তিনি সব সময় মাড় দেওয়া ইস্ত্রি করা ধোপদুরস্ত কাপড় পরতেন। আমি মনে করতে পারি না ঠিক কোন দিন বা কখন ওই সাদা বিশেষ ছাঁটের ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি-পায়জামা কামাল লোহানী (আমাদের দুলাল ভাই) নামের সমার্থক হয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবে তাকে নিজবাড়িতে, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, বিয়েবাড়িতে অথবা পুরোনো দিনের ছবিতে একই পোশাকে দেখা যেত। কখনও-বা কাঁধে একটি শাল চাপানো। এই পোশাক এককভাবে তার মানসিক শক্তির পরিচয় বহনকারী, প্রথম দর্শনেই যে সৌন্দর্যের সরলতা তা তাকে বিপুলভাবে আকৃষ্ট করত।

সত্যি বলতে কামাল লোহানী তার পরিধেয় বিষয়ে যথেষ্ট অনমনীয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতির অনুগামী দলের সদস্য হয়ে তিনি লুসাকা, জাম্বিয়ায় কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হলে পোশাক হিসেবে স্যুট পরতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। ওই সময় তিনি দৈনিক বার্তার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিখ্যাত পরিচালক ও নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাটক 'উজান পবনে' স্কুলশিক্ষকের চরিত্রে অভিনয়ের সময় জীবনে একবার তাকে প্যান্ট পরতে দেখা যায়।

একজন বহুমুখী গুণের অধিকারী, বড় মাপের মানুষ কামাল লোহানী চাচাতো ভাই ফতেহ এবং ফজলে লোহানীর সমগুণের মানুষ ছিলেন। ভাইদের চেয়ে দীর্ঘতর জীবনযাপন করে এবং দেশের সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রেখে তিনিই হয়ে উঠেছেন লোহানী পরিবারের সেই মহাগ্রন্থ। ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা কামাল লোহানী সুবিচারের প্রতি বিস্ময়কর অঙ্গীকার ও আপসহীন নীতি নিয়ে জীবনের চড়াই-উতরাই পার করেছেন। সব সময় বিস্ময় নিয়ে ভেবেছি জীবনের ঠিক কোন সময় থেকে তিনি ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্দীপ্ত অংশগ্রহণের বিপুল সাহস সঞ্চয় করতে শুরু করেছিলেন। মনে হয় জীবনের প্রথম লগ্নেই তা শুরু হয়েছিল।

পড়ালেখার ভালো সুযোগের জন্য তার বাবা মুসা খান লোহানী তাকে কলকাতায় ফুপু আম্মা সালেমা খানম পেয়ারার কাছে নিয়ে যান। সে সময় তার ফুপু আম্মা খ্যাতিমান নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা কবি সুফিয়া কামাল ও ভাই ফতেহ লোহানীর মা ফাতেমা লোহানীর সঙ্গে একটি করপোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন। কামাল লোহানী মনে রেখেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় জাপানি যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণের সময় তিনি কানে তুলা ঢুকিয়ে কীভাবে ট্রেঞ্চে লুকিয়ে আশ্রয় নিতেন। মনে হয় এমন অল্প বয়সে যুদ্ধকে এত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ জীবনের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল ও দিয়েছিল বলিষ্ঠতা। ভিত গড়ে দেয় দুঃসাহসী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তিনি চাচা শিক্ষাবিদ তাসাদ্দুক লোহানীর কাছে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় চাচার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। চাচা চাইতেন তিনি পড়াশোনা শেষ করে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করুন। কিন্তু কোনো কিছুই আসলে কামাল ভাইকে রাজনীতির প্রভাব থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হলেন এবং মার্কসবাদে দীক্ষা নিলেন। এই সময় তিনি স্বাধীনতাকামী স্লোগান ও জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের সক্ষমতা অর্জন করেন। এক সময় তিনি চাচার কাছ থেকে মাত্র ১৫ টাকা নিয়ে দেশপ্রেমের বিদ্রোহী ডাকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলেন। পড়াশোনা অসমাপ্ত থেকে গেল। ১৯৫৫ সালে চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সাহায্যে দৈনিক মিল্লাতে যোগদান করেন। শুরু হলো সাংবাদিকতা জীবন। ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তান আওয়ামী পার্টি গঠন করলে তিনি উৎসাহ নিয়ে যোগদান করেন।

কামাল লোহানী ১৯৬০ সালে একজন বিশিষ্ট নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীপ্তি লোহানী শুধু তার জীবন সঙ্গিনীই ছিলেন না, ছিলেন সহযোগী-সহযোদ্ধা। সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্বের গুরুভার বহন করাসহ সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও ধর্মনিরেপেক্ষ রাজনীতিবিদদের বাসায় নিয়মিত আপ্যায়নের কাজ তিনি করেছেন আন্তরিক অনুগ্রহের সঙ্গে। এই দম্পতি সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব অনুভব করেছেন এবং তাদের জীবনের সবকিছু এর পেছনে উৎসর্গ করেছেন। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের সময় 'ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী' নামে দেশের প্রথম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্ম হয়। এটি ছিল দেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কামাল লোহানীর প্রভাবের বিপুল এক ছাপ চিহ্ন।

'রক্তোচ্ছ্বাসে একাকী এসো না।/একা মানে খজ্জ ভয়,/ একা মানে নির্বাপিত সূর্যের শরীরে/ফুলে ওঠা দানবের ছায়া/ রক্তোচ্ছ্বাসে একাকী ভেসো না।/উজ্জ্বলন্ত স্বপ্টেম্নর বল্লমে জ্বলো/ আমাদেরও সঙ্গে নিয়ে চলো। ...' কবি অসীম কুমার দাস ১৯৯৩ সালে রাজশাহীতে তার সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই কবিতাটি তাকে উৎসর্গ করেছিলেন। কবিতাটি ২০০৪ সালে কামাল ভাইয়ের ৭০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রকাশিত তার লেখা প্রবন্ধ সংকলন 'সময়ের সাহস' বইয়ে পুনর্মুদ্রিত হয়। নিজবাড়িতেও তিনি প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জীবনের সমস্ত সম্মাননা যেমন একুশে পদক (২০১৫), প্রকাশিত বইয়ের ভান্ডার, ছয় দশকের বেশি সময়জুড়ে অবিশ্বাস্য সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার এবং সক্রিয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা, জনজীবন অতিক্রান্ত কামাল লোহানী আমাদের কাছে ছিলেন সেই দুলাল ভাই। পরিবারের জন্য তিনি দীর্ঘকায় শক্তিমান অভিভাবক ছিলেন বছরের পর বছর। অন্তত চার দশক

আমি তাকে দেখেছি পেশাদার জীবনের

এত ব্যস্ততার মাঝেও সারিত ও কাছের পরিবার সদস্যদের সঙ্গে কীভাবে তিনি সংযুক্ত ছিলেন।

তার বাড়ি সব সময় সরগরম থাকত মানুষের উপস্থিতিতে। মানুষের সান্নিধ্য তার প্রিয় ছিল। কামাল লোহানীর ভালোবাসার সামর্থ্য ছিল সীমাহীন। দেশ, মানুষ ও শিল্প- কোথায়ও সংযমের আভাস ছিল না পরিমাপে যে, তিনি কতটুকু ভালোবাসতে পারেন। এমনকি কোনো স্বাস্থ্য জটিলতাও তার ব্যক্তিত্বের শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। অনেক দেরিতে কিছুদিন আগে মাত্র তার সন্তানরা সাংস্কৃতিক সভা বা টেলিভিশন টকশো থেকে তাকে বিরত রাখতে সমর্থ হন। উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র রোগ ও ফুসফুসের সমস্যায় বন্দি শরীর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকেই অনেক খারাপ হয়ে যায়। আংশিকভাবে অন্ধ হয়ে যেতে শুরু করেও তিনি পড়া ও লেখার বিষয়ে তার ভালোবাসাকে হেরে যেতে দেননি। কামাল লোহানী সেই মানুষ ছিলেন না, যিনি কোনো কাজে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে 'না' করবেন। সম্প্রতি মাত্র চার বছর আগে তিনি উৎসাহ নিয়ে সম্মতি দিয়েছিলেন কবিতা অ্যালবাম 'দ্রোহের উচ্চারণ'-এর জন্য স্টুডিওতে গিয়ে আবৃত্তি রেকর্ড করতে। আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে আছে তার ভরাট কণ্ঠে তুর্কি কবি, নাট্যকার ও সুরকার নাজিম হিকমতের লেখা, কবি সুভাষ মুখোপ্যাধ্যায় অনূদিত 'জেলখানার চিঠি' কবিতার আবৃত্তি। সেদিন শুধু তার উৎসাহ ও আবৃত্তির গুণগত মানের বিষয় সময়কে ধারণ করেছিল না, ছিল তার সাহসী উপস্থিতি। সেই সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যিনি তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে হৃদয় দিয়ে আবৃত্তি করছিলেন। মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন সেই কামাল লোহানীকে, দেশ যাকে চেনে। আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন দুলাল ভাই কে, যিনি পরিবারের কোনো বিষয়ে সংযুক্ত হতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

তার তিন সন্তানের সর্বোত্তম প্রচেষ্টার পরও আজ থেকে এক বছর আগে জুন মাসের ২০ তারিখের এই দিনে তাকে আমরা হারিয়েছি। আবারও যখন পরিবারের এই মহাগ্রন্থের প্রয়াণ শোকের সঙ্গে স্মরণ করছি, তখন আমি প্রার্থনা করি এই দুর্দান্ত বাংলাদেশির উত্তরাধিকারে আমরা অনুপ্রাণিত হবো, যিনি শুধু ইস্ত্রি করা সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতেন এবং বিশুদ্ধ, সৎ, বহুমাত্রায় গুণান্বিত এক উজ্জ্বল জীবনযাপন করে গেছেন।

লেখক ও আবৃত্তিশিল্পী

বিষয় : স্মরণ কামাল লোহানী

মন্তব্য করুন