আমাদের দুঃখের অন্তহীন এক সাগরে ভাসিয়ে সমকালীন বাংলাদেশের বিবেক বলে পরিচিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আর্থিক খাতের অসংগতি, অশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদা-সোচ্চার স্পষ্টবাদী এই মানুষটির কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু তিনি যে বঙ্গবন্ধুর কোলে-পিঠে উঠে বড় হওয়া আজীবন বঙ্গবন্ধুপ্রেমী একজন সাহসী মানুষ- সে কথা কতটাই-বা জানি! আমাদের জানা আছে, বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ একসময় নিকষ অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনেকে তখন বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারণ করতেও ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি ঠিকই তার মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর ছবিটি রেখে দিয়েছিলেন। দায়িত্ব শেষ করে বাসায় ফেরার সময় ছবিটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক ভাবনা নিয়ে গবেষণার জন্য ঠিক এক বছর আগে (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০) তার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার স্মৃতি, ভালোবাসা, অন্তরঙ্গতা এবং অহংকার নিয়ে অনেক কথাই সেদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন। সেসব কথার কিছুটা আজ পাঠকের সামনে পেশ করছি।

আতিউর রহমান: আপনি যেহেতু ছেলেবেলাতেই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাই সেখান থেকেই শুরু করতে চাই। ছোটবেলায় তাকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

ইব্রাহিম খালেদ: রাজনৈতিক কারণে অনশনের বিষয়টি প্রথম বঙ্গবন্ধুকেই করতে দেখেছি আমার ছেলেবেলায়। কলকাতা থেকে সদ্যই ফিরেছেন। হঠাৎ জানা গেল আমাদের শেখ মুজিব ভাই না খেয়ে আছেন। ছোট ছিলাম তাই বুঝিনি। ভেবেছিলাম হয়তো বাড়িতে রান্না না হওয়ায় খাচ্ছেন না। পরে বড়দের কাছ থেকে শুনলাম, খুলনায় তিনি কিছু একটা দাবি করেছেন এবং সে দাবি পূরণ না হওয়ায় খাওয়া বন্ধ করেছেন। বিকেলে গণমান্য ব্যক্তিরা এসে তাকে খাওয়ালেন। বলা হলো তিনি 'অনশন ভঙ্গ করলেন'। তার কাছে এসবের কারণ জানতে চাইলে বললেন 'বড় হয়ে বুঝবি'।

আরেকটি ঘটনা বলতে পারি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বগুণ সম্পর্কে তখন জেনে গিয়েছিলাম। তার ভক্তও ছিলাম। তবে এ ঘটনায় তার সৃজনশীলতা আমাকে নতুন করে মুগ্ধ করেছিল। ততদিনে বঙ্গবন্ধু আরও বড় নেতা হয়ে গিয়েছেন। তার নেতা অর্থাৎ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারত থেকে ফিরছেন দেশে। বঙ্গবন্ধু বড় সভা করবেন মনঃস্থ করলেও স্বভাবতই বাদ সাধল নূরুল আমিনের সরকার। জারি করা হলো ১৪৪ ধারা। বয়সে ছোটরা আবেগী হলেও বঙ্গবন্ধু সবাইকে শান্ত থাকতে বললেন। 'খামোখা অ্যারেস্ট' না হয়ে আশপাশে থাকতে বললেন। বিকেল ৩টা বা ৪টায় আমাদের খবর পাঠালেন, আমরা যেন ৪-৫ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মধুমতীর পাড়ে হাজির হই। গিয়ে দেখলাম, বাঁশ দিয়ে নদীর মাঝে মঞ্চ করে সভার আয়োজন করেছেন বঙ্গবন্ধু। আর প্রশাসনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন- 'পুলিশ ভাইয়েরা আপনারা বাড়াবাড়ি করবেন না। ... ১৪৪ ধারা থাকে না। তাহলে স্টিমার, লঞ্চ চলবে কী করে?'

আতিউর রহমান:সমসাময়িক অন্য নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পার্থক্য নিয়ে আলোচনায় সব সময়ই বলা হয় বঙ্গবন্ধু অন্যদের তুলনায় সকল স্তরের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বেশি মাত্রায় ধারণ করতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত বা মূল্যায়ন কী?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ (১৯৪১-২০২১)

ইব্রাহিম খালেদ: এক্ষেত্রেও সরাসরি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলা যায়। আমাদের মতো যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না তাদেরও অপশাসনবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত করার কথা বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন। কবি সুফিয়া কামালের বাসায় আমরা যারা আড্ডা দিতে যেতাম, তাদের জন্য বঙ্গবন্ধু একটি পরামর্শ দিলেন। তিনি চাইছিলেন আমরা যেন ছোটদের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। এর লক্ষ্য হবে ভাষা আন্দোলনের পরে বাঙালির মধ্যে জেগে ওঠা আত্মচেতনা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার এই পরামর্শ অনুসারেই গড়ে উঠেছিল 'কচি-কাঁচার মেলা'। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সরাসরি এর সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও পেছন থেকে সুফিয়া কামাল, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন এবং রোকনুজ্জামান (দাদাভাই)- এই তিনজনকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কাজে।

আতিউর রহমান: আমাদের গবেষণার বিষয় যেহেতু বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও কর্মের নান্দনিকতা, তাই আপনার কাছে জানতে চাই তার শিল্পবোধ সম্পর্কে।

ইব্রাহিম খালেদ: কচি-কাঁচার মেলার প্রতি তার যে অনুরাগ তা শুরুতে যেমন ছিল পরেও তা অব্যাহত ছিল, তিনি জাতীয় রাজনীতিতে দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পরও। এখানে তখনকার শিশু-সাহিত্যিকরা আসতেন। বঙ্গবন্ধু সেসব সাহিত্য সভায় প্রায়ই এসে হাজির হতেন তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য। স্বাধীনতার পর একবার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে লন্ডন সফরে সেখানকার হাইকমিশনে এই মেলার শিশুদের আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলেন।

স্বাধীনতার আগে সারাদেশ থেকে কচি-কাঁচার মেলার সদস্য শিশুদের নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠান হলে সেগুলোতে বঙ্গবন্ধু হাজির হতেন। স্বাধীন দেশে তিনি কর্ণধার হওয়ার পর এমন একটি অনুষ্ঠানে তাকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন আসতে না পারলেও ওই শিশুদের সান্নিধ্য পেতে তিনি আগ্রহী। নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন, আমরা যেন শিশুদের একটি দল নিয়ে তার কার্যালয়ে যাই। আমরা গিয়েছিলামও। সবার সঙ্গে তিনি কুশল বিনিময় করেছিলেন, সবাইকে নাশতাও খাইয়েছিলেন। মননশীল চর্চাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে কখনোই তিনি কার্পণ্য করেননি। তবে বঙ্গবন্ধুর শিল্পবোধ সবচেয়ে প্রবলভাবে ধরা পড়ে তার বক্তৃতাগুলোতে। রাজনৈতিক বক্তৃতাতেও তিনি ভেতরের প্রচণ্ড সাহিত্য অনুরাগ প্রতিফলিত করতেন।

আতিউর রহমান: বঙ্গবন্ধুর মানবিকতার বোধ সর্বজনবিদিত। তার চরিত্রের এই দিকটি নিয়ে আপনি কিছু বলুন।

ইব্রাহিম খালেদ: বঙ্গবন্ধুর মানবিকতার বোধ তার অসাম্প্রদায়িক চিন্তায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার এই দিকটি খুবই স্পষ্টভাবে আমি অনুভব করেছি ১৯৬৫ সালের দাঙ্গার সময়। তখন আমি ঢাকায়। শেখ মুজিব আহ্বান জানালেন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। মুসলিম লীগ বা জামায়াত সে সময় একটা সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছিল। সে সময় নারিন্দায় গিয়ে দেখলাম বঙ্গবন্ধু হিন্দুদের বাড়িতে বাড়িতে যাচ্ছেন। তাদের প্রতিটি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লোকজনকে দায়িত্ব দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর এমন অনন্য সাহসী উদ্যোগের কারণেই অপশক্তির চক্রান্তগুলো সে সময় ব্যর্থ হয়েছিল।

আরও আগে আমাদের স্কুলজীবনে দেখেছি দুর্ভিক্ষের কালে আমার ছোট ভাই ঘুরে ঘুরে রুটি সংগ্রহ করতেন, আর শেখ মুজিব সেগুলো নিয়ে গরিব মানুষের বাড়িতে যেতেন। যারা খেতে পাচ্ছিলেন না, তাদের কাছে খাবার পৌঁছাতে তাকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে দেখেছি সব সময়। তিনি বলতেন- 'দেখ দুটো রুটি দিলি তোদের কিন্তু কিছু হলো না, কিন্তু ওই দুটি লোক বেঁচে গেল।' এভাবে ছোটদের মধ্যে নিজের মানবিকতার বোধটুকু সঞ্চারিত করেছেন সব সময়।

ইব্রাহিম খালেদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ। চুম্বক অংশটুকু এখানে তুলে ধরলাম। এখান থেকে এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে কী গভীরভাবে তিনি মূল্যায়ন করেছেন। এভাবে মূল্যায়ন করেছেন বলেই খালেদ ভাই নিজেও সব সময় দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন নিঃশঙ্ক চিত্তে। সব সময় ভেবেছেন প্রান্তিক মানুষের কথা। তিনি আমাদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। আমরাও চেষ্টা করব তার দেখানো পথে এগিয়ে গিয়ে তার স্মৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান জানাতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক; বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
dratiur@gmail.com

মন্তব্য করুন