সচেতন যে কোনো মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন যে, কোনো একজন সেনা কর্মকর্তার আহ্বানে দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃত করার নানারকম অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের আলোচনা এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে করা সম্ভব নয়। বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফার ঘোষণা দেওয়া হয় লাহোরে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর বঙ্গবন্ধু বাংলার পথে-প্রান্তরে জনগণের কাছে ছয় দফার মর্মবাণী পৌঁছে দেন। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের শত শত কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সময় জামিন নিয়ে বিকেলে আরেকটি সভার পর তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। তাতেও যখন তাকে দমানো যায়নি, তখন কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাকে ফাঁসি দেওয়ার আয়োজন করা হয়। ইতোমধ্যে বাংলার জনগণের এ উপলব্ধি হয়েছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিপীড়ক ও শোষক। বাংলার মানুষের আর্থিক, রাজনৈতিক তথা সার্বিক মুক্তি আসবে ছয় দফা অর্জনের মাধ্যমে- এই বিশ্বাস ও আস্থাই জনমনে প্রোথিত ছিল। অবশ্য ভাষা আন্দোলন থেকেই বাংলার মানুষের চৈতন্যোদয় হয়। ফলে বাংলার মানুষকে আন্দোলনে লিপ্ত থাকতে হয়। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, '৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা আন্দোলন। এই আন্দোলনের ধারা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৬৯ সালে, যখন শুরু হয় গণঅভ্যুথান। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। জননেতা মওলানা ভাসানীর বিরাট ভূমিকা ছিল এই গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্র-জনতার মিলিত এ অভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন ১৯৬৯ সালের মার্চের ২৪ তারিখ। পাকিস্তানের ঐতিহ্য অনুযায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতায় আসেন। তিনি ঘোষণা দেন, পাকিস্তানে এক ব্যক্তি এক ভোটে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হবে।

সেই সময় নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধু খোলাখুলি বললেন, ছয় দফা হবে তার নির্বাচনী ম্যান্ডেট। এ ব্যাপারে কোনো আপস নেই। কেননা ছয় দফা হলো বাঙালির মুক্তি সনদ। '৭০-এর ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। প্রস্তাবিত জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের ভেতর জনসংখ্যা অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬২টি আসন। আর নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সাতটি। সাধারণ আসনের ১৬২টির ভেতর আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ১৬০টিতে। স্বভাবত সংরক্ষিত সাতটি আসনই আওয়ামী লীগের দখলে যায়। মোট ১৬৭টি আসন গণতান্ত্রিক বিধি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হলেন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। আর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। জেনারেল ইয়াহিয়া ঘোষণা দিলেন- '৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। হঠাৎ ১ মার্চ রেডিওতে জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশ পড়ে শোনানো হলো- জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি করা হয়েছে। এক সময়ের আইয়ুব খানের 'নীল আঁখির বালক' জুলফিকার আলি ভুট্টো আইয়ুবকে ত্যাগ করে নিজেই রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তার দলের নাম পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। তার দল পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ন্যাপ ও অন্য দল। একাত্তরে পশ্চিম পাকিস্তান বলে কোনো প্রদেশ ছিল না। তাই ভুট্টোর পশ্চিম পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা বলার অধিকার ছিল না, যদিও তিনি বারবার এ কথা বলতেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ গোটা বাংলা গর্জে উঠল। কোনো পিকেটিং করতে হয়নি। অফিস-আদালত, কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ বেরিয়ে আসে। চলল সার্বিক ধর্মঘট এবং অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে অসহযোগ আন্দোলনের সার্বিক কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। ওই সভায় প্রথম বারের মতো তিনি স্বাধীনতা কথাটা উচ্চারণ করলেন এবং বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি এ কথাও বললেন, 'আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।' বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো স্বীকৃত দিয়েছে। একটি বইয়ের উল্লেখ করতে চাই। লন্ডন থেকে প্রকাশিত বইটি জ্যাকব এফ ফিল্ডের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত যেসব মনীষী, রাষ্ট্রনেতা, দার্শনিক এক কথায় মহামানবরা বক্তৃতা করেছিলেন, এর মধ্য থেকে ৪১টি বক্তৃতা উদ্ৃব্দত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব বক্তৃতা ইতিহাসকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই উপমহাদেশের একজনের বক্তৃতা উদ্ৃব্দত করা হয়েছে। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকা থেকে পালিয়ে যান। অবশ্য এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার ব্যাপারটা জানতে পেরে বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি বাঙালি নিধনের পরিকল্পনার অনুমোদন দেন, যার নাম 'অপারেশন সার্চলাইট'। এর পরপর বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশবাসীর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একটি দেশের হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দিতে পারেন তিনিই, যাকে জনগণ ক্ষমতা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। সে জন্য বস্তুত ৭ মার্চ '৭১-এ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন অনানুষ্ঠানিকভাবে। তবে ইপিআরের ওয়্যারলেস শক্তিশালী না থাকায় সবাই শুনতে পারেননি। মেজর সিদ্দিক সালিকের 'উইটনেস টু সারেন্ডার' বইতে এই ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে এই ওয়্যারলেস ঘোষণা এবং টেলিফোনের মাধ্যমে প্রায় গোটা দেশ জেনে যায়- পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নেমে পড়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন স্থানে। পাবনার জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করেন এবং সিরাজগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক শহীদ একে শামসুদ্দিন সাহেবকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। ২৬ মার্চ '৭১ সালে কাকডাকা ভোরে টেলিফোনে মহকুমা প্রশাসক আমাকে জানিয়ে দেন, তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন এবং এও বলেন, আমি কী করব সেটা আমার ব্যাপার। আমি তখন সিরাজগঞ্জ মহকুমার রায়গঞ্জ থানার ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে। আমিও প্রতিরোধ করব বলে জানিয়ে দিই তাকে। ওইদিন সকালেই বহু মানুষের সমাবেশ ঘটে। রায়গঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সরকার, ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল, হজরত আলী, আব্দুল খালেক মন্টুসহ অনেককে সঙ্গে নিয়ে আমরা থানার অস্ত্রাগার থেকে সব অস্ত্র বের করে নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করি। আমি জনসমাবেশে ঘোষণা দিই, আজ থেকে আমি পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা নই। দেশের বিভিন্ন স্থানে এভাবে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়। ২৬ মার্চ রাত ৮টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি একটি নামই উচ্চারণ করেন- শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় কোনো নাম উচ্চারণ করেননি। আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এর পরও কি বলার আর কোনো অবকাশ থাকে, স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে অন্য কারও নাম উচ্চারণ করা যায়? জেনারেল জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। জেনারেল জিয়া সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ রয়েছে। তাতে শহীদদের নাম খোদাই করা রয়েছে, তারা শহীদ হয়েছেন ১৯ মার্চ ১৯৭১। অর্থাৎ আমরা যে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি, তার ছয় দিন আগে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে তারা শহীদ হন।

বিএনপি একটি দায়িত্বপূর্ণ বিরোধী দল। সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করা এবং সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু তাদের রাজনীতি ও সমালোচনা গঠনমূলক হোক- এটাই প্রত্যাশা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইতিহাসে চিহ্নিত একটি জনযুদ্ধ হিসেবে। এবার স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করা হবে। স্বাধীনতার পক্ষের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের ও নাগরিকের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই উৎসবে যোগদান করার। বিএনপি যে উদযাপন কমিটি করেছে তার আহ্বায়ক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও ছিলেন। '৭১ সালে তিনি লন্ডনে ছিলেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনে আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছেন বলে জানি। অতএব তিনি ভালোভাবে জানেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যমণি কে এবং কার নামে মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং কে ছিলেন বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। ইতিহাসের বিকৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। যদি তা করা হয় তাহলে ক্ষতি হবে জাতির। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের এমন একজন মহানায়ক তাকে যে বা যারাই প্রত্যক্ষ করেছেন তারাই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আজও বঙ্গবন্ধুই আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। আমরা সেই পথই অনুসরণ করব মুজিববর্ষে- এই হোক আমাদের দৃঢ়প্রত্যয়।

মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা; ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও বীমা খাত বিশ্নেষক

মন্তব্য করুন