বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবকে অর্থবহ, আনন্দদায়ক এবং মর্যাদাশীল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে খাদ্যদ্রব্যে মূল্যছাড় ছাড়াও নানা ধরনের জনহিতকর প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে পবিত্র রমজান মাসে অযৌক্তিকভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়। সরকারের নানান নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। প্রচুর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়, জেল-জরিমানা করা হয়। কিন্তু সীমাহীন লাভের, অত্যাধিক লোভের কাছে এসব প্রচেষ্টার ফল খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না। কখনও-বা সরকারের গৃহীত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হুমকি, আন্দোলন ইত্যাদিও হতে দেখা যায়।

খাদ্যদ্রব্যে পুষ্টিমান কিংবা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে- জিএমও, হাইব্রিড বা উন্নত জাতের বীজ, অবৈজ্ঞানিকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ, ত্রুটিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যত্রতত্র শিল্পায়ন ও শিল্পবর্জ্য নির্গমন, মানুষের অসচেতনতা আর খাদ্যাভ্যাস। সেইসঙ্গে এক শ্রেণির মানুষ সীমাহীন লোভের কারণে খাদ্যে ভেজাল মেশায়। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া, ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো কিংবা যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে খাদ্যের গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে, পুষ্টিমান কমে যাচ্ছে, বিষক্রিয়া হচ্ছে অহরহ। ভেজাল খাদ্যে মানুষের ফুসফুসে ক্যান্সারসহ লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বে ভেজাল খাদ্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিদিন প্রায় চার লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ চিত্র বেশি খারাপ। খাদ্যে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে।

খাদ্য ভোগ উপযুক্ত কিনা ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যায়, যেমন- খাদ্য নিরাপদ কিনা, খাদ্য পুষ্টিসমৃদ্ধ কিনা এবং খাদ্য সুষম কিনা। বাংলাদেশে বিশেষত শহরাঞ্চলে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ওজন, স্থুলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস জনস্বাস্থ্যে পুষ্টি সমস্যা এবং অসম খাদ্যাভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফাস্টফুড, শুকনো খাবার, দানাদার খাদ্য এবং আঁশবিহীন খাদ্যের অধিক্যই মূলত এ জন্য দায়ী বলে পুষ্টিবিদরা অভিমত দেন। সুষম এবং পরিকল্পিত খাদ্য ব্যবস্থা এসব সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ লক্ষ্যে পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি; জীবন চক্রের সব ধাপে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা; খাদ্যে বৈচিত্র্য আনা ও পুষ্টিমান অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা; জনগণের বিশেষত শিশু, বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়ে, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মাসহ সবার পুষ্টি অবস্থার উন্নতি সাধন প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

ষাটের দশক থেকে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কৃষি উৎপাদনের ওপর ব্যাপক জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে খাদ্যের জোগানের সঙ্গে সঙ্গে এর পুষ্টি ও গুণগত মান রক্ষায় বিশ্ব অধিকতর সজাগ। কারণ সুস্বাস্থ্যের জন্য কেবল খাদ্য গ্রহণই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুষম ও নিরাপদ খাদ্য। আর এ দুটির অভাবে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশনের লক্ষ্যে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোগ পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট সবাইকে সজাগ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত কোনো একটি পর্যায়ে যদি খাদ্যের মান যথাযথ রক্ষা করা না হয়, তবে সে খাদ্য আর নিরাপদ থাকে না।

রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হলো নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা প্রদান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ১৮-তে পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার (২০২১-২০৪১) ষষ্ঠ অধ্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির উন্নয়ন ও স্থায়িত্বের লক্ষ্যে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী শক্তিশালী করা, কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং বাজারজাতকরণ সেবা উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রণীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও (২০২০-২০২৫) এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বেশ কিছু আইন ও বিধিবিধান খাদ্য নিরাপত্তা বিধান সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। আইনের আলোকে বিধিবিধান, প্রবিধানমালা এবং নীতিমালা প্রণয়ন করে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত তিনি স্তরের দিকনির্দেশনা প্রদান, মনিটরিং ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে এর সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্নিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সিভিল সোসাইটি, একাডেমিয়া, গবেষক এবং মিডিয়াসহ সব অংশীজন নিয়ে সমন্বয়ের ওপর। কারণ খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষ যেমন জড়িত, তেমনি পরিবেশ রক্ষা থেকে খাদ্য উৎপাদন, শুকানো, মজুদ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কীকরণ, লেবেলিং, আমদানি, রপ্তানি, বাজারজাতকরণ, রান্না ও পরিবেশন পর্যন্ত সব পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীরা খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রি-সংশ্নিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং এই লক্ষ্যে একটি দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ জারি করা হয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে জনস্বাস্থ্যহীনতার পাশাপাশি অপুষ্টি, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও খাবারের অপচয় ঘটবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবে। বর্তমান বিশ্বে খাদ্যশস্যসহ খাদ্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা অত্যাবশ্যক। কেননা মানুষের আর্থিক সংগতি বৃদ্ধির পাশাপাশি রুচি ও জীবন ধারণের ধরনও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে নতুন নতুন মানসম্মত ভোগ্যপণ্য যুক্ত হচ্ছে। তাই দেশে যদি নিম্নমানের খাদ্য ও খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়, তবে তা টেকসই হবে না বরং সেখানে উন্নত মানের পণ্য আমদানির মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত নিম্নমানের পণ্যের জায়গা দখল করবে। এ ছাড়া যৌথ মালিকানায় শিল্প কলকারখানা স্থাপন, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশেও বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

খাদ্যশিল্পে ব্যবহূত প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া ছড়াতে পারে। সেইসঙ্গে অব্যবহূত প্লাস্টিক জমি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। তাই ব্যবহূত প্লাস্টিক রিসাইকেল করে পুনরায় ব্যবহার; রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক উৎপাদন ও এর ব্যবহার নীতিমালা অনুসরণ করে দেশে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক রেজিন আমদানি কমানো যেতে পারে।

যত্রতত্র ছোট ছোট উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যে খাদ্য প্রস্তুত বা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিপণন করা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর। এদের বিষয়ে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষও সবসময় ওয়াকিবহাল থাকে না। একদিকে সারাদেশে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং সে সঙ্গে খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার কারণ এবং এর কুফল সম্পর্কে আরও গণসচেতনতা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রচেষ্টা নেওয়া দরকার।

মনিটরিং, নজরদারি, প্রশিক্ষণ ও খাদ্যের গুণগতমান যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। সেই সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক কারিগরি কৌশলসমৃদ্ধ খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান; যারা দেশের ও বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাদ্য প্রস্তুত, পরিবহন, সংরক্ষণ, মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণে সক্ষম। আধুনিক খাদ্যশিল্পের অবকাঠামো যেমনটি উন্নত, তেমনি এর লোকবল ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অবগত। তাই দেশে উৎপাদিত ও সহজলভ্য কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য, পর্যটন, বাণিজ্যের প্রসার ও বেসরকারিভাবে খাদ্যশিল্পের প্রসারে সরকারি সহযোগিতার উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আটটি বিভাগে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে খাদ্যের পুষ্টিমানসহ ভেজালের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মানুষ করোনা মহামারিতে 'সার্টিফায়েড' ও 'নন সার্টিফায়েড' খাদ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। ভেজালবিহীন 'সার্টিফায়েড খাবার' মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করোনাসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় সংকোচনে সাহায্য করবে।

সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যের প্রাপ্যতা, অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণসহ যে কোনো পদক্ষেপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যদি না নিরাপদ এবং মানসম্মত খাবার সবার জন্য নিশ্চিত করা যায়। প্রাপ্যতা এবং অভিগম্যতার পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যের মান ও গুণাগুণ নিশ্চিত করাও একান্ত অপরিহার্য। সবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিত করাসহ খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা এ অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সে সঙ্গে দরকার সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি সংস্থা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোর সহযোগিতা।

সাবেক সচিব

বিষয় : জনস্বাস্থ্য সিকদার আনোয়ার

মন্তব্য করুন