নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে 'দ্য হার্ভার্ড গেজেট'। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দাপ্তরিক সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি ৯ দশকের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও অভিমুখ তুলে ধরেছেন। এখানে উঠে এসেছে ঢাকা, কলকাতা, শান্তিনিকেতন, দেশ ভাগ, দাঙ্গা এবং দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ও বিশ্নেষণ। সংবাদমাধ্যমটির নিজস্ব লেখক ক্রিস্টিনা পাজানিস গৃহীত এবং গত সপ্তাহে অনলাইনে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ ভাষান্তর করেছেন শেখ রোকন

হার্ভার্ড গেজেট: গত শতকের ত্রিশের দশকে আপনার শৈশব ও পারিবারিক জীবন কেমন ছিল?

অমর্ত্য সেন: শিক্ষাবিদ এক পরিবারে আমার জন্ম। আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। মা ছিলেন একজন সফল নৃত্যশিল্পী; একই সঙ্গে তিনি ৩০ বছর ধরে একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। মায়ের বাবা ছিলেন শান্তিনিকেতনে অবস্থিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত সংস্কৃত অধ্যাপক। আমার শৈশবের একটি বড় সময় দাদু-দিদার সঙ্গে শান্তিনিকেতনে কেটেছে। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেছি। আমার পরিবার রক্ষণশীল নয় বরং প্রগতিশীল ছিল। বাবা ও মা দুই দিকের পরিবারই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া। তাদের সবাই শিক্ষকতায় ছিলেন, এমন নয়। যেমন আমার ঠাকুরদা ছিলেন আইনজীবী ও বিচারক।

গেজেট: বাবা-মায়ের বদলে দাদু-দিদার সঙ্গে থাকতেন কেন?

অমর্ত্য সেন: কারণ তখন জাপানের সঙ্গে মিত্রশক্তির যুদ্ধ চলছিল। জাপানি বাহিনী বার্মা ও পূর্ব ভারতে এসে পৌঁছেছিল। কলকাতা বা ঢাকার মতো বড় শহরে তখন বোমা হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। সেদিক থেকে ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয় শহর শান্তিনিকেতন ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। আসলে ঢাকায় যদিও বোমা হামলা হয়নি; কলকাতায় সামান্য হলেও বোমা হামলা হয়েছিল। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। সেখানকার বিদ্যালয়ের উদার পরিবেশ, প্রায় সমানসংখ্যক ছেলে ও মেয়ের সহশিক্ষা, উন্মুক্ত আলমারির গ্রন্থাগার- এগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

গেজেট: বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে সন্দিহান দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। আপনার বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের স্বাভাবিকতায় তা প্রভাব ফেলেছিল?

অমর্ত্য সেন: নানাভাবেই এখানকার পড়াশোনা ব্যতিক্রম ছিল। যেমন আমার মা-ও একই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। তখনই তিনি জুডোসহ নানা বিষয় শিখেছিলেন, যা অন্যান্য বিদ্যালয়ে মেয়েদের তখন শেখানো হতো না। ছেলেমেয়ের সহশিক্ষার বিষয়টি তো আছেই। আসলে আমি প্রথম 'বয়েজ' শিক্ষা ব্যবস্থা পাই কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। আমাদের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা ও নম্বরের ব্যাপার ছিল না। পরীক্ষা ও নম্বরের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। পড়াশোনা নিয়ে কোনো চাপ ছিল না। ৬ বছর বয়সে আমি ঢাকায় সেন্ট গ্রেগরি'জ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। এটা ছিল মিশনারি স্কুল এবং শিক্ষার উৎকর্ষ ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হতো। এ ছাড়া বার্মার মান্দালয়ে আমি কিছুদিন পড়েছি। আমার বাবা সেখানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে তিন বছর ছিলেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনের স্কুল সবদিক থেকে আলাদা।

গেজেট: ক্লাসের বাইরে আপনার আগ্রহের বিষয় কী ছিল?

অমর্ত্য সেন: আমি খুবই সামাজিক ছিলাম এবং ক্লাসের বাইরে অনেকটা সময় কাটত লোকজনের সঙ্গে গল্প করে। আর ছিল বাইসাইকেলের নেশা। সবখানেই আমি সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও অনেক গবেষণার মাঠ পর্যায়ের কাজ আমি বাইসাইকেল চালিয়ে করেছি।

গেজেট: ভারতের ইতিহাসে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পরিবর্তনের সময় আপনি ছিলেন কিশোর। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার সময় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময়ের কোনো কথা মনে পড়ে?

অমর্ত্য সেন: হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা রোধে ব্রিটিশ সরকার খুব একটা চেষ্টা করেনি। বস্তুত কেউ কেউ মনে করেন, ব্রিটিশ সরকারই দাঙ্গা উস্কে দিয়েছিল, যাতে তাদের শাসন ব্যবস্থার অনিবার্যতা প্রমাণ হয়। ওই সময়েই সাম্রাজ্যবাদী 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতি নিয়ে সমালোচনা শুনতাম।

গেজেট: সহিংসতা কি আকস্মিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল?

অমর্ত্য সেন: হ্যাঁ, আকস্মিকভাবেই। আমার ৭-৮ বছর বয়স পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম সংঘাত সামান্যই ছিল। কিন্তু হঠাৎ কোনো সংকেত না দিয়ে নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে একেকজনের জীবনকে গ্রাস করে নিয়েছিল। কেউ তখন ঘরের বাইরে যেতে পারত না এই ভয়ে- আক্রান্ত হতে পারে। ১০-১১ বছর বয়সে একটি ঘটনার সাক্ষী আমিও। আমি বাগানে খেলছিলাম। এমন সময় দেখি, আমাদের বাড়ির ফটক দিয়ে ক্ষতবিক্ষত এক ব্যক্তি ঢুকছেন। তার পিঠে ছুরিকাঘাত স্পষ্ট; সেখান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। তিনি বাড়িতে ঢুকেছেন সাহায্য ও পানি চাইতে। আমি পানি আনতে ও বাবাকে ডাকতে দৌড়ে গেলাম। তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়। হিন্দু দাঙ্গাকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করেছিল। তিনি যেহেতু মুসলমান শ্রমিক ছিলেন, তাই হিন্দু দাঙ্গাকারীদের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। একইভাবে হিন্দু শ্রমিকরা মুসলমান দাঙ্গাকারীর শিকারে পরিণত হতেন। ওই ব্যক্তি যখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছেন, তখন তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। খুবই বেদনার সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ঘরে শিশুদের জন্য কোনো খাবার ছিল না বলে তিনি বাইরে বের হতে বাধ্য হয়েছিলেন, যাতে সন্তানদের জন্য কিছু খাবার কিনে আনতে পারেন। আর এটা করতে গিয়েই তিনি জীবন হারালেন।

গেজেট: দাঙ্গার কোনো শ্রেণি-চরিত্র ছিল?

অমর্ত্য সেন: হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তিরা যদিও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের ছিল, হিন্দু অথবা মুসলিম; এর শিকার প্রায় সবাই ছিল একই শ্রেণির। তারা ছিল দরিদ্র শ্রমিক। কারণ তারা দিনের পর দিন বাড়িতে বসে থাকতে পারত না। তাদের বাড়িতে ভেঙেচুরে ঢোকাও দাঙ্গাকারীদের জন্য ছিল খুবই সহজ। তাদের রাস্তায় ধরে ফেলাও ছিল খুবই সহজ। যেমন- আমাদের বাড়িতে সাহায্যের জন্য আসা ওই ব্যক্তিকে ধরে ফেলা হয়েছিল। একইভাবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু শ্রমিকরা আক্রান্ত হতেন মুসলমান হত্যাকারীদের হাতে। এই দাঙ্গা আকস্মিকভাবে ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে শুরু হয়েছিল। থামতে সময় লেগেছিল কমবেশি ১০ বছর। ততদিনে ভারত বিভক্ত হয়ে গেছে।

গেজেট: এই অভিজ্ঞতা কি আপনার পরবর্তী কর্মজীবন নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল?

অমর্ত্য সেন: অবশ্যই, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার অভিজ্ঞতা আমার কর্মজীবন নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। আমি সুনির্দিষ্টভাবে সহিংসতা ও অকালমৃত্যু দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। একদিকে যেমন হত্যা, অপরাধ ও সহিংসতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি; অন্যদিকে প্রভাবিত হয়েছি দুর্ভিক্ষ দ্বারা। হাজার হাজার মানুষকে ক্ষুধা অথবা ক্ষুধাজনিত রোগব্যাধিতে মরতে দেখেছি। মানবজীবনে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা আমাকে তাড়িত করেছে। এ কারণেই পরবর্তী জীবনে আমি এসব নিয়ে কাজ করেছি।

গেজেট: আপনি উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে প্রথম কীভাবে আগ্রহী হয়ে উঠলেন?

অমর্ত্য সেন: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি নিয়ে আমি সবসময় আগ্রহী ছিলাম। আমি বুঝতে আগ্রহী ছিলাম, স্বল্প উপার্জন ও সম্ভাবনার জনগোষ্ঠী কীভাবে চলে? শান্তিনিকেতনে আমি একটি নৈশ বিদ্যালয় চালাতাম। এর শিক্ষার্থীরা আসত আশপাশের আদিবাসী গ্রাম থেকে। তারা ছিল খুবই দরিদ্র। তাদের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলতাম- তারা বা তাদের বাবা-মা কীভাবে উপার্জন করে, কীভাবে সংসার চালায়; কীভাবে তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে। ফলে এসব বিষয়ে আমার আগ্রহ বেড়েই চলে। আমি জানতাম, আমার বিনিয়োগ করার মতো অর্থ নেই। কিন্তু আমি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর রাজনীতিটা বুঝতে পারব ভালোভাবে। অর্থনীতি নিয়ে আমার কাজকর্মে তাদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

গেজেট: এ ক্ষেত্রে আপনি নিজের রাজনৈতিক দর্শন কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

অমর্ত্য সেন: নিশ্চিতভাবেই কেন্দ্র থেকে বেশ বাম দিকে। কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের প্রতি প্রবল ঝোঁকপ্রবণ। এখান থেকেই আমি কেমব্রিজে আসার আগে, কলকাতায় থাকতে ভাবতাম- বামপন্থিরা আরও ভালো কিছু দিতে পারেন। তাদের আরও ভালো কিছু বলার আছে। কিন্তু যেটা অপছন্দ করতাম, তা হলো তারা অনেক সময়ই মানুষের 'ফ্রিডম অব চয়েস' ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে 'বুর্জোয়া বিলাসিতা' মনে করতেন। এর সঙ্গে আমি একেবারেই একমত ছিলাম না। এক কথায় বললে- আমি বামপন্থার পক্ষে, কিন্তু উদারতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে আরও বেশি।

গেজেট: তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও নৈতিক- অনেক অবদানের জন্য আপনি ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু অন্য অনেক নোবেল বিজয়ীর মতো এটা এখনও আপনার কর্মজীবনের মুকুটে শেষ পালক হয়ে ওঠেনি। আপনি এখনও আগের মতোই লিখছেন, কাজ করছেন, ভ্রমণ করছেন, শিক্ষকতা করছেন। কেন?

অমর্ত্য সেন: আমি অবসর নিতে পারি- মানুষ এই আশা ছেড়ে দিয়েছে। কথা হচ্ছে, আমি কাজ করতে পছন্দ করি। এ জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। পছন্দের কাজে আমি কখনও ক্ষান্ত দিই না। এখনও সচল থাকার এটাই বড় কারণ। আমার বয়স এখন ৮৭। এখনও আমি সবচেয়ে বেশি যে কাজটি পছন্দ করি, তা হচ্ছে শিক্ষকতা। এখনও যেহেতু শিক্ষার্থীরা আমার শিক্ষকতা নিয়ে অখুশি নয়- এটা চালিয়ে যাওয়াই উত্তম প্রস্তাব।

বিষয় : সাক্ষাৎকার অমর্ত্য সেন শেখ রোকন

মন্তব্য করুন