হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতির পিতা; মুক্তির মহানায়ক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এসে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট। ফ্রস্টের প্রথম প্রশ্নই ছিল, ২৫ মার্চ আপনি কেন গ্রেপ্তার হলেন। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আমি মরি, তবু আমার দেশবাসী রক্ষা পাবে। আমি নেতা, প্রয়োজনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব কিন্তু পালিয়ে যাব কেন?' ডেভিড ফ্রস্টের অনেক প্রশ্নের উত্তরে ঘুরেফিরেই ছিল বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর মমত্ববোধের কথা। ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলে জাতির পিতা বলেছিলেন, 'আমি বাঙালিকে ভালোবাসি।' বড় অযোগ্যতা কোনটা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আমি বাঙালিকে বেশি ভালোবাসি। জনতার প্রতিই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি তো জানি, আমি অমর নই।'

বাঙালিকে বঙ্গবন্ধুর মতো এতটা ভালোবাসতে পেরেছে কে? যে ভালোবাসার জন্য তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে জেল খেটেছেন। হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনোই আপস করেননি। বাংলাদেশের সব প্রান্তে জনসাধারণের হৃদয়ে সর্বদা ধ্বনিত হয়- আমরা তোমার, তুমি আমাদের। হঠাৎ ক্ষমতার পালা বদলে বাঙালির নেতা হননি শেখ মুজিবুর রহমান। শোষিত বাঙালির মুক্তির ভরসাস্থল হিসেবে নিজেকে তিনি গড়ে তুলেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতার প্রতিটি সোপানে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। এ কারণে তিনি ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বলতে পেরেছিলেন, 'আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।'

বঙ্গবন্ধু গণমানুষের দল আওয়ামী লীগের নেতা হয়েছিলেন। বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ছিল বলেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির প্রেরণার শক্তির উৎস ছিলেন শেখ মুজিব। তার নেতৃত্বেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির গোড়াপত্তন হয়েছে বঞ্চিত বাংলার সুদূর গ্রামাঞ্চলে, নীরব-নিভৃত পল্লিতে। যে ক্ষমতার উৎস জনগণের সমবেত ইচ্ছায়, সহযোগিতায় ও সমর্থনে নিহিত, সে সুপ্ত ক্ষমতার পুনর্জাগরণই মুজিব রাজনীতির মূলমন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অপর নাম জনগণকে ভালোবাসা। রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। গোপালগঞ্জে বাইগার নদীর তীরঘেঁষে ছবির মতো সাজানো গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের আদরের তৃতীয় সন্তান 'খোকা'। কিশোর বয়সে খোকা হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী। একবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে সফরে যান এবং মিশনারি স্কুল পরিদর্শন করেন। সেই সময় কিশোর মুজিব তাদের কাছে স্কুলঘরে বর্ষার পানি পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে মেরামত করিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার আদায় করেন। তখন সবার নজরে আসেন খোকা। সবাই বলতে শুরু করেন- এই ছেলে একদিন অনেক বিখ্যাত হবে। পরবর্তীকালে এই খোকাই হয়ে ওঠেন বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির মুক্তির মহানায়ক ও জাতির পিতা।

এন্ট্রান্স পাসের পর শেখ মুজিব কলকাতায় ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। সেখানেও ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। প্রথমে মুসলিম লীগের কাউন্সিলর এবং পরবর্তীকালে কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তরুণ শেখ মুজিব। দেশভাগের আগের বছরে কলকাতায় দাঙ্গা প্রতিরোধেও তিনি ছিলেন অগ্রণী যোদ্ধা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব বুঝতে পারলেন, বাঙালি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। সংকল্প করলেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। প্রথম প্রতিবাদ করেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন তিনি। কিন্তু কয়েক দিন পর পাকিস্তান সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারান শেখ মুজিব। তাকে আবারও জেলে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। জেলে থাকতেই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। জেল থেকে বের হয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেন।

তাকে সব সময় গোয়েন্দারা নজরদারির মধ্যে রাখত। কারণ, তার মধ্যে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার নেতৃত্বগুণ ছিল। মানুষ তার কথা বিশ্বাস করত এবং তিনি ছিলেন আপসহীন। এ কারণে ১৯৫০ সালের শুরুতে আবার গ্রেপ্তার হলেন তিনি। টানা আড়াই বছর বন্দি করে রাখা হলো তাকে। দীর্ঘ ২৭ মাস পর জেলখানা থেকে মুক্তির পর বাড়িতে যান শেখ মুজিব। আমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে ৩০৫৩ দিন জেল খেটেছেন।

জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধু, জাতির কাছে পিতা। আর পরিবারের কাছে? ঘরের চেয়ে তিনি বেশি থেকেছেন জেলখানায়, পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার তার সুযোগ মিলেছে কম। যদিও তার হয়ে নীরবে কিন্তু শক্ত হাতে সংসার সামলেছেন যোগ্য সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি সংসার চালানোর পাশাপাশি কারাবন্দি স্বামীর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গোপনে নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নানাভাবে আওয়ামী লীগ পরিচালনায় বঙ্গমাতা অবদান রাখতেন। রেণু থেকে বঙ্গমাতা হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সাহস জোগাতে বারবার ছুটে যেতেন জেলখানায়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে দলীয় নেতারা অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। শুধু ব্যতিক্রম ছিলেন বেগম মুজিব। তিনি বঙ্গবন্ধুকে কারও পরামর্শ না শুনে নিজের মনের কথাই ভাষণে বলার অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু এতদিন যে স্বপ্টম্ন দেখেছেন, সেই হৃদয়ের কথাগুলো শুনতে বাঙালি ব্যাকুল হয়েছিল। বঙ্গমাতার কয়েকটি সহজ কথা মেনেই বঙ্গবন্ধু দিতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা। রচিত হয়েছিল ইতিহাস।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যখন ভোর হচ্ছিল, বাঙালি তখনও বোঝেনি কী ভয়ংকর অমানিশায় নিপতিত হচ্ছে গোটা জাতি। নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর একদল পথভ্রষ্ট উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে নিহত হন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তার বিদায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলার অগ্রগতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু পরের প্রজন্মের জন্য গড়ছিলেন, তা কলুষিত হলো ষড়যন্ত্র, ক্যু আর বিভ্রান্ত রাজনীতিতে। যারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সৈনিক, যারা বিশ্বাস করতেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে, তাদের জন্যও শুরু হয় অন্ধকার সময়। আর সদম্ভে ঘুরতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তি।

তবে আদর্শ কখনও মরে না। শোকাতুর বাঙালির হৃদয়ে অনেক রক্তক্ষরণের পর জাতির পিতার আদর্শের প্রাচুর্যেই আবারও জেগে ওঠে বাংলাদেশ। পিতার দেখানো পথে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর পিতার মতোই গ্রাম-গঞ্জ-শহর এবং পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের কষ্ট-দুঃখের কথা শুনেছেন। বাংলার মানুষ তখন মুজিবকন্যাকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। পঁচাত্তর-পরবর্তী ভঙ্গুর আওয়ামী লীগের তৃণমূল সুসংগঠিত করেছেন। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই কন্যা শেষ হাসিনা বাঙালিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাই এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এরপর আবার শুরু হয় ষড়যন্ত্র। বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনের পর ওয়ান-ইলেভেনের অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু একটি জাতির রূপকার। স্বাধীন বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু- এই দুটি নাম তাই অভিন্ন। আমরা সৌভাগ্যবান এ কারণে যে, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মী ছিলাম। আরও সৌভাগ্যবান; কারণ, আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে মানুষের সমস্যা উপলব্ধি এবং খোঁজখবর নেওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি সেই উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

বঙ্গবন্ধু অমর। কবির ভাষায় বলতে হয়, 'যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই।' আমরা বঙ্গবন্ধুকে বেশি দিন দেশ শাসনের সুযোগ দিইনি। এ কারণে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্রক্ষমতায় তিনি আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তার পরিকল্পনা করেছিলেন, যার সফল বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তারই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত এক যুগে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের সব সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা করোনাভাইরাসের মহামারির সময় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সিনিয়র সহসভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ

বিষয় : মুজিববর্ষ আসাদুজ্জামান খান

মন্তব্য করুন