বছরের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সাংস্টৃ্কতিক বৈশিষ্ট্য। পল্লিনির্ভর বাংলাদেশের সংস্টৃ্কতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক গ্রামের লাখো কোটি মানুষ। গ্রামীণ মানুষ আমাদের সংস্টৃ্কতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলে সে সংস্টৃ্কতির শরীরে ও মর্মে লেগে আছে লোকায়ত মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-সংগ্রামের উত্তাপ ও আবেগ। লোকজীবনকেন্দ্রিক বাঙালি সংস্টৃ্কতি হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষকে ঋদ্ধ করেছে, তাদের দেখিয়েছে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, তাদের শুনিয়েছে সংগ্রামের মন্ত্র। কর্ষণ যেমন পতিত জমিকে করে তোলে ফসলসম্ভবা, তেমনি সংস্টৃ্কতি মানুষকে করে তোলে উন্নত রুচি ও উৎকর্ষময় চিত্তের অধিকারী।

লোকমানসকে সংস্টৃ্কত তথা শিক্ষিত করে তোলাই সংস্টৃ্কতির প্রধান কাজ। কাজেই সংস্টৃ্কতি প্রত্যয়টির মধ্যেই আছে লোকমানসকে শিক্ষা দেওয়ার প্রসঙ্গ। কী সেই শিক্ষা? মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার আহ্বানই সংস্টৃ্কতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা, মানুষের চিত্তকর্ষের আহ্বানই সংস্টৃ্কতির শ্রেষ্ঠ কাজ। বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্টৃ্কতি এ ক্ষেত্রেই অনন্য যে, তা মানুষের চিত্ত-সঞ্চালনে পালন করে আসছে সন্দীপন ভূমিকা। লোকায়ত সংস্টৃ্কতির মূল আবেদন মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীবন্ধন। বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্টৃ্কতিরও মূল শিকড় প্রোথিত আছে মানবমৈত্রীর উদার জমিতে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পরবর্তী সময়খণ্ডে এ প্রবণতার মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হয় না। এখনও আমাদের সংস্টৃ্কতি ঔপনিবেশিকতার ঘেরাটোপে বন্দি। এর সঙ্গে নতুন উপদ্রব হিসেবে যুক্ত হয়েছে করপোরেট পুঁজিশাসিত নতুন নতুন প্রচারমাধ্যম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচারমাধ্যমের বিরতিহীন প্রচেষ্টায় সংস্টৃ্কতিবিষয়ক মূল ধারণা বিকৃত হয়ে পড়েছে, হয়ে পড়েছে সংকুচিত। এ যুগের প্রচারমাধ্যম সংস্টৃ্কতি বলতে বোঝায় নাচ-গান, আবৃত্তি, নাটক, কৌতুক, চুটকি তথা হাল্ক্কা বিনোদনকে। এ বিষয়ে কিংবা এ ধারণায় দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজও আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়।

সব সংস্টৃ্কতিচিন্তকই বিশ্বাস করেন যে, সার্থক সংস্টৃ্কতিই হচ্ছে সর্বজনীন মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়! সংস্টৃ্কতি মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বকে দূর করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীবন্ধন দৃঢ় করে, সংস্টৃ্কতির স্পর্শে মানুষ পরিশুদ্ধ হয়। সংস্টৃ্কতি মানুষকে মানবপ্রেমী করে- এই হচ্ছে সংস্টৃ্কতিচিন্তকদের পরম বিশ্বাস। বিশ্ব-নাগরিকতাবোধ সৃষ্টিতেও সংস্টৃ্কতি পালন করে দূরসঞ্চারী ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথের কথা অনুযায়ী, 'একলা-আমি'র বন্ধন ছিঁড়ে 'বহু-আমি'র প্রাঙ্গণে

যেতে মানুষকে আহ্বান করে সংস্টৃ্কতি। এ সূত্রেই সংস্টৃ্কতি উপনিবেশবাদের শত্রু, সাম্রাজ্যবাদের শত্রু, শত্রু ফ্যাসিবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক চেতনার।

বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্টৃ্কতিচর্চার এই ধারা বা প্রবণতার প্রেক্ষাপটে আমাদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি নাম, বিশেষভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে একটি সংগঠন। আমি গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর আর তার সংগঠন 'ঋষিজ'-এর কথা বলছি। শিল্পী ফকির আলমগীরের বিশিষ্টতা এখানে যে, তার অস্তিত্বের শিকড় প্রোথিত বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্টৃ্কতির বিস্তৃত ভুবনে। গভীর বিশ্বাসে তিনি আলিঙ্গন করে আছেন বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্টৃ্কতির মূল উৎসবে। লোকসমাজের প্রতি জনসংস্টৃ্কতির প্রতি তার বিশ্বাস অতল অতুল। লোকসমাজের প্রতি বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতাই তাকে পৌঁছে দিয়েছে শিল্পের অমরাবতীতে।

ফকির আলমগীর উজান স্রোতের শিল্পী। গতানুগতিক ধারা এবং গড্ডলিকা প্রবাহে তিনি নিজেকে কখনও বিলিয়ে দেননি। শিল্পকে পণ্য হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্পের ছোঁয়ায় মানুষের চিত্তমুক্তি ঘটে। সাম্প্রদায়িকতাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করেন ফকির আলমগীর। শাহরিক 'বাবু'-মধ্যস্তর নয়, তিনি গভীরভাবে একাত্ম হতে চেয়েছেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে, প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে, লাঞ্ছিত 'অপর'দের সঙ্গে। তার 'সখিনা' নগরবাসী কোনো নারী নয়, 'সখিনা' একান্তভাবেই প্রান্তিক নারী। ফকির আলমগীর লোকায়ত সংস্টৃ্কতি, সামাজিক দ্রোহ এবং কেন্দ্রলাঞ্ছিত 'অপর' মানুষকে তার সংগীতের প্রধান বিষয় হিসেবে অঙ্গীকার করেছেন। তিনি যেসব গান লিখেছেন, পরিবেশন করেছেন, সুর দিয়েছেন, সেসব সংগীতে দেখা যায় তার প্রান্তজনপ্রীতির গভীর অঙ্গীকার।

ফকির আলমগীর প্রতিষ্ঠিত 'ঋষিজ' সংগীত সংগঠনের নামও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। বিনোদন নয়, মানুষের চেতনা জাগ্রত করাই 'ঋষিজ'-এর মূল দর্শন। 'ঋষিজ' বাণী আর সুর দিয়ে অভিঘাত তুলতে চায় মানুষের বন্ধ্যা চিত্তলোকে, জড়তাগ্রস্ত মনোলোকে। পল রবসন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, মুকুন্দ দাশ, রমেশ শীল, নিবারণ পণ্ডিত, টগর অধিকারীর মতো ফকির আলমগীর মানবমুক্তির শানিত হাতিয়ার হিসেবে সংগীতকে গ্রহণ করেছেন এবং এ উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বপ্নের 'ঋষিজ'।

ফকির আলমগীর প্রাতিস্বিক মানুষ, ভিন্ন জাতের শিল্পী। তার মতো শিল্পীর সংখ্যা যতই বাড়বে, যতই বাড়বে তার অনুসারী, ততই দেশের কল্যাণ, লোকজীবনের মঙ্গল। লাভ করুন তিনি দীর্ঘজীবন, কর্মময় দীর্ঘজীবন- দিঘল হোক সংগীত নিয়ে তার সংগ্রামের পথ।

উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন