যে কোনো দেশের জাতীয় জীবনে সে দেশের জাতীয় সংগীত একটা আশ্চর্য মহিমা নিয়ে উদয় হয় এবং চিরভাস্বর হয়ে থাকে। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমেই আমরা দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও দেশাত্মবোধ ফুটিয়ে তুলি। যে কোনো ক্রীড়া কিংবা এ জাতীয় অনুষ্ঠানে যখন সে দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়, তখন সব নাগরিকের বুক গর্বে ফুলে ওঠে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী কমরেড চৌ এন লাই তার দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় বুকের ওপর একটা হাত তুলে রাখতেন। এই শ্রদ্ধা প্রদর্শন কালক্রমে অনেক নেতৃবৃন্দের মধ্যেও প্রসারিত হয়েছে।

জাতীয় সংগীত রচয়িতাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত অনন্য এই কারণে যে, তার রচনা দুটি ভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা লাভ করেছে। অবশ্য রচনার সময় রবীন্দ্রনাথ জানতেন না যে, তার রচিত গান দুটি একদিন স্বাধীন বাংলাদেশ ও ভারতে জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা লাভ করবে। তিনি অখণ্ড ভারতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের উষালগ্নে ছাত্র-জনতার মিলিত আন্দোলনের সময় 'আমার সোনার বাংলা' গানটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জাতীয় সংগীত হিসেবে মনোনীত করা হয়। এ ব্যাপারে ছাত্র নেতৃবৃন্দ প্রস্তাব করলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উৎসাহ ও সম্মতি দেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ রবীন্দ্রনাথের লেখা 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল' গানটিকে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে নির্বাচিত করে।

এ নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে আমি আমার এক বন্ধুর বাড়িতে আটকা পড়ি। পাকিস্তানি বর্বররা সারারাত ধরে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যা করছিল। আমরা সাত-আটজন ঘরের এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে ছিলাম এবং বলা যেতে পারে যে, মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলাম। পরদিন দুপুরের পর গোলাগুলি কিছুটা বন্ধ হলে আমি একটা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। আমার বন্ধুপত্নী কানের কাছে একটা ট্রানজিস্টর লাগিয়ে কাঁদছিল। কারণ তখন কলকাতা রেডিও থেকে 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি বাজানো হচ্ছিল। এই গানটি শুনে সবার চোখই তখন অশ্রু ভারাক্রান্ত। সেই পবিত্র অশ্রুর কথা আমি আজও ভুলতে পারি না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের চেয়ে নাটকীয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সানফ্রান্সিসকোর কাছে লেক সাকসেস শহরে জাতিসংঘের অস্থায়ী সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। সেখানে ১৯৪৭ কিংবা ৪৮ সালে বিশ্ব যুব সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত যুব প্রতিনিধিরা তাদের অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে নিজ নিজ দেশের জাতীয় সংগীত গেয়ে তাদের অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল। কিন্তু তখনও ভারতের কোনো জাতীয় সংগীত মনোনীত করা হয়নি। তখন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত। যুব প্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি তাদের যে কোনো একটা দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু ভারতীয় দলের সদস্যবৃন্দের মধ্যে তিন-চারজন বাঙালি ব্যতীত আর কেউ গান গাইতে পারত না। ফলে বাঙালি ছেলেমেয়েরা 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' গানটিকে কোরাস হিসেবে গেয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করে।

বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত সে রাতেই তার ভ্রাতা ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে বিষয়টি অবহিত করে একটি টেলিগ্রাম পাঠান এবং ভারতের জন্য একটা জাতীয় সংগীত মনোনীত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পণ্ডিত নেহরু তাকে জানান, লোকসভার পরবর্তী অধিবেশনেই তিনি গুরুদেবের এই গানটিকে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করার চেষ্টা করবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাই করেছিলেন।

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক খুশবন্ত সিং অবশ্য লিখেছেন, জাতীয় সংগীত হিসেবে তিনটি গান বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রথমটি রবীন্দ্রনাথের 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা'; দ্বিতীয়টি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম'; তৃতীয়টি ইকবালের 'সারে জহাঁ সে অচ্ছা, হিন্দুস্তাঁ হামারা'। খুশবন্ত সিংয়ের মতে, ইকবালের গানটি সবচেয়ে শ্রুতিমধুর এবং দেশাত্মবোধের ভাবধারা সংবলিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নাম-যশের জন্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালিরা এগিয়ে থাকায় 'জন গণ মন'কেই ভারতের জাতীয় সংগীত রূপে নির্বাচিত করা হয়।

জাতীয় সংগীত নিয়ে জাতীয় আবেগ যেমন ব্যাপক, বিতর্কও কিছুমাত্র কম নয়। যেমন 'রবীন্দ্রবিদ্বেষী' মনে করেন 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' গানটি যুবরাজ পঞ্চম জর্জের ভারতে আগমন উপলক্ষে রচিত। যদিও রবীন্দ্র গবেষকরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, এই গানের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ শাশ্বত ভারতের উদ্দীপ্ত ভাবধারাকেই সমুজ্জ্বল করেছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়েও কিছুদিন আগে এক অপগণ্ড যুবক প্রশ্ন তুলেছিল। কলকাতার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ওই বাংলাদেশি প্রতিযোগী একটা পুরস্কার জিতে নিয়েছে। এতে করেই তার অবস্থা অনেকটা আঙুল ফুলে কলাগাছের মতো। সে আবদার করেছিল যে, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পাল্টাতে হবে। কেননা আমাদের জাতীয় সংগীতে দেশের নাম 'বাংলাদেশ' উল্লেখ নেই। গণ্ডমূর্খ জানে না, পৃথিবীর অনেক দেশের জাতীয় সংগীতেই সেসব দেশের নামের পুরো উল্লেখ নেই। যেমন- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি। এমনকি বেশিরভাগ ফারসি শব্দ দ্বারা লিখিত পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতেও দেশের পুরো নাম উল্লেখ নেই। সংক্ষেপে 'পাক সার জমিন' উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় সংগীতের মতো যে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, সেগুলোকে নিয়ে আবার প্রশ্ন তোলার মতো দুষ্টচক্র সবসময়ই থাকবে। কিন্তু তাতে করে জাতীয় সংগীত নিয়ে আমাদের আবেগ কমবে না। বরং তাদেরই থোতা মুখ ভোঁতা হতে থাকবে। আমরা গাইতেই থাকব- 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'।

 অবসরপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা

মন্তব্য করুন