স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ের দিকে আমরা নানাভাবে ফিরে তাকাচ্ছি। সেই বিপুল ও ব্যাপক জনযুদ্ধের অনেক ঘটনাই ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। আড়ালেও রয়ে গেছে অনেকের অবদান ও আত্মত্যাগ। অর্ধশতক পরে এসেও এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরতে এই নিবন্ধের অবতারণা।

আমার পিতা মরহুম মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে। সরকারি চাকরিতে থেকেও তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। উত্তাল মার্চে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন চট্টগ্রামের আন্দোলন-সংগ্রামে। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী এম এ হান্নানের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন আমার পিতা এম এ হালিম।

একাত্তরে আমি ছিলাম অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বাবা মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে মা ও ভাই-বোনসহ আমাদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নোয়াখালীতে গ্রামের বাড়িতে। সেখান থেকে আমার চাচা যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন, তখন আমিও যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর যখন বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া 'নিষিদ্ধ' ছিল, তখনও আমার পিতা সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। দুঃসময়েও তিনি ছিলেন নিখাদ বঙ্গবন্ধুপ্রেমী। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে লেখালেখি করতেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় ১৯৯২ সালের স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় প্রকাশিত এমনই একটি নিবন্ধ এখনও আমার সংগ্রহে রয়েছে। সেখানে তিনি তুলে ধরেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অজানা অধ্যায়।

'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের গোড়ার কথা' শিরোনামে ওই নিবন্ধ তিনি শুরু করেছিলেন এভাবে- "১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবন থেকে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র' এই নামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে এ পর্যন্ত অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু তারপরও অনেক কথা থেকে যায়। প্রত্যক্ষভাবে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে।"

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন, সেই সময় চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম লিখেছেন- ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে রাজধানী ঢাকার নিরীহ জনসাধারণ, বাঙালি সামরিক অফিসার, জওয়ান এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের সংবাদ চট্টগ্রামে পৌঁছালে ২৬ মার্চ সকাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারি কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে আনুমানিক ২টা হতে ৩টার মধ্যে মাইকযোগে প্রচার করা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সারারাত মানুষের চোখে ঘুম আসেনি। সবাই স্বাধীনতা ঘোষণার কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল। এরই মধ্যে জনসাধারণের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত এক নির্দেশাবলি টেলিগ্রাম আকারে ইংরেজিতে সকাল থেকে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়। টেলিগ্রামের মর্মকথা ছিল- 'রাজারবাগ ও পিলখানায় (ঢাকায়) শত-সহস্র বাঙালি পুলিশ ও আর্মির লোকদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। তোমাদের কাছে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর এবং শত্রুদের হাত হতে বাংলাদেশকে মুক্ত কর, জয় বাংলা।'

কীভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হলো, এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন- "তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। বেবিট্যাক্সিতে মাইকযোগে আগ্রাবাদ, ফকিরহাট ও দেওয়ানহাট এলাকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করি। আমার সঙ্গে তখন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ট্রেজারি সেকশনের জনাব ফজলুল হক (বর্তমানে সুপার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত) ও মো. আলম নামে আরেকজন সহযোগী ছিলেন। রেডিওর ব্যাপারে অনেকেই উৎসাহ দেখান। পরবর্তীতে আমি ব্যক্তিগতভাবে তৎকালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এম এ হান্নানের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা হই। চট্টগ্রাম জিপিওর সামনে কিছু লোকজন এবং কর্মীর সঙ্গে আলোচনা অবস্থায় তাকে দেখতে পাই। আমি হান্নান সাহেবকে বিস্তারিত ঘটনা বলি। তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন- 'তোমরাও কি উহা পেয়েছো?' আমি বললাম, জি পেয়েছি। আপনি যদি এখন দয়া করে আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে যান তাহলে রেডিও অফিসের কর্মকর্তারা আপনার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে আমি মনে করি। আমার কথা শোনার পরপরই এম এ হান্নান আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে আসার জন্য রাজি হন এবং সেখানে ঠিক করা হলো যে, এম এ হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ইতোমধ্যে জানতে পারলাম যে, দেশে মার্শাল ল জারি করা হয়েছে। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনিতে কয়েকজন রেডিও অফিসারের বাসা থাকলেও কারও বাসা আমার জানা ছিল না।"

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা এমএ হালিম ওই নিবন্ধে লেখেন- "কয়েকজন কলোনিবাসীকে নিয়ে মির্জা নাছির সাহেবের বাসায় যাই। তিনি আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। তাকে বিস্তারিত ঘটনা অবগত করি এবং হান্নান সাহেবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করি। তিনি ভীত হয়ে পড়লেন। ঘর থেকে বের হতে ইতস্তত করছিলেন। লোকজনের ভিড় দেখে মির্জা সাহেবের বাসার সামনে থামলেন এবং বাসায় এসে আমাকে ঘটনার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আমাদের দলীয় লোক মনে করে সব ঘটনা তাদের কাছে প্রকাশ করলাম। ইতোমধ্যে খবর এলো, হান্নান সাহেব আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে পৌঁছেছেন। হান্নান সাহেবের সঙ্গে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী ছিলেন। এমএ হান্নান সাহেবের সঙ্গে সবাই পরিচিত হন। হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধুর বাণীর মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাইলে মির্জা নাছির ও মো. আ. ছোবাহান রেডিও চালু করতে রাজি হন। কিন্তু মির্জা সাহেব জানালেন, চট্টগ্রামের বেতার অপেক্ষা কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচার করা সহজতর হবে। আমাদের কারও ধারণা ছিল না, কালুরঘাটে একটা ব্রডকাস্টিং সেন্টার আছে। তাড়াহুড়া করে আমরা সবাই আগ্রাবাদ রেডিও অফিস থেকে কালুরঘাটের দিকে রওনা হলাম। আমরা রেডিও স্টেশনে ঢুকলাম। হান্নান সাহেব তাড়াতাড়ি করার জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের অনুরোধ করায় তারা তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে যান। ছোবহান সাহেব এসে বললেন, আপনারা এখন যা বলতে চান, বলতে পারেন। হান্নান সাহেব 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র' হতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বেতারে ভাষণ দেন। আ. ছোবহান সাহেবের পরামর্শক্রমে কালুরঘাট ট্রান্সমিশনকে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র' নাম দেওয়া হয়েছিল। হান্নান সাহেব প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেশবাসীকে জাগ্রত করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা ও নির্দেশের কথা বারবার উল্লেখ করেন। এই ছিল প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রথম ঘোষণা। এই সময় হঠাৎ টেলিফোন বেজে ওঠে, আপনারা সরে পড়ূন। আমরা সবাই হান্নান সাহেবের নির্দেশে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র' (কালুরঘাট ট্রান্সমিশন) থেকে বাইরে এসে পড়ি। ইতোমধ্যে সারা চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় খবর ছড়িয়ে পড়ে, হান্নান সাহেব এক গোপন রেডিও থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।"

ওই নিবন্ধে আমার পিতা আরও লেখেন- "২৬ মাচ ১৯৭১, ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানসহ পরের তিন-চার দিন ওই কার্যক্রমের সঙ্গে মনেপ্রাণে সহযোগিতা না করতে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যে ভূমিকা রেখেছিল তা হয়তো সম্ভব হতো না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাহায্যার্থে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের' নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। রেডিও কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে চালু হয়েছে- এ খরব পাওয়ার পর সন্ধ্যার সময় বেলাল মোহাম্মদসহ অন্য রেডিও স্টাফরা সেখানে পৌঁছান এবং রেডিও ট্রান্সমিটার ভবন চালু করার ব্যবস্থা করেন। হান্নান সাহেব সন্ধ্যায় পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ওই দিন ছিল ২৬ মার্চের দ্বিতীয় অধিবেশন। রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানই ট্রান্সমিটার চালু করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপর আনুমানিক ৯-১০টার মধ্যে এক ভদ্রলোক খুব সুন্দর গলায়, সুন্দর উচ্চারণে ইংরেজিতে সারাবিশ্বের কাছে সাহায্য কামনা করে জোরালো ভাষায় বক্তৃতা দেন। 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের' নাম দিয়ে যে ট্রান্সমিশনটি চালু করেছিলাম, তা এখনও চালু আছে বুঝতে পেরে মনে যে কী অনুভূতি হয়েছিল তা এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয়।"

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ইতিহাসে অনেকবারই আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু গোড়ার এই ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। যারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনালগ্নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই এখন আমাদের মাঝে নেই। আমার পিতা এম এ হালিম ১৯৯২ সালে যখন নিবন্ধটি লেখেন, তখনও অনেকে বেঁচে ছিলেন। তাই তিনি একটি মূল্যবান প্রস্তাব দিয়েছিলেন ওই নিবন্ধে- "বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যদি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের গোড়াপত্তনের সঠিক ইতিহাস উন্মোচন করতে চায়, তাহলে ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের সাক্ষাৎকার নিলেই বাস্তব ঘটনা প্রকাশ পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে রেডিও ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ রেডিও ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কোনো লোকই রেডিও স্টেশন চালু করতে সমর্থ ছিল না। তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন। এখনও সময় আছে।"

আমরা জানি, নিবন্ধটি প্রকাশের সময় ইতিহাস সংরক্ষণের চেয়ে বরং ইতিহাস বিকৃতির প্রতিযোগিতা চলছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের মদদে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঠিক ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা জরুরি। ইতিহাসের ঋণ শোধ করতে হলে ওই দুঃসাহসিক উদ্যোগে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের উপযুক্ত স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক

মন্তব্য করুন