যখন বৃক্ষ নিধনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সারাবিশ্বের দায়িত্বশীল মানুষই সচেতন, তখন এই ২০২১ সালেও যে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খাবারের দোকান নির্মাণের জন্য গাছ কেটে ফেলার ঘটনা দেখতে হবে, তা সত্যিই আশা করিনি। সম্প্রতি সেখানে কেটে ফেলা হয়েছে এমনসব বড় গাছ, জানা গেছে সেগুলো ছিল প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করার সময় কাটা হয়েছে এই গাছগুলো। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে জানা যায়, কত গাছ কাটতে হবে সেই হিসাব স্থাপত্য অধিদপ্তরের কাছে নেই, আর গণপূর্ত অধিদপ্তর গাছ কাটা-সংক্রান্ত তথ্য পাঠিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কাছে। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, গাছ কাটার হিসাব তাদের কাছেও নেই। কতগুলো গাছ কাটা হলো তিনি তা গুনে আসতে বলেছেন। মন্ত্রী আরও বলেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পছন্দ করেন না, তারাই বিভিন্ন কথা বলে কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণের বিরোধিতা তো কেউ করছে না। তাহলে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের কাজে বাধা দেওয়া হলো কী করে? আর গাছ টিকিয়ে রাখা যেহেতু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত জরুরি, তাই জনসাধারণকে অবহিত না করে, কোনো হিসাব রাখা ছাড়াই গাছ কেটে ফেলা অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য একটি কাজ। এমন একটি কাজের প্রতিবাদ সচেতন নাগরিকরা করবেন তা-ই স্বাভাবিক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য কোনো হিসাব রাখা ছাড়াই বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হলো। এই ঘটনার প্রতিবাদ যারা করছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, এমন অসার এবং অসমীচীন কথা কোনোভাবেই কি বলা যায়? এই সমাজে কথায় এবং কাজে কেউ কেউ যুক্তিবোধ এবং বিচক্ষণতার প্রমাণ রাখলে সচেতন নাগরিকদের আর প্রতিবাদ করার প্রয়োজন হতো না।  

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খাবারের দোকান আর অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করা কি খুবই জরুরি? স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশে কি এমনসব স্থাপনা মানানসই? আর কতগুলো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে তার কোনো হিসাব যখন মন্ত্রণালয় আর অধিদপ্তর দিতে পারছে না, সেক্ষেত্রে যুক্তি এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এতদিনের পুরোনো বড় গাছগুলো কাটা হয়েছে এমন দাবি কি করা সম্ভব? ঢাকা শহর তো অজস্র অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, শপিংমল, আর রেস্তোরাঁর ভিড়ে কংক্রিটের অরণ্যে পরিণত হয়েছে। কংক্রিটের নিষ্প্রাণতার মধ্যে শহরের অল্প যে কয়েকটি স্থানে টিকে আছে স্নিগ্ধ শ্যামলিমা, সে রকম একটি জায়গাতেও গাছ কেটে বানাতে হবে কংক্রিটের খাবারের দোকান? এমন খাবারের দোকান নির্মাণের ফলে উপকার হবে কাদের? আর গাছ কেটে ফেলায় জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হলো, মানুষের ওপর বর্তমান এবং ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব কী হবে তা যারা জানে না বা জেনেও নিজেদের সাময়িক সুবিধার জন্য নির্লিপ্ত থাকে তাদের কঠোর সমালোচনাই করতে হয়। 

বায়োডাইভারসিটি বা জীববৈচিত্র্য কথাটি ১৯৮৮ সালে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন মার্কিন জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উইলসন। জীববৈচিত্র্য ধারণাটির জনক হিসেবে পরিচিত এই প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী বনভূমি উজাড় করা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, অর্থনৈতিক লাভের জন্য রেইনফরেস্ট ধ্বংস করা হলো রেনেসাঁ যুগের একটি চিত্রকর্ম দিয়ে রান্না করার জন্য চুলার আগুন ধরানোর মতোই। অবশ্য আমাদের সমাজে এমন মানুষ আছে যাদের কাছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বত্তিচেল্লি, তিনতোরেত্তো, রাফায়েল, উচ্চেল্লো, তিশান প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীর শৈল্পিক সৃষ্টির কোনো গুরুত্ব নেই। প্রখ্যাত মার্কিন লেখক হেনরি ডেভিড থোরো বলেছিলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রাখার জন্যই কেবল প্রকৃতির যত্ন করা দরকার তা নয়, প্রকৃতির সান্নিধ্য নাগরিক জীবনের ক্লান্তি আর চাপ থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পাওয়ার আর নিজের আত্মানুসন্ধানের যে সুযোগ সৃষ্টি করে, সেই জন্যই প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু সর্বক্ষণ কেবল আর্থিক লাভের চিন্তায় বুঁদ মানুষরা তো থোরো বর্ণিত মনের আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির অর্থই বুঝবে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভোগবাদী কিছু মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করেও মুনাফা অর্জন করতে চায়। বিখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অঁরি লেফেভ্রে বলেছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শহরের বিভিন্ন স্থান সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার জন্যই সাজানো হয়। শহরে পুঁজিবাদের স্বার্থে বাড়তে থাকে শপিংমল, অফিস ভবন আর দামি রেস্তোরাঁ। আর কমতে থাকে খোলা মাঠ আর পার্কের মতো সর্বসাধারণের সময় কাটানোর স্থান।  

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খাবারের দোকান তৈরির জন্য গাছ কাটার ঘটনা লেফেভ্রের এই বিশ্নেষণের সঙ্গেই মিলে যায়। রেস্তোরাঁ নির্মিত হলে ব্যবসায়িক লাভ হবে কেবল কিছু মানুষেরই। কিন্তু বড় গাছ কেটে ফেলার কারণে কাঠবিড়ালি, চিলসহ অন্যান্য পাখি, বিভিন্ন কীটপতঙ্গের আবাস ধ্বংস হলো। সব ধরনের গাছই কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয় আর দেয় বিশুদ্ধ অক্সিজেন। কার্বন শুষে নেওয়ার ফলে পরিবেশ উষ্ণ হতে পারে না। গাছ যদি অবলীলায় কেটে ফেলা হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই তার ক্ষতিকর প্রভাব টের পাওয়া না গেলেও ভবিষ্যতে বিপদগ্রস্ত হওয়ার পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই তৈরি হবে। ঢাকায় ঘরবাড়ির বিস্তৃতি ঘটেছে এলোমেলো এবং অপরিকল্পিতভাবে। অনেক গবেষকের মতে, শহরের এলোমেলো বিস্তৃতি জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ঘরবাড়ি ক্রমাগত বাড়তে থাকার ফলে হারিয়ে যায় খোলা মাঠ, গাছপালা, জলাশয়। যে জায়গায় আগে অল্প কিছু যানবাহন চলত, সেখানে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়ে যানবাহনও। যানবাহনের ধোঁয়া, বিভিন্ন বাড়ি আর গাড়ির এসি থেকে নির্গত বাতাস, বিভিন্ন বস্তিতে খোলা জায়গায় চুলা জ্বালিয়ে রান্না করার ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া প্রভৃতি ঘটায় বায়ুদূষণ। 

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা কমিশন অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন শহরের পাশে 'গ্রিন বেল্ট' স্থাপন করেছে, যেখানে নতুন ভবন এবং ঘরবাড়ি তৈরি করা নিষিদ্ধ। ফলে শহরগুলোর এলোমেলো বিস্তৃতি ঘটছে না এবং সুরক্ষিত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নগরায়ণের ফলে পরিবেশের জন্য যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা চিন্তা করে চীন সরকার সাংহাই শহরের জনসংখ্যা ২৫ মিলিয়ন আর বেইজিংয়ের জনসংখ্যা ২৩ মিলিয়নের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আর জমি দেওয়া হচ্ছে না, অন্য শহর থেকে নতুন মানুষের আগমন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, কম যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রমিকদের শহরে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। চালু করা হচ্ছে বেশি সংখ্যক গণপরিবহন, যেন বেশি সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি পথে চলাচল না করে। আর ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঘটেই চলেছে, ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে নতুন দালান, বাড়ছে মানুষের সংখ্যা আর যানবাহন। কমছে খোলা মাঠ আর গাছ। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন বিলবোর্ডে, বড় টেলিভিশন স্ট্ক্রিনে আর নানা ভবনে জ্বলতে থাকা আলোর কারণে রাতেও শহর থাকে খুব বেশি আলোকিত। অত্যধিক কৃত্রিম আলোর কারণে যে আলোক দূষণ হচ্ছে, সে ব্যাপারে কি আমরা সচেতন? স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য যা জরুরি, যেমন আরাম এবং ঘুম তা কৃত্রিম আলোর জন্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কৃত্রিম আলো পাখিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মথের মতো পতঙ্গ সারারাত জ্বলতে থাকা কৃত্রিম আলোর প্রতি বারবার আকৃষ্ট হয়ে ক্লান্তিতে কিংবা তাপে প্রাণ হারায়, আর মথের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে বাধাগ্রস্ত হয় বিভিন্ন উদ্ভিদের পরাগায়ন আর বীজের ফলন। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর নিচে ফুলের বাগানে পরাগায়ন ঘটানো পতঙ্গের আগমন রাতে অনেক কমে গিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যদি রাতেও খুব বেশি কৃত্রিম আলো জ্বলে, আর মানুষ আসা-যাওয়া করে, তাহলে গাছপালা আর অন্যান্য প্রাণীর জন্য তা উপকারী হবে কিনা তাও চিন্তা করা প্রয়োজন। 

অন্য প্রাণী আর গাছপালা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বিপন্ন হবে মানুষের জীবন- এই সত্য কথাটি অনুধাবন করা প্রয়োজন। কিছু মানুষের বাণিজ্যিক স্বার্থ আর অসচেতনতার কারণে গাছপালা এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটুক, আর এর ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার মাধ্যমে অগণিত মানুষের জন্য বিপদ ঘনিয়ে আসুক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঢাকায় বাতাসের খারাপ মান নাগরিকদের জন্য কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তা আমরা জানি। এই শহরে আর কংক্রিটের আগ্রাসন নয়, আর বায়ুদূষণ নয়, প্রয়োজন সবুজ গাছপালার সংখ্যা বাড়ানো, যা মানুষের শরীরের এবং মনের উপকার করবে। যুক্তিহীনভাবে গাছ কাটার ঘটনা আর কোনোদিন না ঘটুক, সচেতন নাগরিকরা এমন বিচক্ষণ আচরণই দেখতে চাইবেন। 

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন