আমার শরীর যেন হিম হয়ে আছে। একে একে বন্ধু-স্বজনহারা হচ্ছি। বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চাকারী, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, মুক্তচিন্তক আমার অনুজ সৈয়দ আবুল মকসুদের হঠাৎ প্রস্থান আমার সামনে ফের প্রশ্ন রেখেছে- আমি কি শুধু একের পর শোকাঞ্জলিই লিখে যাব! ২৩ ফেব্রুয়ারি অপরাহেপ্ত ঢাকার নিজ বাসায় সৈয়দ আবুল মকসুদ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি প্রাণত্যাগ করেন- এই সংবাদটি টেলিভিশনের স্ট্ক্রলে ওই রাতেই ভেসে ওঠার মুহূর্তে স্তব্ধতা-শোক-বেদনা জাপটে ধরে। দীর্ঘদিনের পরিচয়ের-আলাপের-আড্ডার নানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মানসপটে। নিকট অতীতে রাজশাহী এসেছিলেন তার কন্যাকে নিয়ে কোনো এক অনুষ্ঠানে। এক রাত যাপন করেছিলেন আমার গৃহে। রাতটা প্রায় দু'জনেরই বিনিদ্র কেটেছিল আলাপে-গল্পে। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঢাকার আজিমপুরে অনেক আগে। তারপর থেকে সম্পর্কের সড়ক ক্রমেই চওড়া হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তার পরিসর কতটা বিস্তৃত হয়েছিল এর বর্ণনা দেওয়া এ মুহূর্তে আমার পক্ষে ভার।

সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার একজন নিরন্তর সাধক। তার গবেষণাকর্ম অনেক বিস্তৃত। তিনি দেশ-বিদেশের বরেণ্য রাজনীতিকদের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথসহ নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিমান এমন অনেককে নিয়েই গবেষণা করে আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন। যৌবনকালে তার যে গবেষণা কাজ শুরু হয়েছিল, তা চলছিল বলতে গেলে আমৃত্যু। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বলতে পারি, সাধারণত গবেষণাধর্মী কাজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যতটা হয়, ব্যক্তির মাধ্যমে ঠিক তা ততটা (বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়টি আলাদা) ব্যাপকভাবে হয় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি আমার অনুজ বটে, কিন্তু নৈকট্য ছিল একেবারে সহপাঠী বন্ধুর মতো। তিনি নিজেই যেন একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা কাজ করে গেছেন। শিক্ষা, বিশেষ করে নারীশিক্ষা নিয়ে ব্যাপক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে যে গবেষণালব্ধ ফসল রেখে গেছেন, তা প্রজন্ম অনুসরণ করবে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ ও মওলানা ভাসানীকে নিয়ে তার গবেষণাও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গবেষণায় তার সমকক্ষ খুব কমই আছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন গবেষণা নিয়েই।

সৈয়দ আবুল মকসুদের সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় সম্ভবত ষাটের দশকে নবযুগ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর সাপ্তাহিক জনতায় যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে যোগ দেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়। তার প্রবন্ধের গভীরতা কতটুকু তা বোদ্ধা পাঠকমাত্রেরই জানা। রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে নিয়মিত পত্রিকায় প্রকাশিত তার কলামগুলো তাকে পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। তার কলামগুলো অত্যন্ত ক্ষুরধার ছিল এবং পাঠককে এজন্যই খুব আকৃষ্ট করত। পাশাপাশি কাব্যচর্চায়ও তার খ্যাতি কম নয়। গল্পও একইভাবে মূল্যায়িত। তার কাব্যগ্রন্থ 'বিকেল বেলা' ও 'দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা' কবিতাপ্রেমীদের কাছে প্রিয় দুটি কাব্যগ্রন্থ। যুদ্ধ ও মানুষের মূর্খতা, গান্ধী-নেহরু ও নোয়াখালী, ঢাকার বুদ্ধদেব বসু, প্রতীচ্য প্রতিভা, রাজনীতি ও ধর্মীয় রাজনীতি, রবীন্দ্র রাজনীতি ইত্যাদি আলোচিত প্রবন্ধগ্রন্থ। জীবনীমূল গ্রন্থের মধ্যে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন, কর্মকাণ্ড, রাজনীতি ও দর্শন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র জীবন ও সাহিত্য, ভাসানী কাহিনী, স্মৃতিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, গান্ধী মিশন ডায়েরি, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। জার্নাল অব জার্মানি তার সুপাঠ্য ভ্রমণকাহিনিমূলক গ্রন্থ। এসব বিষয় বিবেচনায় সহজেই ধারণা করা যায়, সৈয়দ আবুল মকসুদ কত বড় মাপের বহুমাত্রিক লেখক-গবেষক ছিলেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ (১৯৪৬-২০২১)

সৈয়দ আবুল মকসুদ মানবতাবাদকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর মতো তিনি সেলাইবিহীন দুই খণ্ড সাদা কাপড় পরতেন। ভিন্নধর্মী এই পোশাকেই ছিল তার সর্বত্র যাতায়াত। যতদূর জানি, ইরাকে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে তিনি আমাদের দেশে একেবারে প্রথমেই প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম অগ্রগণ্য। গান্ধীবাদী হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবুল মকসুদ নির্মোহ ও সত্যান্বেষী ছিলেন। তাকে কেউ কেউ বলতেন 'ঠোঁটকাটা' স্বভাবের মানুষ। তা তো বটেই। তিনি স্পষ্টভাষী ছিলেন এবং এজন্যই কারোর রাগ-অনুরাগ-বিরাগের বিষয়গুলো আমলে না রেখে যা বলার তা-ই বলে দিতেন। মৃত্যু অনিবার্য সত্য। মৃত্যুকে এড়ানোর পথ নেই। তবু কারও কারও পরিণত বয়সে মৃত্যুও মনে হয় যেন অকালমৃত্যু। আমারও বয়স তো অনেকই হলো। বয়সের ভারে অনেকটাই নুইয়ে গেছি বটে, কিন্তু লেখালেখি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারি না। সৈয়দ আবুল মকসুদকে নিয়ে এই বেদনাকাতর লেখাটিও এ তাগিদ থেকেই। তাছাড়া তার সঙ্গে সম্পর্ক-ঘনিষ্ঠতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হৃদয়ের টানের যে দায়বদ্ধতা, তাও তো এড়ানোর নয়।

'অকস্মাৎ চলে গেলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ'- সৈয়দ আবুল মকসুদের চির প্রস্থানের সংবাদ প্রতিবেদনের সমকালের এই শিরোনাম একেবারেই সঠিক। অকস্মাৎই তো! কোনো ব্যাধিক্রান্ত ছিলেন বলে তো শুনিনি! এমন অবস্থায় যারা চলে যান, তাদের ক্ষেত্রে 'অকস্মাৎ' শব্দটিই যথার্থ। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা, গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সব সময়ই থাকতেন অগ্রগামী। সাংবাদিকতা, সামাজিক আন্দোলন, গবেষণা, লেখালেখি এসবই তার চলত সমান্তরালে। তার মতামত, গবেষণা, চিন্তা এসব ক্ষেত্রেই গভীরতা দৃশ্যমান। পরিবেশ রক্ষায়ও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি। মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারেও সৈয়দ আবুল মকসুদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তার সঙ্গে যখনই আলাপ হয়েছে কিংবা আড্ডায়-গল্পে আমরা মজে থাকতাম, তখনও এসব বিষয়ই উঠে আসত। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঋষিজ পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার-সম্মাননায় সৈয়দ আবুল মকসুদ ভূষিত হলেও তাকে আরও দেওয়ায় আমাদের বাকি ছিল। আমাদের সমাজে পরশ্রীকাতরতা, ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনও কখনও প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার প্রলম্বিত যে ছায়া দৃশ্যমান হয়, তা কল্যাণকর নয়। সৈয়দ আবুল মকসুদ এসব কথাও স্মরণ করিয়ে দিতেন।

তিনি শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে নেই সত্য; কিন্তু তার কাজের মধ্যে, রেখে যাওয়া কর্ম অধ্যায়ের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন। প্রজন্মের প্রতিনিধিরা গবেষণা করতে গেলে তার রেখে যাওয়া ফসলের দিকে হাত বাড়াবেন- এ আমার বিশ্বাস। সব মানুষই তো তার সৃষ্টি কিংবা কর্মের মাঝে টিকে থাকে না। যারা সেই পর্যায়ে যেতে পারে, তারাই টিকে থাকে এবং তাদের প্রয়োজন সমাজের মানুষের কাছে কখনও ফুরিয়ে যায় না। সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন পরিপূর্ণ মানুষ। তার সৃষ্টি, তার কাজ, তার গবেষণা আমাদের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নিজ কর্মগুণেই। একজন ব্যক্তিও কীভাবে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেন এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে অনেক আছে। আমরা এই ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান থেকে বরাবরই উপকৃত হয়ে আসছি। সৈয়দ আবুল মকসুদের অনুসন্ধিৎসা অনেক গভীর থেকে অনেক কিছু তুলে এনেছে। তাকে আমরা স্মরণ রাখব আমাদের প্রয়োজনেই। তার চলে যাওয়া অপরিসীম বেদনার।

সৈয়দ আবুল মকসুদ যে কোনো ঘটনার ভেতরে ঢুকে ঘটনা বিশ্নেষণ করতেন, সমীকরণ কষতেন। এ জন্যই পরিণত বয়সেও এমন মানুষদের চলে যাওয়াটা বড় ধরনের অপূর্ণতা বোধের মধ্যে যেন মানুষকে ফেলে দেয়। সৃজনশীলতা-সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল মকসুদের থেমে না থাকা অব্যাহত ছিল তার জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। ইতিহাসনির্ভর তথ্য সংগ্রাহক, গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের জ্ঞানচর্চা প্রজন্মের কাছে অনুসরণযোগ্য হয়ে থাকবে।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ

মন্তব্য করুন