ছাদবাগান, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বহুল আলোচিত বিষয়। পারস্পরিক প্রতিযোগিতাও লক্ষণীয়। কার ছাদবাগান কত সমৃদ্ধ তা প্রচারের মাধ্যমেই বোঝাতে সচেষ্ট অনেকে। আগে ছাদবাগান অবসরকালীন বিনোদন হিসেবেই চলমান ছিল, তবে দু-একজন শখের বশেই তা করে থাকত। এখনও মানুষ শখেই ছাদবাগান করে থাকে। তবে এতে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে ফুল প্রাধান্য পেত, এখন সেখানে পছন্দের বেশকিছু ফল ও সবজি স্থান করে নিয়েছে। এ বাগানের প্রসারে মানুষের আন্তরিক এ প্রচেষ্টা পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। যার ফলে আবহাওয়ার ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয়। ছাদবাগানে মানুষ যত আগ্রহী হবে, পরিবেশ তত অনুকূলে রাখা সম্ভব হবে। সারাদেশে আমরা যেখানে সবুজ বিতাড়নে নিবেদিত, সেখানে ছাদবাগান আশার আলো। শুধু নিজের উৎপাদিত ফসলের আনন্দ নয়, আশা করা যায় নিকট ভবিষ্যতে এই ছাদবাগান মানুষকে বাড়তি আয়ের পথ দেখাবে।

পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছে খুব আনন্দের সংবাদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে ছাদবাগানকে বাধ্যতামূলক করার জন্য সুপারিশ করেছে। সরকারের সহানুভূতিশীল বিবেচনা পেলে নির্মিতব্য নতুন ভবনগুলো পরিকল্পিত ছাদ বাগান করার সুযোগ পাবে। কিন্তু পুরোনো ভবনগুলোতেও পরিকল্পিত ছাদবাগান করার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে একটি রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দিতে পারে। কারণ ছাদবাগান করতে গিয়ে আমাদের মূল ভবনের স্থায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। ছাদ বাগানের জন্য ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগামীতে ছাদবাগান পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে। সে কারণে পূর্বাপর চিন্তা সরকারকে করে রাখতে হবে।

উন্নত বিশ্বের অনেক মেগাসিটি ছাদবাগানকে বাধ্যতামূলক করে পরিবেশ রক্ষায় সুফল পেয়েছে। টোকিও শহরে ছাদের ২০ শতাংশ জায়গায় ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করে শহরের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমানো সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশে ছাদের বহুবিধ ব্যবহার আছে। বিষয়টা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। ছাদবাগানের উপকারিতা বিবেচনায় হঠাৎ কোনো হটকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সঠিক হবে না। ছাদবাগানের জন্য পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দিন দিন শহরগুলোতে পানি সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। সারাদেশের শহরগুলোতে এখন পর্যন্ত সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। রাজধানীতে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে থাকে, তা সরাসরি গ্রহণ করা যায় না। আবার এই মানহীন পানিও মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। যেখানে খাবার পানিরই সংকট, সেখানে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করার ফলে প্রয়োজনীয় পানি জোগানের বিষয়ও মাথায় রাখা প্রয়োজন। তার ওপর ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের পাশাপাশি লবণাক্ততার বিষয়টা ভুলে গেলে চলবে না।

যাই হোক ছাদবাগান বিষয়টি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অবসরকালের জন্যই শুধু ছাদবাগান- সে ধারণা বদলে গেছে। এখন মানুষ শখের বশে বাগান করছে। নিজের উৎপাদিত ফসল আত্মীয়, প্রতিবেশীদের মধ্যে বণ্টন করছে। এখানে নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের পছন্দের সব গাছ লাগাচ্ছে। তবে সেখানে পরিবেশ বা ভবনের স্থায়িত্বের বিষয়টি বিবেচ্য হচ্ছে না। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণহীন ছাদবাগান আমাদের কাম্য হতে পারে না। তাই এমন ব্যবস্থা করা উচিত যেখানে ছাদবাগানের জন্য পৃথক নার্সারি থেকে সরকারি গাইডলাইন মোতাবেক ক্রেতারা গাছ কিনতে ও তার যত্ন নিতে সব ধরনের পরামর্শ নিতে পারবেন। তাহলেই একটা সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব ছাদবাগান করা সম্ভব হবে। শহরের মানুষ যতই ইট-পাথরের কংক্রিটের মধ্যে বাস করুক, তাদের অন্তরের মধ্যে যে সবুজপ্রীতি বা গ্রামের ছবি আঁকা আছে তার প্রতীক ছাদবাগান। জলাশয় ভরাট, বৃক্ষ নিধন করে অভিজাত ভবন গড়ে, বিজ্ঞানের আশীর্বাদ পুরোটা গ্রহণ করে বাস করলেও শস্য-শ্যামলা গ্রামবাংলার কথা মানুষ কখনও ভুলতে পারে না। আমাদের দেশে কিছু সরকারি পদ আছে, যেখানে বেতনের সঙ্গে মালী পাওয়া যায়। আবার কিছু পদ আছে যার প্রভাবে মালী কর্তৃক কর্তাকে খুশি রাখতে বাড়িতে হাজিরা দিতে হয়। এই ক্ষমতাবানদের ছাদবাগানের শ্রী ও লক্ষ্য পৃথক। রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্তির লক্ষ্যে এসব বাগান সাজানো হয়ে থাকে। নিজেদের শ্রম ও শখে নয়, এখানে লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও আভিজাত্য প্রকাশ। এসব বাগান একটা নির্দিষ্ট সময় পর শ্রী হারিয়ে ফেলে। তাই ছাদবাগান নিজেদের কায়িক শ্রমে গড়ে তোলার মানসিকতা জরুরি। প্রতিদিন একটা সময় কায়িক শ্রম শরীর ও মনকেও সুস্থ রাখতে সহায়ক। ছাদবাগানের ফুল ও ফলের আনন্দ, পরিবেশে অবদান, দেহ-মন সুস্থ রাখার লক্ষ্যের প্রতীক হোক- এটাই কাম্য।

সার্বিক বিবেচনায় ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন গভীরতা পাচ্ছে। দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনায় আমরা বৃক্ষহন্তারক হিসেবে বিশ্বের রোল মডেল হওয়ার প্রতিযোগিতার মধ্যে আছি। উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থের মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থ ঢুকে পড়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। সারাদেশে পরিবেশবাদীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও গাছ রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। কিন্তু তাতে কোনো উপকার হয়েছে এমন একটি উদাহরণ আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। জনসংখ্যার চাপই বলি, আর ব্যক্তিস্বার্থের কথাই বলি; আমরা প্রাকৃতিক বনগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থতার পরিচয় রেখে চলেছি। দিনে দিনে প্রাকৃতিক বনগুলো ছোট হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দক্ষিণাঞ্চলের রক্ষাকবচ সুন্দরবন। এই সুন্দরবন গত প্রায় দুই দশকে ২৩ বার আগুনে পুড়েছে। কিছু অসাধু কর্মচারীর সঙ্গে কিছু অসাধু মানুষ সুন্দরবনের সম্পদ প্রতিনিয়ত নিজের করে নিতে গিয়ে বন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা না গেলেও সরকার সুন্দরবনের কাছে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে সুন্দরবনের কফিনে শেষ পেরেকটা মারার ব্যবস্থায় মশগুল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সড়কের লেন বৃদ্ধির নামে সারাদেশে কত হাজার গাছকে বলি দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব রাখা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। গাছ রক্ষার এলাকাভিত্তিক আন্দোলনে কেউ কর্ণপাত করেনি। উন্নয়ন ও অগ্রগতির একটা অংশ যে বৃক্ষনিধন, তার একটি বড় উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। আর এখন তো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে ঘোড়দৌড়ের মাঠকে উদ্যানে রূপান্তর করেছিলেন, সেই উদ্যানেরও বৃক্ষনিধন চলমান খাবারের দোকান করার জন্য। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এক মন্ত্রী বলছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্য এক মন্ত্রী বলেছেন, বাধ্য হয়েই গাছ কাটা হচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ দেখছে এভাবে বাধ্য হয়েই যশোর রোডের ঐতিহ্যবাহী শতাব্দীপ্রাচীন গাছগুলো বধ করতে। এখনও প্রতিযোগিতা করে বৃক্ষনিধন চলমান। সংশ্নিষ্টদের এসব বিষয়ে বিকল্প কোনো ভাবনা নেই। বরং বিকল্প কোনো ভাবনার প্রস্তাবনাও বিরোধিতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আরও কঠিন-কঠোরভাবে নির্ধারিত কার্য সম্পন্ন করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাদবাগান অনেক লক্ষ্যের সঙ্গে পরিবেশের বিরূপতা কাটাতে বিকল্প হতে পারে। তাই ছাদবাগানের একটা পরিশীলিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ প্রত্যাশাই করি, বৃক্ষনিধন বন্ধ এবং ছাদবাগানকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।

সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
khairulumam1950@gmail.com

বিষয় : নগরায়ণ ছাদবাগান

মন্তব্য করুন