একাত্তরের ৭ মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠের ভাষণ আমাদের কালজয়ী মহাকাব্য। মাত্র ১৯ মিনিট। এর শব্দসংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪১টি। কোনো পাণ্ডুলিপি ছাড়া একটি ভাষণ। আমার মন, আমার দর্শন বলে এটি অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। স্বাধীনতাকামী মানুষের বক্তব্য, সব নির্যাতিত মানুষের ধ্যান-জ্ঞান। তখন দেখেছি ছাত্রছাত্রীসহ সবার জন্য এ ছিল প্রবল উৎসাহের জায়গা। ৭ মার্চের ভাষণ বুকে ধারণ করে মুক্তিকামী সবাই ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে, বন্দরে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষ, যতদিন আমাদের মাটি, পানি, গাছ, ফুল, ফল, লতা-পাতা থাকবে, ততদিনই থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। সালাম তোমায় শতকোটি সালাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ধন-ধান্যের কবি দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, বাংলার নবজাগরণের কবি রজনীকান্ত সেন, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ, পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন, সাঁঝের মায়ার কবি বেগম সুফিয়া কামাল, নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের বঙ্গবন্ধু রচনা করেছিলেন কালজয়ী মহাকাব্য। এটা আমাদের পরিচয়। এ আমাদের অত্যুৎকৃষ্ট গর্ব। ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা- আহা কী মধুর সুর মিশ্রিত বাক্য!

'তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা'- দিকে দিকে ধ্বনিত হতে লাগল। বাংলার প্রতিটি মানুষ তাকিয়ে থাকল বঙ্গবন্ধুর দিকে। বঙ্গবন্ধু কী বলেন- এই অপেক্ষা। ষড়যন্ত্রকারীরা ষড়যন্ত্রের ছক কষতে শুরু করে। ক্রমে ওদের ষড়যন্ত্র বাংলার মানুষ বুঝতে শুরু করল। ওদের ষড়যন্ত্রের জাল চতুর্দিকে বিস্তার করতে শুরু করে। হীন পিশাচের দল যতসব খারাপ কুৎসিত নীতির দিকেই এগিয়ে চলল। ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হলো ওদের নৃশংসতা। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর ছক অনুযায়ী এগিয়ে চলল। ওদের অমানবিক নৃশংসতার কারণে সবাই দিজ্ঞ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। যে যেখানে পারছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে। শত্রুরা আমাদের শহর-গ্রাম-গঞ্জে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে শুরু করে। তা ছিল এতই নৃশংস কেউ কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি আর পারবেও না। কোনো ভাষায়ই এ নৃশংসতা প্রকাশ করা যাবে না। এই মারাত্মক অস্বস্তির ঢেউ আমাদের পরিবারকেও ছুঁয়ে গেল। আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কারণ আমার মেজদার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আমাদের বাসায় তখন অন্য এক অবস্থা। ওই অবস্থা মনে হলে এখনও আমার শরীরে কাঁটা দেয়। মেজদা তখন সিলেট এমসি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক। ওই সময় আমাদের এলাকার অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রওনা হন। সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার সময় একটা দৃশ্য আজও আমাকে উদ্বেলিত করে। ওই সময় খোয়াই, আগরতলার অনেক যুবক, শিক্ষার্থী শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য রাতদিন কী যে পরিশ্রম করেছে, তা আমার চোখ থেকে, মন থেকে আজও মুছতে পারিনি। খোয়াই নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে কিংবা নদী দিয়ে মানুষকে পার করে দিচ্ছে। আর জিনিসপত্র মাথায় করে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মাথায় করে পার করে দিচ্ছে। ওদের সেই অবদান যেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথকে বাস্তবায়ন করতে আরও বেগবান করেছিল।

শরণার্থী ক্যাম্প, দুস্থ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তখন দেখেছি, শরণার্থীরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে কীভাবে যে স্মরণ করেছে, অনেক জায়গায় দেখেছি। তার মুক্তির জন্য, তাকে পাওয়ার জন্য যার যার অবস্থান থেকে প্রার্থনা করেছে। এ ছিল তখনকার সময়ে সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়গুলোর অন্যতম। সেসব দৃশ্য-ঘটনা মনে পড়ে। বেশ কিছুদিন পর আমার মেজদা অনেক গ্রাম, দুর্গম স্থান পেরিয়ে আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। সেদিনটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্য অপার আনন্দের। বিগত চার বছর আগে মেজদা আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। খোয়াই, তেলিয়ামুড়া, আগরতলা এ সব জায়গার মানুষরা আমাদের বলত জয় বাংলার মানুষ। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা আর বাংলাদেশ ছিল আমাদের কাছে এক পরম পাওয়া। মনে পড়ে, হঠাৎ এক রাতে দুইটা-আড়াইটা হবে একজন নারীর কাতর স্বরে চিৎকার শুনে দৌড়ে গেলাম। দেখলাম, তার অসুস্থতা প্রবল, তাকে হাসপাতালে নিতেই হবে। সময়ক্ষেপণ না করে বেরিয়ে পড়লাম। একজন বন্ধুকে ডেকে তুলে বললাম, এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে। রিকশার খোঁজে দৌড়াদৌড়ি করে শেষমেশ ঠেলাগাড়ির গ্যারেজে গেলাম। মালিককে ডেকে তুললাম, তাৎক্ষণিক তিনি বললেন গাড়ি নিয়ে যান। খোয়াই শহরের হাসপাতাল বেশ উঁচু জায়গায়। আমরা দু'জন আর অসুস্থ মানুষটির স্বামী মিলে নারীকে ঠেলাগাড়িতে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম। হাসপাতালের একজন বললেন, সকালে ভর্তি হতে হবে। আমরা ভেঙে পড়লাম, এমন সময় ভেতর থেকে একজন নার্স এসে বললেন, এরা তো জয় বাংলার মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর নার্স এসে বললেন, ছেলেসন্তান হয়েছে।

খোয়াই হাসপাতালের নার্সদের ওইদিনের ভূমিকা ও তাদের সাহায্য-সহানুভূতি দেখে মহীয়সী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথা মনে পড়েছিল। সেই যে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, আহত সৈনিকদের পাশে থেকে যথাযথ সেবা-যত্ন দিয়ে তাদের সুস্থ করে তুলেছিলেন। আমি সেই ভদ্রমহিলার স্বামীকে বলেছিলাম, ছেলের নাম রাখবেন জয় বাংলা। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেল তার সঙ্গে আর দেখা হলো না। ঠেলাগাড়ি ফেরত দেওয়ার সময় গাড়ির মালিককে চার আনার একটি সিকি দিয়েছিলাম। কারণ আমার পকেটে তখন দুটো সিকি ছিল। মালিক বললেন, আমার সৌভাগ্য যে, আমি কিছুটা হলেও করতে পেরেছি। অনেক অনুরোধ করার পরও সিকিটা নিলেন না। খোয়াই শহরে একজন ডাক্তার ছিলেন। ডাক্তার খগেশ, তার কাছে গিয়েছি। প্রথম প্রথম তিনি ভিজিট হিসেবে পয়সা নিতেন। কিন্তু পরে ডাক্তার আর টাকা নেননি। আমাদের হাতের টাকাও সব ব্যান্ড হয়ে গিয়েছিল। আমাদের তখন খুব কষ্ট করেই চলতে হয়েছে। ডাক্তার এবং খোয়াই শহরের মানুষ অনেক উপকার করেছেন। তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ পত্রিকার খবরে জানতে পারি, স্বপন কুমার ভট্টাচার্য আগরতলার উদয়পুর থেকে লিখছেন, 'সেই সময়ের জেল সুপার প্রয়াত ননীগোপাল কর ভৌমিকের সরকারি আবাসে শেখ মুজিবকে রাখা হয়। নাম বদল করে আইনি প্রক্রিয়া মেনে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ননীগোপাল কর ভৌমিকের সরকারি আবাসে যে চেয়ারটিতে বসেছিলেন, সেটি তার ছেলে গৌতম কর ভৌমিকের কাছে এখনও রয়েছে। এই চেয়ারটি কর ভৌমিক পরিবার অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে রক্ষা করে আসছে দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে। এই চেয়ারে কেউ বসেন না। ননীগোপাল কর ভৌমিক সম্ভবত ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদে শেখ মুজিবের আগরতলা আগমন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছিলেন। ওই লেখাটি পড়েছিলাম। কর ভৌমিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে ওই লেখাটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, কারণ ওই পত্রিকাটি তাদের কাছে নেই।'

শরণার্থী জীবন শেষে একাত্তরের ডিসেম্ব্বরে বিজয়ের মাসে দেশে চলে আসি। আমাদের ঘরবাড়ির চতুর্দিকের বেষ্টনী ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি সারাদেশের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দর্শনের স্বপ্নপূরণ হলো। স্মৃতিতে অনেক কিছুই প্রকট হয়ে ওঠে আবার অনেক কিছুই মনে হয় নিয়মানুগতভাবে সাজাতে গিয়ে সঠিক হয় না। ১৯৭৪ সাল, ২১ ফেব্রুয়ারির বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানমালা। আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো লাগার অনুষ্ঠান। জগন্নাথ হল থেকে প্রতিদিনই সকালে যেতাম আর অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতাম। নামকরা সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা আর টুঙ্গিপাড়ার মা-বাবার আদরের 'খোকা' এবং চুরুলিয়ার দুখু মিয়া এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। ছাত্রছাত্রী, সাধারণ মানুষসহ আমরা সবাই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। একসঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট বঙ্গবন্ধু আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সে এক অনন্য দৃশ্য। দর্শকদের কেউই তখন চোখের পলক ফেলতে পারেননি। প্রত্যেকেরই জীবন স্মৃতির এক অসাধারণ আর সুন্দরতম ঘটনা। মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথা। আমরা ছাত্ররা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখার প্রবল আশায় শহীদ মিনারে সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে ১২টা বেজে ১ মিনিটে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। চতুর্দিকে তুমুল ধ্বনি উঠল- 'জয় বাংলা' আর ভিড়ের মাঝেই আমাদের স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে থাকার মাঝখান দিয়ে বঙ্গবন্ধু শহীদ মিনারে প্রবেশ করলেন। চোখের সামনে সেই মহান বীরের স্পর্শ আর দেখা আজও স্মৃতির পটে জ্বলজ্বল করে। বঙ্গবন্ধু নেমে যাওয়ার সময় শহীদ মিনারের শেষ সিঁড়িতে এসে স্লোগান দিয়েছিলেন 'শহীদ স্মৃতি অমর হোক'। কিছুতেই যেন ভুলতে পারি না সেই স্মৃতি।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, নটর ডেম

কলেজ, ঢাকা

মন্তব্য করুন